আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কামারুজ্জামান ক্ষমা চায়নি ॥ যে কোন সময় ফাঁসি

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০১৫
কামারুজ্জামান ক্ষমা  চায়নি ॥ যে কোন সময় ফাঁসি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহম্মদ কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চায়নি। এখন তার ইচ্ছানুযায়ী সরকার সব ব্যবস্থা নিচ্ছে। যে কারণে সব প্রস্তুতির পরেও যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় শুক্রবার রাতে কার্যকর হয়নি। তবে যে কোন সময় রায় কার্যকর হবে। ইতোপূর্বেও দফায় দফায় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ফাঁসি কার্যকর হয়নি। সমস্ত আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কারাবিধি অনুযায়ী কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হচ্ছে। এ জন্যই দফায় দফায় প্রস্তুতির পরেও রায় কার্যকর হয়নি। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন না করায় কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে আর কোন বাধা রইল না। যে কোন সময় রায় কার্যকর করা হবে। এজন্য সব কিছুই প্রস্তুত রয়েছে।

কারা সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের পরেও সরকারের নির্বাহী আদেশ শেষ মুর্হূতে কারাগারে না যাওয়ায় রায় কার্যকর হয়নি। তবে শুক্রবার রাতে ফাঁসির রায় কার্যকরের চূড়ান্ত মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী রাত প্রায় দশটার দিকে সাংবাদিকদের জানান, রায় কার্যকরের সব প্রস্তুতি রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষও রীতিমতো প্রস্তুত। তবে রায় কার্যকরের সিদ্ধান্ত কারা কর্তৃপক্ষের নয়। সিদ্ধান্ত পেলেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে। তিনি সরকারের নির্বাহী আদেশের প্রতি ইঙ্গিত করেন।

কারা সূত্রে আরও জানা গেছে, সব প্রস্তুতির পর কামারুজ্জামান কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানান।

শেষ ইচ্ছা হিসেবে সে শেষবারের মতো পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আরেকবার দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের উর্ধতন পর্যায়ের নজরে আনেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কামারুজ্জামানের শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানোর পরামর্শ দেয়া হয়। এর পরই ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া থেমে যায়। বিষয়টি কামারুজ্জামান ও তার পরিবারকেও জানানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার কামারুজ্জামানের সঙ্গে তার পরিবার-পরিজনের শেষ সাক্ষাত হতে পারে। সাক্ষাত শেষে যে কোন সময় ফাঁসির রায় কার্যকর হতে পারে। সেক্ষেত্রে শনিবার রাতেই এ রায় কার্যকরের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে রাষ্ট্রপতির কাছে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষা চাইবে কিনা তা জানতে শুক্রবার সকাল দশটায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজ জামিল ও তানভীর মোঃ আজিম। বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে তারা কারাগার থেকে বের হন। কিন্তু তারা সাংবাদিকদের প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি। ম্যাজিস্ট্রেটরা সাংবাদিকদের প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে দ্রুত গাড়ি করে চলে যান। পরে জানা যায়, কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবে কিনা, তা জানতেই দুই ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। তারা সম্মিলিতভাবে কনডেম সেলের সামনে দাঁড়িয়ে কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবে কিনা, তা জানতে চান।

রাতে বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ইঙ্গিত দেন যে, রাষ্ট্রপতির কাছে কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষার আবেদন করবে না। ফলে কামারুজ্জামানের দ- কার্যকরে সব বাধা দূর হয়ে যায়। এর পরই শুরু হয় রায় কার্যকরের যাবতীয় প্রস্তুতি।

সন্ধ্যা থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার নিরাপত্তা জোরদার শুরু হয়। মূল ফটকের সামনে নেয়া হয় দুই স্তরের নিরাপত্তা। এতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে কারাগার এলাকায় যে, শুক্রবার রাতেই কামারুজ্জামানের ফাঁসি হচ্ছে। পরবর্তীতে সিভিল সার্জন, শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ও জেল সুপার কারাগারে প্রবেশ করেন। এসব আলামত কামারুজ্জামানের ফাঁসি শুক্রবার রাতেই কার্যকর হওয়ার বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত করে। ফলে কারাগার এলাকায় মিডিয়া কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। ততক্ষণে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশের উঁচু ভবনগুলোর ছাদে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। তারা শক্তিশালী বাইনোকুলার দিয়ে কারাগারের চারদিকে তীক্ষè নজরদারি করতে থাকেন। কারাগারের আশপাশের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হয় চেকপোস্ট। চেকপোস্ট পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন, আনসার ও কারারক্ষীরা সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বস্তুতে তল্লাশি চালাতে থাকে। সন্দেহভাজন কাউকে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কারাগারের চারদিকে থাকা অন্তত দেড় শতাধিক ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পুরো এলাকা দিনের মতো ঝকঝক করতে থাকে। কারারক্ষীদের পোশাক পরিহিত অবস্থায় কারাগারের চারদিকে অবস্থান নিতে বলা হয়। কারাগারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার যার কাজ নিয়ে।

জেল গেটে অবস্থানরত আমাদের প্রতিনিধি জানান, রাত সোয়া ৭টায় জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী কারাগারে প্রবেশ করেন। তিনি অবশ্য সকালে ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রাতে তার পুনরায় কারাগারে প্রবেশই কামারুজ্জামানের ফাঁসির ইঙ্গিত বহন করে। কারাগারে তার প্রবেশের পর পরই কারাগারের ভেতরে ও বাইরে বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। সেই সঙ্গে শুরু হয় ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া।

এরপর পরই কারাগারে ত্রিপল, বাঁশ নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চ তৈরির জন্য। এ সময় অন্তত ৮টি বাঁশ ও তিনটি বড় কার্টন রিক্সাভ্যানে করে কারাগারের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই ত্রিপল নিয়ে একটি লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্স কারাগারে প্রবেশ করে।

ঢাকা জেলার সহকারী সিভিল সার্জন আহসান হাবিব শুক্রবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করেন।

শুক্রবার রাত নয়টায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের অভিষেক অনুষ্ঠান শেষে জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামানকে আর সময় দেয়া হচ্ছে না। রায় কার্যকরে শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে। এ সময় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, শুক্রবার রাতেই ফাঁসি হচ্ছে কিনা? স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘নিয়ম অনুসারে প্রক্রিয়া চলছে।’

র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও বলেন, আদালতের রায় কার্যকরের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের। তারা যে কোন সময় তা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে র‌্যাব সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রস্তুত রয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার করতে উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশ এসেছে। নির্দেশ মোতাবেক পুরো কারাগার এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি নিজেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাকে সর্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতেও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে কারগারের সব নিরাপত্তা রক্ষীকে দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে। পাশাপাশি র‌্যাবকেও সতর্র্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

রাত সাড়ে দশটার পর থেকেই কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল হতে থাকে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, কারা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও র‌্যাবের কর্তাব্যক্তিরা কারাগার এলাকা ত্যাগ করতে থাকেন। রাত বারোটার দিকে কারাগার এলাকায় নিরাপত্তা থাকলেও কড়াকড়ি ছিল না। পরিস্থিতি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।

কারা সূত্রে জানা গেছে, আজ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরী বৈঠক বসছে। ছুটির দিনেও কারা অধিদফতরের পদস্থ কর্মকর্তাদের ওই বৈঠকে থাকতে বলা হয়েছে। শনিবার সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খোলা রাখা হয়েছে। সেখানে একটি বিশেষ শাখার কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০১৫

১১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: