রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুজিবনগরে নববর্ষ

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০১৫
  • ১ থেকে ৪ বৈশাখ- চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের দাবি স্থানীয়দের

বাঙালী জীবনে কল্যাণ ও নতুনের প্রতীক হয়ে আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে আবার ফিরে এসেছে বাংলা নববর্ষ। নতুন সূর্যোদয় জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ঠেলে সূচনা করেছে নতুন বাংলা বছর। সবার অংশগ্রহণে মিলিত বাঙালী যে কয়টা অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে, নববর্ষ-উৎসব তার অন্যতম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালী জনগোষ্ঠী ধর্মীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধে উঠে মিলিতভাবে পালন করে আসছে বাংলা নববর্ষ-উৎসব। উত্তরকালে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের মতো সর্বজনীন উৎসব পালনের দিন আমরা পেয়েছি বটে, তবে এ ক্ষেত্রে নববর্ষ উৎসব যে ভিন্ন মাত্রাসঞ্চারী, তা বলাবাহুল্য। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতার সূতিকাগার খ্যাত মেহেরপুরের সকল মানুষের অভিন্ন উৎসবের দিন এটি। গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর জেলার সর্বত্র এই উৎসবের আমেজ। হাসি আনন্দ গান আর মেলার আনন্দময় পরিবেশে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া। পূব আকাশের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম-গঞ্জ মুখরিত হয় বৈশাখী মেলার তালপাতার বাঁশির সুরে। পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রভাতের অগ্নিছটাই মেহেরপুরের দিক-দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়। আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শূচী করে তুলতে বারবার আসে বৈশাখ। তাই আজি এই উষার পূর্ণ লগনে, উদীচে নবীন সূর্য গগনে। এই নব প্রভাতে প্রার্থনা যা কিছু পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। নব প্রভাতের দূরন্ত ঝঞ্ঝার কাঁধে ভর করে এ জেলার মানুষের জীবনে চারদিকে নতুনের কেতন উড়িয়ে আসে বৈশাখ।

দিনটিকে মেহেরপুরবাসী বিপুল আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে বরণ করে। ব্যবসায়ীদের হালখাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা আয়োজনে উল্লাসের দিন এটি। কালের পালাবদলে নববর্ষের উৎসব গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে আজ শহরেও ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। রুদ্র বৈশাখ নতুন বছরে পদার্পণের মধ্য দিয়ে এ জেলার মানুষের জীবনে নতুন-অনুভব জাগানিয়া সুরের মূর্ছনা সৃষ্টি করে। সারা দেশের ন্যায় মেহেরপুরেও নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার জন্য ব্যাপক আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলার সবচেয়ে বড় মঙ্গলযাত্রার আয়োজন হয়, আতশবাজি, লাঠি খেলা, ঘুড়ি উৎসব, গ্রামীণ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটকসহ জমকালো পালাগানের আয়োজন করা হয়। গ্রামে ও শহরের ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বিদায়ী বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে পহেলা বৈশাখে নতুন খাতা খোলে পৌর মেয়র প্রতিবছর পান্তা আর ইলিশের আয়োজন করেন। নিম্ন আয়ের এ জেলার মানুষের নিজ বাড়িতে পান্তা ইলিশ দিয়ে দিনটিকে পালন করার কথা থাকলেও ইলিশের আকাশ ছোঁয়া দাম হওয়ায় অনেকেই উপভোগ করতে পারছে না পান্তা ইলিশের স্বাদ। তবুও থেমে নেই তাদের আকাক্সক্ষা তারা পান্তার সঙ্গে অন্য কোন আয়োজন দিয়ে বরণ করে নেয় বাংলা নববর্ষকে। বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করে নেয়ার জন্য সব বয়সের মানুষসহ তরুণ-তরুণীরা আজ উন্মুখ। সবার মুখে একই সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’

কৃষিভিত্তিক এ জেলার গ্রামের মানুষ এদিন থেকেই নতুন বছরের কৃষি কাজ শুরু করেন। হয়ত মাঠ চাষের অনুপযোগী, বৃষ্টির জন্য কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তবু নববর্ষ এলে শুভ সূচনা হিসেবে কৃষক মাঠে যায়, সামান্য চাষ করে নতুন বছরের কৃষি কাজ শুরু করেন। নববর্ষ আয়োজনের অর্থনৈতিক দিকগুলোর চেয়ে ধিরে ধীরে সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নববর্ষের সময় নানা গ্রামে বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন জামা-কাপড় পরা, আত্মীয়-স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো প্রকৃতভাবে সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে গাংনীর চিতলা ফার্মে সবচেয়ে বড় মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। এ মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি হয়, বিক্রি হয় নানা ধরনের খেলনা। দিনব্যাপী এ মেলায় পুতুলনাচ, যাত্রাপালা, পালাগান, বসে গ্রামীণ জীবনে দেখা দেয় নতুন উৎসাহ, নতুন উদ্দীপনা। আত্মীয়স্বজন-পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হয়, তৈরি হয় সামাজিক মেলামেশার বৃহৎ এক বাতাবরণ।

বৈশাখ যুগে যুগে মুজিবনগর খ্যাত মেহেরপুরের মানুষের কাছে হাজির হয়েছে নবরূপে, এ জেলার মানুষ বৈশাখকে নানা সময় নানাভাবে গ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত দিনে, বাঙালীর জীবনে নববর্ষ বা বৈশাখ এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শক্তির উৎস হয়ে। এ রকম একটি সময়েই স্বাধীনতার এ পুণ্যভূমিতে শপথ নিয়েছিল এদেশের প্রথম সরকারের মন্ত্রিপরিষদ একাত্তরে বৈশাখী প্রেরণায় শত্রু নিধনে বাঙালীর জাগরণের কথা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে কবির ছন্দবদ্ধ শব্দগুচ্ছে-

‘যুদ্ধের প্রথম মাসে এসেছিল পয়লা বৈশাখ

মেঘের ডম্বরু ফেলে হাতে হাতে উঠেছিল

স্বাধীনতা যুদ্ধের বজ্রনিনাদ

যুদ্ধমুখী পা আর স্বাধীনতা দেখে ফেলা চোখ

আমাদের জেগে উঠার

প্রথম সাক্ষী ছিল বৈশাখী মেঘ।’

এ জেলার মানুষের আত্মবিকাশের সঙ্গে, বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের উৎসধারায় বৈশাখ বা নববর্ষ সব সময় জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। এখন মেহেরপুরের সচেতন মানুষ অন্য জেলার মতো মাত্র ১ দিনেই নববর্ষের এ আনন্দকে বিসর্জন দিতে চায় না। এক বর্ণাঢ্য উৎসবে মেতে উঠতে চায় দেশের পশ্চিম সীমান্তবর্তী এ জেলার মানুষ সেই সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চায় সারাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। তারা বলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পাদপীঠ নদীয়া-শান্তিপুর ও বাগোয়ান-কৃষ্ণনগর-কলকাতা কেন্দ্রভিত্তিক ঐতিহ্যের অংশ এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যুদয়ের সূতিকাগার মুজিবনগর সরকারের ভিত্তিভূমি মেহেরপুর সূচনা করতে পারে এক শিকড় সন্ধানী ঐতিহ্য উৎসব।

তারা দাবি করেন প্রাথমিকভাবে প্রতিবছর ১৪ থেকে ১৭ এপ্রিল, এই চার দিনজুড়ে নানা আয়োজনে সরকারী ও বেসরকারী স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় উৎসবটি পালন করতে হবে। পহেলা বৈশাখ, ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের রকমারি আয়োজন ও হালখাতা। পরদিন, ১৫ এপ্রিল দেশের অন্যতম প্রাচীন নগরী মেহেরপুর পৌরসভার (যা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রঙ-বেরঙের ফেস্টুন ও ব্যানার শোভিত শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষের শোভাযাত্রা ও সমাবেশ। তার পরদিন, ১৬ এপ্রিল বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে মেহেরপুরের অবদান এবং তার তাৎপর্য নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা সভা। শেষদিন, ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের বার্ষিকীতে সেই সরকারের শপথ গ্রহণ স্থলে আয়োজনে মুজিবনগর দিবস উদযাপন।

তারা আরও বলেনÑ এই চার দিনজুড়েই মেহেরপুরে চলতে পারে লোকজ মেলা। তার সঙ্গে যোগ হতে পারে জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক এবং পর্যটনের নানান পশরা।

নববর্ষ ও প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের এ পুণ্যভূমি বর্তমান স্বাধীনতার পক্ষের এ সরকার জাতীয়ভাবে মুজিবনগর খ্যাত মেহেরপুরে ১৪ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত আরও বর্ণময় ও বিস্তৃত পরিসরে পহেলা বৈশাখ ও মুজিবনগর উৎসব পালন করবে, এমনটাই প্রত্যাশা করে এ জেলার স্বাধীনতারপক্ষের জনগণ, স্বাগতম এক বৈশাখ ১৪২২।

Ñফজলুল হক, মেহেরপুর থেকে

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০১৫

১১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: