মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তিন সিটি নির্বাচন ॥ দলের প্রার্থী জেতাতে এবার মরিয়া আওয়ামী লীগ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

রাজন ভট্টাচার্য ॥ সমর্থিত প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে এবার মরিয়া ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে নানামুখী কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম কৌশল হিসেবে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে। একক প্রার্থী দিয়ে জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদসহ নাশকতার বিরুদ্ধে প্রচার চালাবে আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল। অন্যান্য নির্বাচনের মতো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যেন কোনভাবেই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অপপ্রচার না চালাতে পারে এ ব্যাপারেও চোখ-কান খোলা রয়েছে। তাছাড়া তিন সিটির মেয়র প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের ক্ষেত্রে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দল।

২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান বিপুল ভোটে পরাজিত হন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য- অভ্যন্তরীণ বিরোধসহ নানা কারণে ফলাফল ইতিবাচক হয়নি। এখানেই শেষ নয়; খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটের আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদের ভড়াডুবি হয়েছিল। এক্ষেত্রে উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবস্থানের পর শত শত মানুষকে হত্যা করার মিথ্যা খবর ভোটারদের মধ্যে প্রচার করে। দেখানো হয় কপিরাইট ভিডিও। এছাড়াও যে যেভাবে পারে অপপ্রচারে লিপ্ত ছিল। ধারাবাহিক এসব অপপ্রচার রোধে আওয়ামী লীগের কৌশল মোটেই সন্তোষজনক ছিল না। অপপ্রচার রোধে তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল তেমনি নির্বাচনী কৌশলেও ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি। দলীয় ঐক্যও সুদৃঢ় ছিল না। সঙ্গত কারণেই ফল বিপর্যয় নীরবে মেনে নেয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না। পাঁচ বছর আগে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম।

ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকনের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়ক সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, গাজীপুরে ৪৩ ভাগ কেন্দ্রে আমাদের মেয়র প্রার্থীর কোন এজেন্ট ছিল না। কাউন্সিলরদের এজেন্ট ছিল। তারা মেয়রের জন্য কাজ করেনি। কেবল কাউন্সিলরের জন্য ভোট চেয়েছে। যে কাউন্সিলররা মেয়রের জন্য কাজ করবে না, তাদের আমরা সাবধান করে দিচ্ছি। ঢাকায় ৯৩ জন কাউন্সিলর জিতলেও কাজ হবে না। আমাদের মেয়র জিততে হবে।

মেয়রকে কেন্দ্র করে ঢাকা দক্ষিণে ভোটের প্রস্তুতি নেয়ার ওপর জোর দেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। মেয়র ও কাউন্সিলরের আলাদা এজেন্ট দেয়ার কথাও জানান তিনি। বলেন, কাউন্সিলর প্রার্থীদের বলছি, আপনারা জেতেন সেটা আমরা চাই। আপনাদের লিফলেট দেবেন, সেখানে সাঈদ খোকনেরও একটা লিফলেট দেবেন। সরাসরি ভোটারদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে রাজ্জাক বলেন, ভোটারদের কাছে আমাদের লিফলেট পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের কাছে কেউ আসেনি- এই কথাটা কোন ভোটার যেন না বলতে পারেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাস, নাশকতা ও জঙ্গীবাদ নির্মূল করা এবং উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিতে এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মধ্যদিয়ে প্রমাণ করতে হবে জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে।

নির্বাচনের আগে জোরদার প্রচারে জয়ের আভাস ফুটিয়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, কেন্দ্রে আমাদের তৎপরতা দেখাতে হবে। কার প্রচারটা বেশি সেটাও দেখেন ভোটাররা। সারা ঢাকা শহর আমরা যদি আওয়াজ তুলতে পারি। ইনশা আল্লাহ আমরা ইলিশে ভরে দিতে পারব। তিন সিটিতেই জয় আসবে। সাঈদ খোকনের একটি নির্বাচনী বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস বলেন, আমরা আমাদের এলাকায় থানা সমন্বয় কমিটি করব, ওয়ার্ড কমিটি করব, এরপর কেন্দ্র কমিটি করব। নিজেদের মধ্যে কোন দুর্বলতা রাখা ঠিক হবে না।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময়ও দলীয় কোন্দল মেটাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ১৪ দল ও মহাজোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে পথ চলতে পারেনি। তাই ফলাফল যায় বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে। আওয়ামী লীগের এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের সামনে অনেক ইস্যু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে আচরণ, মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টির কৌশল, সমন্বয়হীন প্রচার, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের জনবিচ্ছিন্নতা, এলাকার উন্নয়ন কর্মকা-ে জনপ্রতিনিধিদের নজর না দেয়া ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ ছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, পুরনো স্থানীয় কোন্দল, জনপ্রতিনিধিদের জনবিচ্ছিন্নতা বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। জাহাঙ্গীর ইস্যুটি এ নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর ছিল।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও উপজেলা পরিষদের পদত্যাগী ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম মেয়র পদে প্রার্থী হলেও পরে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার চাপে সরে যাওয়ার বিষয়টি এলাকার ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। জাহাঙ্গীর সরে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে প্রকাশ্য বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বশেষ আজমতের পক্ষে জাহাঙ্গীর মাঠে নামলেও তাঁর বিশাল কর্মী-সমর্থক অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে নির্বাচনের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে আজমতের পক্ষে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের সমর্থন হিতে বিপরীত হয়েছে। তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করার আগেই স্থানীয় জাপার বড় অংশ মান্নানকে সমর্থন দেয়। শেষবেলায় এরশাদের সমর্থন কৌশল হিসেবেই ফুটে উঠেছিল। পাশাপাশি গাজীপুর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কোন্দলও ফল বিপর্যয়ের পেছনে অনেকাংশে দায়ী।

তিন সিটি কর্পোরেশনে দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে করণীয় জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফি আহমেদ বলেন, বিজয় নিশ্চিত করতে হলে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা, আন্দোলনের ব্যর্থতা, যুদ্ধপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা, সাম্প্রদায়িক উস্কানি, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা, জঙ্গীবাদের বিষয়গুলো ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি নগরকে যানজটমুক্ত করা, গ্যাস, পানি, বিদ্যুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাস্তায় অহেতুক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করা, পরিছন্ন নগরী গড়ে তোলা, কর্পোরেশনকে দলীয়করণ না করাসহ গরিব ও বস্তিবাসীদের জীবনের মানোন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আধুনিক নগরের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করারও বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

এবারের তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র থেকে শুরু করে কাউন্সিলর পর্যন্ত নিজেদের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে সাংগঠনিকভাবে আগের চেয়ে অনেকটা শক্তিশালী অবস্থানে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে তিন সিটিতে একক মেয়র প্রার্থী দেয়া হয়েছে। থামানো হয়েছে দলের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থীদের। তবে কাউন্সিলর পদে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী এখনও রয়ে গেছে। ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সমর্থন পান সাঈদ খোকন। তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিলেন দলের আরেক নেতা ও সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তিনি নির্বাচন থেকে পিছু হটেন। দলের অন্য প্রার্থীরাও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

উত্তরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মেয়র পদে সমর্থন পেয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক। দলের সমর্থক অন্য প্রার্থীরা একপর্যায়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে নির্বাচনে ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) পক্ষ থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে। মহাজোটের কথা বিবেচনায় নিলে তিন সিটিতেই শক্তিশালী মেয়র প্রার্থী রয়েছে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রথমে ক্ষমতাসীন দলের কাজ হবে নিজেদের মধ্যে কোন্দল নিরসন করে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে আসা। ১৪ দল বা মহাজোট থেকে একক প্রার্থী দেয়া হলে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করা সহজ হবে।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: