রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কামারুজ্জামানের ফাঁসি

প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০১৫
কামারুজ্জামানের ফাঁসি
  • রাজুর নেতৃত্বে তিন জল্লাদ ফাঁসি কার্যকর করে
  • শেষ হলো ছয় দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার
  • উল্লসিত দেশবাসী

মশিউর রহমান খান/আরাফাত মুন্না ॥ ৩০ লাখ শহীদ আর সাড়ে ছয় লাখ মা-বোনের আব্রুর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছরের প্রতীক্ষার পর দ্বিতীয় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হলো। গত ছয় দিনের নানা নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুরাতন ফাঁসির মঞ্চে একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জল্লাদ রাজুর নেতৃত্বে তিন জল্লাদের সহযোগিতায় কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এর আগে একই মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর চার খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। সমস্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষে সোহাগপুরের ১২০ জন পুরুষকে হত্যা ও ধর্ষনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর কামারুজ্জামান সুপ্রীমকোর্টে আপীল করলে শুনানি শেষে গত বছরের ৩ নবেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ই বহাল রাখেন উচ্চ আদালত। এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সুপ্রীমকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে গত ৫ মার্চ কামারুজ্জামান রিভিউ আবেদন করলে ৬ এপ্রিল তা খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। এরপর থেকে গত ছয় দিন এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দ- কার্যকরে চলে নানা নাটকীয়তা। পরে শনিবার সমস্ত নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে রাত সাড়ে ১০টায় এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। কারাসূত্র জানায়, আনুমানিক ২৩ মিনিট ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয় কুখ্যাত এই আলবদর নেতাকে।

এর আগে শনিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে যান। তাঁদের দেখা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৮নং কনডেম সেলে। তার আগে ফাঁসি কার্যকরের জন্য সন্ধ্যায়ই তিন জল্লাদকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেয় কারা কতৃপক্ষ। জল্লাদদের নেতৃত্বে ছিলেন রাজু। অন্যরা হলেন, পল্টু ও সাত্তার। তারা পাকা কলা চটকে ও গ্রিজ দিয়ে ফাঁসির দড়িটিকে পিচ্ছিল করে টাঙিয়ে দেন ফাঁসিকাষ্ঠে। মহরা হিসেবে বালির ভারি বস্তা ঝুলিয়ে তা পরীক্ষাও করে নেয়া হয়। রীতি অনুযায়ী, ফাঁসি কার্যকরের আগে কামারুজ্জামানের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয়েছে। দেয়া হয় স্বাভাবিক খাবার। শেষ মুহূর্তে গিয়ে ইমাম তাকে নফল নামাজ এবং তওবা পড়ান।

ফাঁসির আসামি একাত্তরের আলবদর কমান্ডার মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরকে কেন্দ্র করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটক ঘিরে রাখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারা গোয়েন্দা, কারা দাঙ্গাবাহিনী, সাধারণ কারারক্ষীসহ পুলিশ, র‌্যাব এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশও অবস্থান নেয় আশপাশে। কামারুজ্জামানের দ- কার্যকর উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কারাগারের আশেপাশে সকল ভবন থেকে পর্যবেক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়।

মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনায় কামারুজ্জামানের করা আবেদন আপীল বিভাগে খারিজ হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় শুক্রবার তার দ- কার্যকরের প্রস্তুতি দেখা গেলেও পরে তা হয়নি। মৃত্যুদ-ের রায় পুনর্বিবেচনায় (রিভিউ) কামারুজ্জামানের আবেদন সোমবার সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হওয়ার পর তার কাছে শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগই ছিল। বৃহস্পতিবার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার পর কামারুজ্জামান সময় নিয়ে তার সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন। এরপর শুক্রবার তার সিদ্ধান্ত জানতে দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট যান কারাগারে। শনিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাত শেষে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর হলো।

রাত ১১টা ৪০ মিনিটে কামারুজ্জামানের লাশবাহী এম্বুলেন্সটি কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগার থেকে বের হয়। কামারুজ্জামানের মরদেহ কারাগার থেকে অ্যাম্বুলেন্সে চড়িয়ে বের করে আনা হয়। এরপর কারাকতৃপক্ষের উদ্যোগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া প্রহরায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স রওনা হয় শেরপুরের গ্রামের বাড়িতে। পুলিশের নিরাপত্তা দানকারী গাড়ি ছাড়াও আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স গিয়েছে লাশের সঙ্গে। এর বাইরে র‌্যাব, পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ, ঢাকা জেলা পুলিশ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দশটি গাড়ি যাচ্ছে সঙ্গে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কামারুজ্জামানের মরদেহবাহী গাড়ি কারাগার থেকে হাইকোর্টের সম্মুখ হয়ে শাহবাগ, মহাখালী, টঙ্গী, গাজীপুর হয়ে শেরপুর পৌঁছাবে। রুটভুক্ত জেলা থেকে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের গাড়ি প্রটেকশন দিয়ে জেলার সীমানা পার করে দেয় কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর লাশ। শনিবার রাতেই মুদীপাড়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর কামারুজ্জামানের মরদেহ তার পরিবার পরিজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে জানা যায়। ভোররাতে নামাজে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।

রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সরকারী নির্বাহী আদেশে রাত সাড়ে ১০টায় কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। উনি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাননি। এখন ওনার লাশ শেরপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে ডেপুটি জেলার রয়েছেন। তিনি পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করবেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সঙ্গে রয়েছেন।

যেভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়

কারাসূত্র জানায়, ফাঁসি দেওয়ার আগে ৮নং কনডেম সেলে গিয়ে কামারুজ্জামানকে গোসল করিয়ে কারাগারের মাওলানার মাধ্যমে তওবা পড়িয়ে নেন কারা কর্তৃপক্ষ। এ সময় তার কাছ থেকে তার লাশ দাফনের বিষয়েও জেনে নেন কারা কতৃপক্ষ। শেরপুরের গ্রামের বাড়িতেই লাশ দাফনের ইচ্ছাও জানান তিনি। ধর্মীয় রীতি অনুসারে তওবা পড়ান কেন্দ্রীয় কারাগার মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মনির হোসেন। এর আগেই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেন কারা চিকিৎসক আহসান হাবীব। কারা কতৃপক্ষ রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে বলে কামারুজ্জামানকে জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, এটাই আপনার শেষ রাত। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে।

মাওলানা মনির হোসেন তাকে বলেন, আপনার কৃতকর্মের জন্য আদালত আপনাকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন। আপনি একজন মুসলমান ব্যক্তি। এ কারণে আপনি আল্লাহ’র এই দুনিয়ায় কৃতকর্মের জন্য তওবা করেন। এরপর ইমাম সাহেব তাকে তওবা পড়ান। তওবা পড়ার কিছুক্ষন পর কনডেম সেলে জল্লাদরা আসেন। তারা কামারুজ্জামানকে নিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চে। আগে থেকেই মঞ্চের পাশে রাখা ছিল মরদেহ বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স।

ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার আগে দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যানকাফ পড়িয়ে, যমটুপি (কালো রংয়ের একটি বিশেষ টুপি) পড়ানো হয়। এ সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন কারা কর্তৃপক্ষ, সিভিল সার্জন ও একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ফাঁসির মঞ্চে প্রস্তুত ছিলেন জল্লাদও। মঞ্চে তোলার পর কাঠের পাটাতনের ওপর দাড় করিয়ে তার দুই পাও বাধা হয়। পরানো হয় ফাঁসির দড়ি। জানা গেছে, কনডেম সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার-চেচামেচি করেন কামারুজ্জামান।

কারা কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল একটি রুমাল। রুমালটি হাত থেকে নিচে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের লিভারে টান দেন। লিভারটি টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঝুলে যান কামারুজ্জামান। এতে মুহুর্তের মধ্যেই তার ঘাড়ের হাড় ভেঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। আনুমানিক ২৩ মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর মত্যৃ নিশ্চিত হলে শাল নামিয়ে এনে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়।

ফাঁসি কার্যকর করার সময় ফাঁসির মঞ্চে ও কারাগারের ভেতরে ছিলেন অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন) কর্নেল ফজলুল কবির, ডিআইজি (প্রিজন, ঢাকা) গোলাম হায়দার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোঃ ফরমান আলী, জেলার নেসার আলম ও চারজন ডেপুটি জেলারসহ অন্য কারা কর্মকর্তারা।

ছিলেন ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন, ঢাকার সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, কারাগারের চিকিৎসক আহসান হাবিব, ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল হক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং ডিএমপি কমিশনারের প্রতিনিধি ডিসি-ডিবি (পশ্চিম) শেখ নাজমুল আলম। ডিএমপি’র জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শেখ মারুফ হাসান, ডিসি-ডিবি (সাউথ) কৃষ্ণপদ রায়, র‌্যাবের পরিচালক (ইন্টিলিজেন্স) আবুল কালাম আজাদ এবং ডিবি’র বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সানোয়ার হোসেন এবং ১২জন স্বসস্ত্র কারারক্ষী উপস্থিত ছিলেন।

নিরাপত্তার চাদরে কারাগার

কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকরকে কেন্দ্র করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সন্ধ্যায় জেলখানার মূল ফটক ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়।

পুরো কারাফটক জুড়ে ছিলেন ২২ প্লাটুনের মতো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। পুলিশের পাশাপাশি ছিলেন র‌্যাব এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ। বন্ধ করে দেয়া হয় কারাগারের সামনের সড়কে সাধারণ যান চলাচলও।

পরিবারের সাক্ষাত

আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেছেন স্বজনরা। শনিবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা বিভাগের দুই জন কর্মকর্তা ফাঁসির দ- কার্যকরের নির্বাহী আদেশের কপি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজির হন। এর পর কারা কতৃপক্ষ কামারুজ্জামানের স্ত্রীকে তার পরিবারের সদস্য সহ মোবাইল ফোনে শেষ সাক্ষাতকারের জন্য ডাকেন। এছাড়া একজন ডেপুটি জেলারকে চিঠি নিয়ে তার পল্লবীর বাসায় পাঠানো হয়। এরপর বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান কামারুজ্জামানের স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনরা। বিকেল ৪টা ২২ মিনিট থেকে ৪টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত তারা কামারুজ্জামানের সঙ্গে অবস্থান করেন। মোট ২৯ জন এলেও পরিবারের সদস্য না হওয়ায় কারাগারে ঢুকতে দেয়া হয় ২৪ জনকে।

স্বজনদের মধ্যে স্ত্রী নুরুন্নাহার, ছেলে হাসান ইকবাল, হাসান ইমাম ও আহমেদ হাসান, মেয়ে আতিয়া নূর, পুরত্রবধু শামীম আরা, ভাই কামরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আফিয়া নূর, ভাতিজা আরমান, ৯ ভাতিজি, শ্যালক, ১ ভাগ্নে,১ নাতিসহ ছোট বড় মোট ২৪জন কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। কারাগার থেকে বের হয়ে কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল বলেন, উনি (কামারুজ্জামান) সুস্থ আছে এবং বিচলিত নন।

শনিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কামারুজ্জামান। তবে হাসান ইকবাল দাবি করেছেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা তার বাবার সঙ্গে কোন কথাই বলেননি। সরকার নিজেদের পথ পরিষ্কার করতে নাটক করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে তার ছেলে বলেন, একাত্তরে ১৮ বছর বয়সী একটা ছেলেকে মিথ্যা মামলা দিয়ে যুদ্ধাপরাধী সাজানো হয়েছে। এর উপযুক্ত জবাব তরুণ প্রজন্ম দেবে বলেন, ব্লগে লেখালেখিতে সক্রিয় কামারুজ্জামানের এই ছেলে। কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- বহাল রেখে আপীলের রায় আদালত আলবদর নেতা হিসেবে তার একাত্তরের ভূমিকাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করেছিল।

ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। তবে সেটি সঠিকভাবে বিন্যস্ত না হওয়ায় আমলে নেয়ার পরিবর্তে ফিরিয়ে দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। ৩১ জানুয়ারি ৮৪ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১২ সালের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ আনা হয়। ২ জুলাই কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৮১ পৃষ্ঠার ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উত্থাপন করেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম ও নূরজাহান বেগম মুক্তা। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে ২০১৩ সালের ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫ জন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।

২০১৩ সালের ২৪ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এবং ১৬ এপ্রিল ৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। অন্যদিকে ৩ থেকে ১৬ এপ্রিল ৪ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। ৯ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।

আপীল মামলার কার্যক্রম

ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির আদেশ থেকে খালাস চেয়ে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ৬ জুন আপীল বিভাগে আপীল করেন কামারুজ্জামান। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় কামারুজ্জামানের দ-ের বিরুদ্ধে আপীল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

১২৪টি যুক্তিতে আপীল করেন আসামিপক্ষ। তাদের মূল আবেদন ১০৫ পৃষ্ঠার। আর এর সঙ্গে দুই হাজার পাঁচ শ’ ৬৪ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জমা দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আপীলের সারসংক্ষেপ জমা দেন আসামিপক্ষ। সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন নিজে এ আপীল মামলার শুনানিতে না থেকে আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের পৃথক আপীল বেঞ্চ গঠন করে দেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আব্দুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

এ বেঞ্চে গত বছরের ৫ জুন থেকে আপীল শুনানি শুরু হয়। ওই দিন থেকে মোট ১৭ কার্যদিবসে আপীল শুনানি শেষ হয়। এর মধ্যে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ও ১৭ সেপ্টেম্বর ১৫ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে শুনানি করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান ও এ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষে ৪ কার্যদিবস শুনানি করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

আপীল শুনানি শেষ হওয়ায় গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর আপীল মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন আপীল বিভাগ। পরে ৩ নবেম্বর কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেয়া মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় সংক্ষিপ্ত আকারে দিয়েছিলেন আপীল বিভাগ। এর পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কামারুজ্জামানের এ ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। ওইদিন দুপুরে চার বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষর দেয়া শেষ করলে ৫৭৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।

লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতেই আপীল বিভাগ থেকে ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পৌঁছে দেয়া হয় বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। একই সঙ্গে পাঠানো হয় ট্রাইব্যুনালের রায় ও অন্যান্য ডকুমেন্টস, যেগুলো আপীল শুনানির জন্য পাঠানো হয়েছিল আপীল বিভাগে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজুর রহমান পূর্ণাঙ্গ রায় গ্রহণ করে মৃত্যু পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ট্রাইব্যুনাল-২ এর ৩ বিচারপতি মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেন। অন্য দুই বিচারপতি হচ্ছেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম। পরে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজুর রহমান মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। এর পর লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মৃত্যু পরোয়ানার সঙ্গে আপীল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপিও পাঠান ট্রাইব্যুনাল।

কারাগারে পৌঁছানোর পর কামারুজ্জামানকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। তিনি আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করে রিভিউ আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কপিটি আইজিপি (প্রিজন) এর বরাবরে পাঠানো হয়। এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয় মৃত্যু পরোয়ানার অনুলিপি।

রিভিউ মামলার কার্যক্রম

আইন অনুসারে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময় পান আসামিপক্ষ। সে অনুসারে গত ৫ মার্চ আপীল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদন দাখিল করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা। পরে সুপ্রীমকোর্টের চেম্বার বিচারপতির আদালতে শুনানির দিন ধার্যের আবেদন জানান এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ মার্চ চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রিভিউ আবেদনটি শুনানির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

মোট ৭০৫ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বাতিল ও তার খালাস চান আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে দু’দফায় পিছিয়েছে শুনানির দিন। অবশেষে গত রবিবার ৫ এপ্রিল সকালে শুনানি শেষ হলে ৬ এপ্রিল সোমবার রায়ের দিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত। সোমবারের রায়ে আপীল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ায় কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় চূড়ান্তভাবে বহাল রয়েছে।

বদর কমান্ডার থেকে জামায়াতের মূখপত্র

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। এই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।

স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে থেকে মাস্টার্স পাস করার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমনের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান। ১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। একসময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদে থাকলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে তাকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন।

কামারুজ্জামানের লাশ দাফন শেরপুরেই

নিজস্ব সংবাদদাতা, শেরপুর জানান, ফাঁসি কার্যকরের পর শেরপুরের মাটিতে কামারুজ্জামানের লাশ দাফন করতে না দেয়ার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১১ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ রজনীগন্ধায় অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকীর হোসেনের অনুরোধে মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ তাঁদের আল্টিমেটাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নুরুল ইসলাম হীরু ওই আল্টিমেটাম প্রত্যাহারের পাশাপাশি কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হলে রবিবার সকালে জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলায় আনন্দ মিছিল করারও ঘোষণা দেন। ওই সময় পুলিশ সুপার মোঃ মেহেদুল করিমসহ প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পৃৃক্ত একাধিক সংস্থার কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরপরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকীর হোসেন ও পুলিশ সুপার মেহেদুল করিম জানান, কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের পর এলাকায় পারিবারিকভাবে লাশ দাফনের প্রস্তুতি গ্রহণের প্রেক্ষাপটে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উচ্চপর্যায়ের কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। এজন্য প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থা সমন্বয় সাধন করে কাজ করছে এবং আমরা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছি।

প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০১৫

১২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: