কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওয়াদা ভেঙ্গে ঢাকার সিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

বিভাষ বাড়ৈ ॥ ওয়াদা ভেঙ্গে রীতিমতো ব্যর্থ হয়েই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বিএনপি। আলাদা দুই সিটি কর্পোরেশনে দলের দুই প্রার্থীকে মেয়র বানাতে এখন আদাজল খেয়ে নামছে জামায়াতের রাজনৈতিক এ সহযোগী দলটি। অথচ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিভক্তির সময় বিভ্রান্তিকর প্রচার চালিয়ে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিতে জামায়াতসহ সকল উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে নিয়ে মাঠে নেমেছিল বিএনপি। চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ঘোষণা অনুসারে দুই সিটি কর্পোরেশন বানানোর বিরুদ্ধে হরতাল নিয়ে নাশকতাও চালিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। একই সঙ্গে বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল, এই সিদ্ধান্ত তারা কোনদিন মানবে না। এমনকি ক্ষমতায় আসলেই তারা এই সিটি কর্পোরেশনকে এক করবে। কিন্তু বিএনপি আজ সেই বিএনপিই দুই সিটির মেয়র হতে পাগল প্রায়।

মিথ্যাকে পুঁজি করে বিএনপির এমন কর্মকা-ের তীব্র সমালোচনা করে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, বিএনপির জন্ম থেকেই পুঁজি হচ্ছে মিথ্যা। এই দল সব সময়েই মিথ্যাকে আকড়ে ধরে ফাঁয়দা লোটার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। জনগণের ক্ষতি করে আগের অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে নতুন নতুন খেলায় মেতে ওঠে। এবারও বিএনপি তাই করেছে। এখন নাকে খত দিয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এদের থেকে মানুষকে সাবধান থাকা জরুরী। এর আগে ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে (ডিসিসি) উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। সবার কাছে নাগরিক সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হলেও একে ‘ঢাকা ভাগ করা হয়েছে’ উল্লেখ করে অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে উস্কে দেয়ার জন্য মাঠে নেমেছিল বিএনপি-জামায়াত। তখন থেকেই উস্কানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে বিএনপি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও খোদ তৎকালীন ডিসিসি মেয়র সাদেক হোসেন খোকাও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে সেই কথিত আন্দোলনে যোগ দেন। খোকার ইন্ধনেই সে বছরের ২৩ নবেম্বর থেকে ধর্মঘটের ডাক দেয় ডিসিসির কর্মচারীরা। ২৭ নবেম্বর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এর মধ্যেই ২৯ নবেম্বর সংসদে ডিসিসি নিয়ে বিল পাস হয়। প্রতিক্রিয়া জানায় বিএনপি। ওইদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ করে দলটি। সেখানে খোকা ছাড়াও দলের সিনিয়র নেতারা অংশ নেন। সংসদে বিল পাসের পরদিনই হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন খোকা। বিএনপি সেখানেই থেমে থাকেনি। প্রতিবাদে ৪ ডিসেম্বর রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় বিএনপি। সেদিন ঢাকা শহরের বেশ কিছু গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কোর্ট চত্বরে পুলিশের গাড়িতেও আগুন দেয় বিএনপি ক্যাডাররা। সাদেক হোসেন খোকা স্পষ্ট করে ওইদিন ঘোষণা দেন, ‘এই বিভক্তি তারা মেনে নেবেন না। খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারা ক্ষমতায় গেলে আবার ডিসিসিকে একীভূত করবেন।’ কিন্তু বিএনপি নেতারা তাদের সেই বক্তব্য এখন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অল্প দিনের ব্যবধানে কথা ভুলে গেছেন দলটির নেতারা। আগের ওয়াদা তো পরের কথা। নির্বাচনে জেতার জন্য সব কিছু ভুলে গেছেন তারা। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজে সবকিছু মনিটরিং করছেন। ভেবে চিন্তে প্রার্থীও বাছাই করেছেন তিনি। শোনা যাচ্ছে বিএনপি চেয়ারপার্সন ঢাকার প্রার্থীদের জন্য নিজে প্রচারেও নামবেন। ঢাকাবাসীর এখন প্রশ্ন, বিএনপি যদি এ নির্বাচন মেনেই নেবে হরতাল দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে ডিসিসি এক করার ঘোষণা কেন দিয়েছিল? তারা কি আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে? তাহলে ক্ষমতায় গেলে দ্বিখ-িত ডিসিসিকে আর এক করবে না?

এদিকে কর্পোরেশন বিভক্তি নিয়ে অপরাজনীতিতেই চুপ থাাকেনি বিএনপি। এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ‘তামাশা’ বললেও এখন ঢাকার দুটিসহ তিন সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছে বিএনপি। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের বিজয়ী করতে বিএনপি-জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি নতুন অরাজনৈতিক সংগঠনও। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলুর স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে সিটি নির্বাচনকে তামাশার নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। বুলু স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিতে সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আরেকটি প্রতারণামূলক নির্বাচনী নাটক মঞ্চ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন তথা সরকার। এ নির্বাচন দেশবাসীর ইচ্ছার সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অথচ বিএনপির এ বক্তব্যের পরই গড়ে তোলা হলো এমাজউদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন সংগঠন। গত সপ্তাহেও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন বানচাল করতেই সিটি নির্বাচন আয়োজন করেছে সরকার। অথচ নিজেদের নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে নতুন সংগঠনের নেতারা এরই মধ্যে কয়েক দফা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সিটি নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে খালেদাকে সহযোগিতাও করছেন। নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির হয়ে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের দাবি অনুসারে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়েও। প্রথমে শত নাগরিক কমিটি এরপর গঠিত হয় ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’। সিদ্ধান্ত হয় এই সংগঠনের ব্যানারে নির্বাচন প্রচারণা চালাবে বিএনপি। যার আহ্বায়ক ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ আর সদস্য সচিব শওকত মাহমুদ।

সম্প্রতি বিএনপির নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমাদের এ নির্বাচনে যে কোন মূল্যে জিতে আসতে হবে। বিএনপির সকলের প্রতি বলি এক সঙ্গে কাজ করেন। এ নির্বাচনে না জিততে পারলে বিএনপির জন্য দুঃখ আছে।’

কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নিয়ে বিএনপির সেই ওয়াদা তাহলে গেল কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান অবশ্য বলেছেন, তখনকার প্রেক্ষাপটে কী বলেছিল- সে বিষয়ে এখন ভাবছে না বিএনপি। এখনকার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। বিএনপি তাদের আগের ঘোষণা থেকে সরে এসেছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে যদি একীভূত করার প্রশ্ন আসে তখন একীভূত করা হবে। এখন এ বিষয়ে ভাবছে না বিএনপি। তবে মিথ্যার ওপর চালানো অপরাজনীতির সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বিএনপির কর্মকা-ের সমালোচনা করে বলছিলেন, বিএনপির জন্ম থেকেই পুঁজি হচ্ছে মিথ্যা। কিছু দল থাকে যার আগা গোড়াই মিথ্যা অপপ্রচার হলো পুঁজি। বিএনপি তাই। সিটি কর্পোরেশন নিয়ে জনগণকে উস্কানি দিয়ে আন্দোলন করেছে, হরতাল দিয়ে নাশকতা চালিয়েছে। বলেছে ক্ষমতায় গেলে ডিসিসি এক করবে। এটা ছিল জনগণের সঙ্গে প্রতারণা মাত্র। আসলে মিথ্য টিকে না। সত্যের যে শক্তি আছে তা এক সময় বেরিয়ে আসবেই। এখন বিএনপি যে নির্বাচনে এসেছে এটা তাদের চরিত্রেরই বহির্প্রকাশ। একবার এক কথা বলবে তো পরে আরেক কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক এ সাধারণ সম্পাদক আরও বলছিলেন, এই যে হরতাল অবরোধে নাশকতা চালিয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা দেশের ক্ষতি করা হলো কিসের জন্য? এখন সব বাদ দিয়ে ঠিকই নির্বাচনে এসেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালে কি না করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। কিন্তু পারেনি। পারবেও না। সত্যের যে একটা শক্তি আছে তা পরিষ্কার হবেই।

আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপির অবস্থানকে ন্যক্কারজনক অবিহিত করে বলছেন, এখন ঠিকই নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে এসেছে বিএনপি।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেছেন, এই দলটির নীতিই হচ্ছে স্ট্যান্টবাজি। স্বভাবতই তারা পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এতে অবাক হইনি আমি। তারা অনেক কিছুই দেরিতে বোঝে। তারা বিগত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছে তা এখন উপলব্ধি করছে। লন্ডনে বসে দেয়া নির্দেশনা দিয়ে যে কাজ হবে না- এ বিষয়টি দলটির নেতারা বুঝে গেছেন। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির প্রত্যেকটি কথা ও কাজে বৈপরীত্য থাকে। আবারও তারা সেটাই প্রমাণ করলেন।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: