কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মাদক জলাবদ্ধতা সন্ত্রাস ॥ সঙ্কটের শেষ নেই ঢাকা দক্ষিণে

প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২০১৫
  • ওয়ার্ড পরিক্রমা ১৩, ১৪ ও ১৫

এমদাদুল হক তুহিন ॥ প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী প্রচারে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে ঢাকা শহরের প্রতিটি অলি-গলি। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সভা সমাবেশে মহাব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন প্রর্থীরা। স্ব স্ব এলাকায় মাইকিং করেও প্রচার চালাতে দেখা যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৩, ১৪ ও ১৫ নং ওয়ার্ডের অবস্থাও একই। তিন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রর্থীর সংখ্যা ১৮। ১৫ নং ওয়ার্ডে ৫ জন প্রর্থীর মধ্যে ৪ জনই বিএনপির। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত দল জামায়াতের প্রার্থী নেই কোথাও। বিএনপির প্রর্থীরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাঠে তেমন একটা সক্রিয় নেই। জলাবদ্ধতা, মাদক-সন্ত্রাস, গ্যাস সঙ্কট, ভাসমান ছিনতাইকারী, ফুটপাথ দখল প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যা। গুরুত্বপূর্ণ হাজারীবাগ ট্যানারি দক্ষিণের ১৪ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত হওয়ায় অন্য যে কোন ওয়ার্ডের তুলনায় এই ওয়ার্ডটি অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার দিক দিয়েও পিছিয়ে আছে এখানকার শিশুরা। প্রথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এখানে নেই কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়। অভিজাত এলাকা ধানম-ি নিয়ে গঠিত ১৫ নং ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যা যানজট। প্রর্থীরা নাগরিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ভোটযুদ্ধের লড়াইয়ে সরব। সবার মুখেই নানা আশ্বাস। তবে ভোটাররা বলছেন, একমাত্র ভোটের সময় প্রার্থীদের দেখা মিলে। নির্বাচনের পর নব নির্বাচিতদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে ভোটারদের আশাবাদ।

ওয়ার্ড ১৩ ॥ দক্ষিণের ১৩ নং ওয়ার্ডটি পুরনো ৩৬ নং ওয়ার্ড নামে পরিচিত। ঢাকা শহরের জনগুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ এলাকা এই ওয়ার্ডের আওতাধীন। চামেলী বাগ, অমিন বাগ, ট্রাফিক পুলিশ ব্যারাক, পুলিশ হাসপাতাল, সি এ্যান্ড বি মাঠ, নয়া পল্টন, পুরানা পল্টন, জিপিও, বায়তুল মোকাররম, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, আউটার স্টেডিয়াম, পুরানা পল্টন লাইন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, শান্তিনগর ও কাকরাইল এলাকা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্ডটি গঠিত। ৪২ হাজার ভোটারসমৃদ্ধ এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হচ্ছেন ৮ জন। এর মধ্যে ৩ জন আওয়ামী লীগের, তারা হলেন- এস এইচ রুবাইয়াত রাকিব, মোঃ সামসুল হক ঢালী ও মোস্তবা জামান। কাউন্সিলর পদে বিএনপি থেকে লড়ছেন কাজী হাসিবুর রহমান ও লোকমান হোসেন ফকির। বাকি ৩ জনের দলীয় কোন পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্ডে নাগরিক সমস্যার মধ্যে জলাবদ্ধতা, ভাসমান ছিনতাইকারীর অবাধ বিচরণ, মাদক, সন্ত্রাস ও বিদ্যুত বিঘেœর ঘটনা অন্যতম। কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতে পুলিশ হাসপাতালকে ঘিরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাস্তায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে থাকা বর্ষাকালের নিয়মিত রুটিন। ফুটপাথে হকারের বিচরণ অন্য সব এলাকার মতই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৩ নং ওয়ার্ডে দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তবা জামানকে; তার নির্বাচনী প্রতীক ঘুড়ি। কাউন্সিলর পদে লড়াইয়ে নামা মোস্তবা জামান নির্বচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়ে তুলব। মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। হঠাৎ করে বিদ্যুত বিঘেœর ঘটনা যাতে না ঘটে সে দিকে বিশেষ লক্ষ্য রেখে সম্মিলিতভাবে এলাকার উন্নয়নে নিয়োজিত হব। অন্যসব প্রর্থীরাও এলাকার সকল সমস্যা দূর করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে সরব রয়েছেন। আওয়ামী লীগ থেকে দলীয়ভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করায় সাবেক কাউন্সিলর কামাল চৌধুরী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। দলীয় সিদ্ধান্তে সর্বাত্মক আস্থা প্রকাশ করলেও সিদ্ধান্তের খবরে ছিলেন অত্যন্ত বিমর্ষ। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এস এইচ রুবাইয়াত রকিবও নির্বাচনে বিজয়ী হবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয়ী।

এই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জামাত নেতা আব্দুর রব, বর্তমানে পলাতক আছেন। নয়া পল্টনেই বিএনপির দলীয় কার্যালয়। তবে ভোটাররা বলছেন, এর কোন নেতিবাচক প্রভাব সিটি নির্বাচনে পড়বে না।

ওয়ার্ড ১৪ ॥ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমানের ১৪ নং ওয়ার্ডটি পূর্বের ৪৮ নং ওয়ার্ড এলাকাধীন। নগরীর রায়েরবাজার, ধানম-ি ১৫, মধুবাজার, জিগাতলা বাসট্যান্ড, হাজারীবাজার, কামরাঙ্গীরচর (আংশিক), শিকারীটোলা, টালী অফিস, সিকদার মেডিক্যাল এস্টেট, সুলতানগঞ্জ, মিতালী রোড, আব্দুল হাট রোড, সিলেটি পাড়া, হাজারীবাগ, ট্যানারি এলাকা, জিগাতলা স্টাফ কোয়ার্টার, বাংলা সড়ক ও তল্লাবাগ মনেশ্বর রোড নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডটি অত্যন্ত জনবহুল ও ঘিঞ্জিপূর্ণ। জানা যায়, এই ওয়ার্ডে বসবাসকারীদের অধিকাংশই ফরিদপুর ও বরিশালবাসী। ৭৪ হাজার ৬০০ ভোটারের বিপরীতে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৫ জন। এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ থেকে উন্মুক্তভাবে লড়ছেন ইলিয়াছুর রহমান ও মোঃ সেলিম। বিএনপি থেকে মোহম্মদ রকিবুল হক, জাতীয় পার্টির হয়ে মোহাম্মদ শাহ আলম খান এবং স্বতন্ত্র থেকে আনোয়ার হোসেন খান। আনোয়ার হোসেন রেডিও, ইলিয়াছুর রহমান ঘুড়ি, মোহম্মদ রকিবুল হক এয়ারকন্ডিশনার, মোহাম্মদ শাহ আলম খান ট্রাক্টর ও মোঃ সেলিম ঠেলাগাড়ি প্রতীক পেয়ে মাঠে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ হাজারীবাগ ট্যানারিটি ওই ওয়ার্ডের আওতাধীন হওয়ায় অধিকাংশ স্থান দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ। আগামী ২ বছরের মধ্যে তা সাভারে স্থানান্তর হওয়ার কথা রয়েছে। অধিকাংশের দাবি ওই ৫০ একর এলাকার উপর জনগুরুত্বপূর্ণ কোন প্রজেক্ট বরাদ্দ পাবে, যা নাগরিক সেবার শীর্ষে অবস্থান করবে। এলাকাবাসী প্রজেক্ট বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামতকে প্রধান্য দিচ্ছেন। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা, মাদক দ্রব্য, প্রাইমারী স্কুলের অপর্যাপ্ততা, চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকা- নির্মূলকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যেতে চান কাউন্সিলররা।

আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থনে কাউন্সিলর পদে লড়াইয়ে নামা ইলিয়াছুর রহমান জনকণ্ঠকে তার প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকা- নির্মূলকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যেতে চাই। মানুষ যেন মানুষকে ভালবাসে, মানুষ যেন মানুষকে ইজ্জত করে আমি এমন সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করতে চাই। এলাকায় একটি প্রাইমারী স্কুল নির্মাণকে প্রধান্য দিচ্ছি। অপর প্রার্থী মোঃ সেলিম বলেন, মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি নির্মূল ছাড়াও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতিকরণকে আমি প্রধান্য দিচ্ছি। একটি মডেল ওয়ার্ড গঠনের লক্ষ্যে আমি আমার সাধ্যমত কাজ করব।

ওয়ার্ড ১৫ ॥ ঢাকা দক্ষিণের বর্তমান ১৫ নং ওয়ার্ডটি পূর্বে ৪৯ নং ওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিল। নগরীর ধানম-ি আবাসিক এলাকা, ধানম-ি ১৫, স্টাফ কোয়ার্টার, পূর্ব রায়েরবাজার, সাত মসজিদ, ঈদগাহ মসজিদ, ঈদগাহ রোড, মিতালী রোড, হাজী অফসার উদ্দিন রোড, হাতেমবাগ, মধুবাজার, সুলতানগঞ্জ ও পশ্চিম ধানম-ি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্ডটি গঠিত। মোট ৪৭ হাজার ২২১ জন ভোটারের বিপরীতে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৫ জন। ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ থেকে ঘুড়ি প্রতীকে এককভাবে লড়ছেন জাকির হোসেন স্বপন। বিএনপি থেকে ৪ জন, তারা হলেন মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ভূইয়া, মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন ভূইয়া, মোঃ আবুল খায়ের বাবল ও মোঃ শফিক উদ্দিন ভূইয়া।

তুলনামূলকভাবে এই ওয়ার্ডটি আধুনিক ও উন্নত; তবু নাগরিক সমস্যার অন্ত নেই। সকল সমস্যাকে ছাপিয়ে এখানের মূল সমস্যার নাম যানজট। ১৫ নং স্টাফ কোয়ার্টারের জলাবদ্ধতা, মাদক-সন্ত্রাস, গ্যাস সঙ্কট, ফুটপাথ দখল, অবৈধ গাড়ি পার্কিংসহ একাধিক সমস্যা রয়েছে। ধানম-িবাসীর একমাত্র নির্মল বিনোদনের স্থান ধানম-ি লেকের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার কথা সবার মুখে মুখে। কাউন্সিলররাও এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী জাকির হোসেন স্বপন তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, ১৫ নং স্টাফ কোয়ার্টারের জলবদ্ধতা দূরকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়ে তুলব। ধানম-ির যানজট নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। লেকের ব্যাপক উন্নয়ন ও সুন্দর পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। বিএনপির প্রার্থী মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন ভূইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচিত হলে ধানম-ির যে কোন সমস্যা সমাধানে নিজেকে নিয়োজিত করব। লেকের পাড়ের মাদকের আখড়া নির্মূলের সর্বাত্মক চেষ্টা করব। স্টাফ কোয়ার্টারে সামনে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রাধান্য পাবে। বিএনপি থেকে একক কোন প্রার্থী না দেয়ায় তাদের মধ্যেই অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী জাকির হোসেন স্বপনের পক্ষে অন্যান্য নেতারা মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন।

প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২০১৫

১৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: