মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তিন প্রজন্মের সাক্ষ্য-দলিল

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

‘...যারা গণহত্যা/করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে,/আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক/পশু সেই সব পশুদের।/ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের/সারিবদ্ধ দাঁড়/করিয়ে নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি/ঝরালেই সব চুকেবুকে যাবে তা আমি মানি না।...’ কবি শামসুর রাহমান এমন অভিশাপ দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের শাস্তির ধরন কামনা করলেও তা যে কম হয়ে যায় সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে জেগে ওঠা দ্রোহী তারুণ্যের কণ্ঠে। গণজাগরণ মঞ্চের এসব তরুণের দাবি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের। ওই কণ্ঠস্বর জাতির দাবির প্রতিধ্বনি। অবশ্য সন্তষ্ট হওয়া যায় মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন সাম্মানিক রায়ে। অধিকাংশ রায়েই এসব অপরাধীদের হয়েছে মৃত্যুদ- এবং যাবজ্জীবন কারাদ-।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশ চলে পাকিস্তান রীতিতে, এ কথা সর্বজনবিদিত। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাসহ বাঙালী জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিনাশে যা কিছু করণীয় তা করতে উদ্যোগ নেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তারই পৃষ্ঠপোষণে দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি পুনর্বাসিত হয়ে রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক কাঠামো-অবকাঠামোগুলোয় ঢুকে পড়ে ঘুণ পোকা হয়ে। কুরে কুরে নিয়ে যায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একপর্যায়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারও হয়। বাঙালীর জীবনে এ এক বড় ক্ষত ও লজ্জার বিষয়। আর এটা ঘটে জেনারেল জিয়া প্রতিষ্ঠিত বিএনপির সহায়তায়। সব স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী ক্ষুদ্র শক্তিগুলো বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের ছায়াতলে জমায়েত হয়ে পুষ্ট হতে থাকে। যুগপৎ বেশি শক্তি সঞ্চয় করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার কল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল সব মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর। বাঙালী সংস্কৃতির মূলোৎপাটনে বোমা হামলা চালায় রমনার বৈশাখী মেলায়, যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে। সে সময় সরকারী সহায়তায় এমন তা-বই শুরু হয় যার পক্ষান্তরে জেগে ওঠে নতুন প্রজন্ম। যদিও অনেক আগে অর্থাৎ সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু থাকতেই ১৯৭২-এ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছিল। বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে অন্তরে পাকিস্তান বাইরে বাংলাদেশ মার্কা এমন সরকারগুলোর আমলে তা হয়েছে বার বার উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত। শুধু তাই নয় সংশ্লিষ্টদের ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নিয়েই চলে গেলেন চিরতরে। শত নির্যাতন আর প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে বিচারের দাবিতে অনড় থেকে যারা আজ সাফল্যকে দ্বারপ্রান্তে এনে দিয়েছেন তারা নমস্য।

মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের আজ যে বিচার হচ্ছে তার পরিবেশ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরিতে যারা অবদান রেখেছেন বিভিন্নভাবে, জাতিকে করেছেন একত্রিত, জাগিয়ে রাখছেন বিবেক; অগ্রগণ্যদের মধ্যে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন অন্যতম। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার আরেকটি ঋদ্ধকর্ম আমরা পেলাম ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ও রাজনীতি’ নামের গ্রন্থের মাধ্যমে। ১৯৯২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সংবাদপত্রের কলামের সমন্বয়ে গ্রন্থটিতে ১০০টি লেখা স্থান পেয়েছে। ৬৮০ পৃষ্ঠার এ বইটি শুধু সময়ের চিত্রই নয়Ñ রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দলিলও বটে। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে সহায়তা করেছে, ওই মানবতাবিরোধীদের মিত্র মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি দাবিদার রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশ্রয় পেয়ে রাজাকার-আলবদরদের নাশকতা ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের স্বরূপ উন্মোচন, বিশ্লেষণ এবং তাদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের গতিপ্রবাহের চিত্র স্থান পেয়েছে বইটির অধিকাংশ লেখায়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নর্তনকুর্দন, নব্য রাজাকার সৃষ্টিতে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, ধর্মের নামে কুসংস্কার ও উন্মাদনা সৃষ্টি, এদের উচ্ছিষ্টভোগী সাংবাদিক-সংবাদপত্র ও সুশীল নামধারীদের মুখোশও খুলে দেয়া হয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটিতে।

অনুসন্ধিৎসু ও কৌতূহলী পাঠকের জন্য কিছু লেখার শিরোনাম উদ্ধৃত করা যেতে পারে। এই যেমনÑ যে একবার রাজাকার ‘সে সব সময়ই রাজাকার’, সাঈদী বচন ও এক বিধবার আর্তি, ইনকিলাবকে কেন সবাই প্রশ্রয় দিয়েছে, আশ্রয় দেয়? খালেদা জিয়ার পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে নিজামী সুবাহান, জিয়াউর রহমান যে ভুল করেছিলেন, বিএনপি কীভাবে জামায়াতের বি টিমে পরিণত হলো, রাজাকারদের জন্য আলাদা গোরস্তান চাই, নিজামী ‘ওলি’ হলে আমরা সবাই ফেরেশতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন ও বিচার বিশ্বে মানবতাবিরোধী বিচারের মান নির্ধারণ, আসলেই কি আমরা জামায়াত নিষিদ্ধ করতে চাই? বিএনপিও সংসদে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিল, পাকিস্তানীদের জন্য বিএনপি-জামায়াতকে আর কত কাজ করতে হবে? বন্যেরা বনে সুন্দর রাজাকার পাকিস্তানেÑ এমনই আগ্রহ সৃষ্টিকারী, দায়বদ্ধতামূলক অনেক বিষয় নিয়েই সমৃদ্ধ গ্রন্থটি।

অনেক কিছু ভুলে যাওয়া জাতি হিসেবে আমাদের একটি বদনাম আছে। আজকের কোন হৃৎকাঁদানো ঘটনা আমরা অনেকে পরদিনই ভুলে যাই। আজ কি আমরা মনে করতে পারি এই স্বাধীন দেশেই ‘দেইল্যা রাজাকার’ ওরফে সাঈদী বলেছিল, মুক্তিযোদ্ধা অবৈধ সন্তান। হাইকোর্টের নির্দেশে ফতোয়া বাতিল করার পর সাঈদী এর বিরুদ্ধে নেমেছিল কোমর বেঁধে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের হীন উদ্দেশ্যে বার বার অসত্য সংবাদ আর মন্তব্য করে নোংরামির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে দৈনিক ইনকিলাব। স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধীদের প্লাটফরমে পত্রিকাটির জন্মই পঙ্কিলতায়। একাত্তরে নিজের আশ্রয়দানকারী ডা. আলিম চৌধুরীকে কৃতঘœ মাওলানা মান্নান হত্যা করে যে নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তা ইতিহাসে বিরল। এই মান্নানই স্বাধীন দেশে জিয়া ও এরশাদ সরকারের আমলে একাধিকবার লাভ করেছে মন্ত্রিত্ব। এই আলবদর মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন জমিয়তুল মোদারেছিনের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত করে দৈনিক ইনকিলাব। নিরীহ-গরিব মাদ্রাসা শিক্ষকদের বঞ্চনা আর প্রতারিত হওয়ার দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে ইনকিলাবের পরতে পরতে। আজ যে প্রাসাদপোম ইনকিলাব ভবনটি দেখা যায় তার জায়গাটিও এক শহীদ পরিবারের। এর প্রতিটি ইট-পাথর ঘোষণা করে ‘জন্মই আজন্ম পাপ’। দুর্ভাগ্য আমাদের, হলুদ সাংবাদিকতা করেও এর সম্পাদক পেয়েছে রাষ্ট্রীয় এক সম্মানজনক পুরস্কার। বার বার চরিত্র বদলানো পত্রিকাটি আজও আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে করে যাচ্ছে বিষোদগার। চরিত্র হননের প্রয়াস পাচ্ছে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধেরপক্ষের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের। এ ইতিহাস নতুন প্রজন্ম কতটুকু জানে তা জানার উপায় নেই। তবে মুনতাসীর মামুনের আলোচ্য গ্রন্থে রয়েছে এর একাধিক প্রসঙ্গ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, জামায়াত-শিবির তথা স্বাধীনতাবিরোধীদের তোষণকারী বিএনপিই একবার জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিল সংসদে। ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী শিবির কর্তৃক আহত ও নিহত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে ক্ষমতাসীন হয়েও দাবি উত্থাপন করে। নিজের পায়ে আঘাত পড়েছিল বলে কথা! এমন ‘মজা’র তথ্য, বিশ্লেষণ আর আলোকপাত পেতে দ্বারস্থ হতে হবে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ও রাজনীতি গ্রন্থের কাছে।

৮০০ টাকা মূল্যের এ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সুবর্ণ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোবারক হোসেন লিটন। দীর্ঘ ভূমিকায় যে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ সন্নিবেশিত হয়েছে তা পাঠক-গবেষকের জন্য সংগ্রহযোগ্য। গ্রন্থের শেষ অংশে পরিশিষ্ট-১-এ আলবদরদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়াদের লোমহর্ষক বর্ণনা পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে একাত্তরে। ঘৃণার উদ্রেক করবে পাকি সৈন্য ও এদেশে তাদের সহযোগী কুলাঙ্গারদের প্রতি। জামায়াত নিষিদ্ধের আন্দোলনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভূমিকা ইতিহাস হয়ে থাকবে। এ গ্রন্থের পরিশিষ্ট-২ ও ৩-এ এ কমিটি নির্বাচন কমিশনের কাছে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের যৌক্তিকতা এবং সাংবিধানিকভাবে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম যে সঠিক নয়, তা বিস্তারিত তুলে ধরে যে পত্র দেয়; সেটা সন্নিবেশিত হয়েছে। পাঠককে চিন্তার খোরাক যোগানোর পাশাপাশি নিজের অবস্থান স্বচ্ছ করতে সহায়ক হবে এ দালিলিক প্রমাণ। এ দলিলে রয়েছে আমাদের বাতিঘর অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা। এটা পাঠকের জন্য বাড়তি উপহারও বটে। তবে কিছু মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পীড়া দেয়। বইয়ের শুরুতে উৎকীর্ণ কবি শামসুর রাহমানের নামের শেষ অংশ ‘রহমান’ নয় ‘রাহমান’ হিসেবে পরবর্তী সংস্করণে মুদ্রিত হবে বলে আশা রাখি।

তিন দশকের জাজ্বল্যমান ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ পাবেন এ প্রজন্ম। তিন প্রজন্মের সাক্ষ্য হিসেবে আদৃত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। পাশাপাশি যারা বাংলার খায়, বাংলার পরে, বাংলার জলবায়ুতে বেড়ে ওঠে অথচ মনে পোষণ করে পাকিস্তান আর স্বপ্ন দেখে ‘বাংলা হবে আফগানিস্তান’ তাদের নিজেরও বইটি পড়া আবশ্যক, অন্তত স্বরূপকে চেনার জন্য।

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫

১০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: