আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মঙ্গল আলোর ভুবন

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • সেলিনা হোসেন

প্রকৃতির ধারাবাহিকতা প্রকৃতির নিয়মেই চলছিল। দিন ও মাসের হিসাব করল মানুষ। জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য। দিন মাসের হিসাবের পরে এলো বছরের শুরু ও শেষ দিনের হিসাব। শুরুর দিন ঘোষিত হলো নববর্ষ হিসেবে। সব দেশের ক্যালেন্ডারে যুক্ত হলো বছর শুরুর দিন। বর্ষের সূচনা দিন।

এক সময় অগ্রহায়ণ মাস ছিল বাঙালীর বছর শুরুর দিন। পরে হলো বৈশাখ মাস। বাঙালীর নববর্ষ হলো ১ বৈশাখ। এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালীর সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে ওঠে। দিনটি শুধু একদিনের উৎসব হয়ে রইল না। এর সঙ্গে যুক্ত হলো সাংস্কৃতিক চিন্তার নানা অনুষঙ্গ।

নববর্ষ উদ্যাপন আমরা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনায় করি। উৎসবের এই আনন্দ গ্রাম থেকে শহরে জীবনের সর্বত্র প্রবাহিত হয় বেশ কয়েকদিন ধরে। এই উৎসব আমাদের জীবনে অমর হোক, এটা আমরা সবাই চাই। আমরা বলি, নববর্ষ আমাদের সাংস্কৃতিক পরিম-লের একটি অন্যতম উপাদান। ধর্ম-বর্ণ-আদিবাসী নির্বিশেষে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ উৎসব। আমরা বলি, নববর্ষের উৎসব আমাদের সংস্কৃতির শেকড়। শেকড়সন্ধানী অনুপ্রেরণা বিশ্বজুড়ে সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের ভেতর বহমান। আমরা বাংলাদেশের মানুষ এই ঐতিহ্য নিয়ে আলোকিত হতে চাই।

প্রশ্ন হলো আমরা কি নববর্ষের এই চেতনাকে নিজেদের জীবনের আচরণের সবখানে ধরে রাখতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের এই অসাধারণ সাংস্কৃতিক চেতনাবোধে প্রদীপ্ত এবং শাণিত হতে পেরেছি? কতটা শেখাতে পেরেছে এই প্রাণপ্রিয় অনুষ্ঠান আমাদের?

তিনটি দিক ধরে কথা বলতে চাই আমি। প্রথমে মানবিক চেতনার দিকÑ বছর কয়েক আগে লিমন নামের একটি ছেলেকে র‌্যাবের একজন সদস্য পায়ে গুলি করেছে। তার সেই পা চিকিৎকরা কেটে বাদ দিয়েছেন। এই কি ছিল চল্লিশ বছরের স্বাধীন দেশের মানবিক বোধের বিকাশ? কী অপরাধ ছিল সেই ছেলেটির? কেন তাকে এই পঙ্গুত্বের বোঝায় ঠেলে দেয়া হলো? ওর যদি কোন অপরাধ থাকত তার বিচার কি অন্যভাবে হতে পারত না? শেকড়সন্ধানী নববর্ষের অনুপ্রেরণা মানবিক বোধের এই জায়গায় নিদারুণভাবে ব্যর্থ। চিন্তা করলে উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে আসে। ২০১৫ সালের নববর্ষের উৎসব এক ক্রান্তিকালের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মানবিক চেনতার বিপর্যয় তৈরি করেছে বার্ন ইউনিট। দগ্ধ মানুষের আর্তনাদ ভারি করেছে সামাজিক চেতনার বিবেক। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা স্বাভাবিক বিপর্যয়ের নিষ্ঠুরতম আচরণ। এই সময়ের বাংলাদেশের মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতায় একদিকে শঙ্কিত, অন্যদিকে প্রতিরোধী। এই সম্মিলন পহেলা বৈশাখের তাত্ত্বিক ধারণাকে কতটা সমৃদ্ধ করে তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা কোন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নয়। গণতন্ত্রের নামে এই অরাজকতা এবং ধ্বংসযজ্ঞের উন্মত্ততা মানুষের জীবনের বিপরীত বলে এখানে গণতন্ত্রের সত্য নেই। আমরা বলি, নববর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ উৎসব। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলিত হয়। কিন্তু আমরা খতিয়ে দেখি না যে, এই উৎসবের ডামাডোলে নিষ্পেষিত হয় অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারণা। এখনও বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীদের হাতে নিপীড়িত হয়। এটি দিনের আলোর মতো সত্য। আমারই সামনে আমি বলতে শুনেছি, দু’জন বিবদমান মানুষের একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষটিকে বলছে, আমার কথা যদি না শুনিস, তা হলে ঘটিবাটি নিয়ে তৈরি হ। লাথি মেরে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেব। এই কি নাগরিক মর্যাদাবোধের জায়গা? আমাদের পাহাড় এবং সমতলের নৃগোষ্ঠীর মানুষরা নানাভাবে বাঙালীদের হাতে নির্যাতিত হয়। সংবিধান মেনে যদি নাগরিক প্রশ্নের কথা বলি তা হলে কি এই ধরনের আচরণ দেশের একজন সম্মানিত নাগরিকের পাওনা হয়।

এ বছরের ২৮ মার্চ তারিখে পত্রিকার (দৈনিক যুগান্তর) খবর ‘তালতলীতে ১৪ হিন্দু পরিবার ভিটে ছাড়া’ খবর পাঠিয়েছেন পত্রিকার বরগুনা ও তালতলীর প্রতিনিধি। লিখেছেন : বরগুনার তালতলীতে সন্ত্রাসীদের হুমকিতে ভয়ে পৈতৃক ভিটেবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ১৪টি সংখ্যালঘু পরিবার।’ প্রশ্ন হলো আর কতকাল এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে? স্বাধীনতার ৪৪তম জন্মদিন পার করেছি আমরা। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি জাতির জন্য কলঙ্কস্বরূপ।

এভাবেই অসাম্প্রদায়িক উৎসব নববর্ষ আমাদের জীবনকে সাংস্কৃতিক সুস্থতায় বিকশিত করেনি।

বলতে চাই, রাজনীতির সুস্থতার কথা। একবার জাতীয় সংসদের একজন সদস্য স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন, মাইক দে। এটা কি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকশিত চেতনার প্রকাশ? জাতীয় সংসদের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তি কি এভাবে কথা বলতে পারেন? তিনি কি মনে করেননি তাঁর এই ভাষা ব্যবহারে তিনি নিজেকে ক্ষুদ্র করেছেন, তাঁর রাজনৈতিক দলকে ক্ষুদ্র করেছেন, জাতীয় সংসদের অবমাননা করেছেন এবং স্পিকারের সাংবিধানিক পদকে অবমূল্যায়ক করেছেন? তিনি যদি কোন অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকেন তা হলে সেটার প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের আচরণ এটা হতে পারে না। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সংসদ সদস্য অবশ্যই পরিশীলিত আচরণ করবেন। এটা আমাদের সকলের প্রত্যাশা। আমরাই সংসদ সদস্য নির্বাচিত করি। আমাদের আশা-আকাক্সক্ষা স্বপ্নের জায়গা থেকে তারা সংসদে যান, জাতীয় সংসদে বসে আইন প্রণয়ন করার জন্য। যে আইন দেশের মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য প্রণীত হয়। সেই আইন প্রণেতারা যদি এসব ভাষা ব্যবহার করেন এবং তা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তা হলে নাগরিক হিসেবে আপমানিতবোধ করি আমরা। আমরা এই অপমানের হাত থেকে মুক্তি চাই। কোন মাননীয় সংসদ সদস্য যেন আমাদেকে এমন অন্ধকারে নিমজ্জিত না করেন। আমরা সুস্থ-সুন্দর রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা চাই। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সর্বোত্তম ব্যবহার চাই।

আমাদের ১৪২২ বঙ্গাব্দে প্রবেশ ঘটল; যেতে হবে অনেক সামনে। আমাদের আগামী তৈরি হোক জীবনের পক্ষে সবটুকু শুভ মূল্যবোধ নিয়ে।

নববর্ষের কাছে আমাদের প্রার্থনা হোক সব মানুষের সুস্থতা চাই শাণিত চেতনা চাই। উৎসবের মঙ্গল আলোয় আলোকিত ভুবন চাই জয় হোক নববর্ষের জয় হোক মানুষের সৎ নৈতিক চেতনার।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: