মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জাগে বাংলাদেশের প্রাণ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • করুণাময় গোস্বামী

১৪১৮ সালে পহেলা বৈশাখে রাজশাহী যাচ্ছিলাম। ইচ্ছে ছিল নববর্ষ পালন করব সেখানে গিয়ে। যমুনা বঙ্গবন্ধু ব্রিজ পার হয়ে আনেকটা এগিয়েছি। ডাইনে-বাঁয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে পাকা পথ। দুর্দান্ত চলনবিল শুকিয়ে উঠে ফসল ফলানোর জন্য প্রশস্ত জায়গা করে দিচ্ছে। বোঝাই যায় না এর ভেতর দিয়েই গেছে পথ, চারদিকের মাঠই হচ্ছে সেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিল। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি। রোদ গরম হয়ে উঠছে সকাল থেকেই। হঠাৎ দেখতে পাই দূরে লাল নীল সবুজ ছায়া মূর্তির মতো কিছু নড়ছে। হবেও বা একটা কিছু এমন ভেবে নিয়ে আরও একটু এগিয়েছি; দেখতে পাই আরও কয়েকটি জায়গায় রঙিন ছায়া মূর্তিরা নড়ছে। আমার দৃষ্টিশক্তি ভাল নয় অনেক বছর ধরে। অনেক সময় অনেক রঙ দেখতে পাই না। কিন্তু মনে হয় নড়ছে এমন সব রঙ, সব ছায়া মূর্তি নজরে আসছে। আরও একটু এগিয়েছি, দেখতে পাচ্ছি আরও অনেক ছায়ামূর্তির সমারোহ ডাইনে-বাঁয়ে। দূরে নড়ছে, কেবলই নড়ছে যেন সবই এই পাকা রাস্তার দিকে আসতে চাইছে। রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে সামনে থামি। প্রবীণ কয়েকজন চা খাচ্ছেন দেখতে পাই। আগুয়ান রঙের ছোপ ছোপ হলো কী? এদের কাছে জানতে চাইলে একজন বললেন, আজ পহেলা বৈশাখ তো। নানা গ্রাম থেকে ভ্যানগাড়িতে চড়ে ছেলেমেয়েরা আসছে বৈশাখী মেলায় যাবে বলে। পোশাক দেখুন না কী উজ্জ্বল। এত দূর থেকেও ঝকঝক করছে। ছেলে কম, মেয়েরাই বেশি। মেলার দিনে গ্রামের মেয়েরা যেন মুক্তির আনন্দে কলকল করতে করতে আসে। দেখতে ভাল লাগে। আপনার ভাল লাগে অন্যজনের লাগে না, তারা মন্দও বলে, দ্বিতীয়জন বললেন। প্রথমজন আবার বললেন যার মন্দ বলার বলুক। ভালটা বোঝারও একটা শক্তি থাকা চাই। সবাই সেটা বুঝতে পারে না। চেয়ে দেখুন ডানে-বাঁয়ে যেদিকে চাইতেন শুধু চলমান রঙ আর রঙ। কাছে এলে দেখবেন সবাই রঙ-বেরঙের পোশাক পরা মানুষ খুশিতে ঝকঝক করছে।

বিলের ভেতর দিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসা পথ ধরে ভ্যানগাড়িগুলো পাকা রাস্তায় এসে উঠছে। একের পর এক উঠছে আর সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখান থেকে মাইল তিনেক সামনে গেলে এ রাস্তার ওপরই মেলা। দেখবেন গ্রামের মানুষের আনন্দ কেমন উপচে পড়ছে। আনন্দ করতে মেয়েদের দেখবেন বেশি। ওরা কত যে খুশি, অতি সামান্যেও মানুষ কত খুশি হতে পারে দেখলেই বুঝবেন। ভাল লাগবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। মানুষ মুক্তি পাচ্ছে। স্বাধীন না হলে এত আনন্দ হতো না। প্রথম বক্তা আমাকে বললেন। দ্বিতীয়জন এর সঙ্গে যোগ করে বললেন, আপনি ভাববেন না যে এর দ্বারা মুক্তি সকল মেয়েরা হয়ে গেছে। সকলের নয় কিন্তু।

কিছু মুক্তির পথ তো একটা খুলল। আপনি দেখবেন যে সব মেয়ে রঙিন শাড়ি পরে ভ্যানে বসে পা দুলিয়ে ঝুলিয়ে আসছে এরা। কিছু না কিছু লেখাপড়া জানে। বেশিদূর এগোতে পারেনি লেখাপড়ার পথে। কিন্তু যাত্রাটা শুরু হয়েছে। এরা টিভি দেখে, পত্রিকা রাখে। ছেলেরাও তেমনি। অনেকেই বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু জানে বোঝে। টিভি দেখে পত্রিকা পড়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দেশ-বিদেশ নয়। কম কথা নয়। ’৭১ সালে স্বাধীন হলো ৪০ বছরের মধ্যে দেখা যাচ্ছে কী একটা পরিবর্তন। আপনি সামনের দিকে যান, গেলেই দেখবেন বৈশাখী মেলা।

মাইল চার-পাঁচেক এসেই পাকা পথের ওপর একটি ছোট্টবাজারকে কেন্দ্র করে মেলা বসতে দেখলাম। বিশাল সমারোহ মানুষের। নানা বয়সের মানুষ; যথেষ্টসংখ্যক মহিলা। মুক্তির আনন্দে এসে মিলেছেন মেলার আয়োজনে। মনে হলো বাংলাদেশের প্রাণ জেগে উঠেছে। সেই জাগরণের ফল হচ্ছে এই চঞ্চলতা পথের ওপর আয়োজনে। রবীন্দ্রনাথ এই জাগরণটিই প্রত্যাশা করেছিলেন। যখন তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই নববর্ষোৎসবের আয়োজন করেছিলেন, তাঁর কথা ছিল মানুষ মিলিত হোকÑ সর্বজনীন আনন্দে এই বোধে যে আমরা সবাই একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে বাঁচি, আমরা সবাই আমাদের দেশের জন্য, আমাদের পৃথিবীর জন্য একত্রে মিলে থাকব। ঐক্যে সুখ, অনৈক্যে দুঃখ। আমরা গানের ভেতর দিয়ে দেশকে বুঝব, আমরা নাচের ভেতর দিয়ে দেশকে বুঝব, আমরা বাজনার ভেতর দিয়ে দেশকে বুঝব, আমাদের জাতীয় আয়োজন দেশহিত্যের জন্য। রবীন্দ্রনাথের এ আয়োজন নতুন করে উপস্থাপিত হয়েছিল ঢাকার রমনা বটমূলে ১৯৬৭ সালে। ততদিনে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে মিলেমিশে বাঙালী জাতীয়তাবাদী মহাআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণার ভেতর দিয়ে সে এক তাৎপর্যময় সংগ্রামী আকার ধারণ করেছে। রমনার বটমূলের সেই নববর্ষ আন্দোলন আজ জাতীয় নববর্ষ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে মহা আকার ধারণ করেছে। নববর্ষ পালন আজ এক মহা উৎসবের রূপ গ্রহণ করেছে। শুরুর দিকে সে এক অগ্রসর সমাজের আয়োজন ছিল। আজকে আয়োজন সমগ্র দেশে পরিব্যাপ্ত হয়েছে। জীবনকে নিয়ে যে আয়োজন, যে আহ্বান তার ক্রমবিস্তার এমনি হয়ে থাকে। নববর্ষ উৎসবের আহ্বানে আজ বাংলাদেশের প্রাণ জেগে উঠেছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজধানীর বিপুল জটিল আয়োজন থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথের ওপরকার আয়োজন পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বলে একটি ধারণার কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে। নববর্ষোৎসব বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের উজ্জ্বল অর্জন। এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের প্রাণ জেগে ওঠার স্পন্দন অনুভব করা যায়।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: