রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাজে করুণ সুরে...

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫
  • আবীর মুখোপাধ্যায়

গোরা সর্বাধিকারী। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ে সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, চল্লিশ বছর ধরে এই মানুষটিই ছিলেন মোহর ও তাঁর পরিবারের বিশ্বস্ত সঙ্গী। মোহরের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধুত্ব। এখনও ‘মোহরদি’র স্মৃতিকে সন্তর্পণে সখ্য করে শান্তিনিকেতনে শিল্পীর ‘আনন্দধারা’ বাড়িতেই নিভৃত প্রহর কাটে গোরার।

‘কী বলেনি লোকে আমাদের দু’জনকে নিয়ে! ঘরে-বাইরে এক সময় বলত। কোনো দিন মোহরদি কাউকে সে নিয়ে কিছু বলেনি। বলিনি আমিও! রুচিতে বাধত। কখনও সখনও হয়তো রাগ হতো খুব। এখন বুঝি, সবই ছিল ওদের ঈর্ষা! ওরা বুঝে ছিল, মোহরদিকে জড়িয়ে গোরার নামে বললে, বাজার গরম হবে। শান্তিনিকেতনী গসিপ হবে!’

গসিপ?

‘গসিপই তো! একে আর কী বলবেন? এমনও শুনতে হয়েছে, আমি এসে পড়ার জন্য মোহরদি-বীরেনদার দাম্পত্যে চিড় ধরে! বীরেনদা আসলে লেখা-পড়ার জগতের মানুষ ছিলেন। রাত জেগে লিখতেন। উনি এই যে লিখছেন, সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে ডুবে রয়েছেন, এতে মোহরদি বলতেন, ‘ও ওর কাজ করছে করুক’! বীরেনদা মোহরদির গানের খুব ভক্ত ছিলেন। ওঁদের নিজেদের মধ্যে দারুণ একটা কেমিস্ট্রি ছিল। অথচ, বীরেনদার সঙ্গে মোহরদির দাম্পত্য নিয়ে একসময় খবরের কাগজেও চর্চা হয়েছে। তখনকার কলকাতা-শান্তিনিকেতনের শিল্পীরাও রটনা করেছে ঢের। সেসব গসিপ এমন লোকেরা করতেন, যে আজ তাঁদের নাম বললে চমকে উঠবেন! প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক থেকে বিশিষ্ট লেখকরা রয়েছেন সেই তালিকায়। সুচিত্রাদিকে এ নিয়ে দুঃখ করতে শুনেছি।’

কিন্তু কেন এমন গসিপ ছড়াল?

‘চল্লিশ বছর মোহরদির সঙ্গে কাটানো, সেটাই ছিল লোকের কাছে বড় আপত্তির। একটা বাইরের লোক মোহরদির এত আপন হয়ে গেল! এত কাছের হয়ে গেল? এখন তো ওঁর পরিবারের লোকেরাও বয়কট করেছে আমাকে! জানেন, একা পড়ে থাকি। এত বড় বাড়িটায় একা!’

মেঘের খপ্পরে পড়েছে শান্তিনিকেতন। আকাশ কালো করা অন্ধকারের ভিতর মেঘ-মন্তাজে ঢেকে যাচ্ছে আশ্রমের পথ-ঘাট। ভুবনডাঙার বাঁধ, শালবন, কোপাই নদীর ওপারে গ্রাম। আর হাওয়া দিচ্ছে জোর। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। একটু পরেই সিংহ সদনের কার্নিশ ছুঁয়ে শুরু হলো বৃষ্টি।

বৃষ্টির বন্দিশ শুনতে শুনতে গুরুপল্লী থেকে আম্রকুঞ্জের দিকে আম কুড়াতে দৌড়াচ্ছে দুই আশ্রম বালিকা। দৌড়, দৌড়!

যেন বৃষ্টির মর্মর ছিঁড়ে, বাদলের বাতাসে উড়ে যেতে চায় দুই সখি। সে দিনই প্রথম রবিঠাকুরের সঙ্গে দেখা মোহরের!

‘শান্তিনিকেতনে থাকলেও তার আগে কখনও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মোহরদির কথা হয়নি। তখন কত বয়েস মোহরদির? ন-দশ বছর। সেই ঝড়ের বিকেলে, বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে উঠলেন কবির শ্যামলী বাড়িতে। সেদিন, সেখানে বসেই লিখছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উনি মোহরদি আর তাঁর বন্ধুকে ডেকে তাঁদের নাম জিজ্ঞেস করে জানতে চান, তাঁরা গান জানেন কিনা। কার মেয়ে। তখনও মোহরদি ‘কণিকা’ হননি, অণিমা। মোহরদি কবিরই একটি বর্ষার গান শুনিয়েছিলেন কবিকে। সেই বিকেলেই অণিমা নাম বদলে কণিকা রাখলেন রবীন্দ্রনাথ। মোহরদির কাছেই শুনেছি। খুব বলতেন, বৃষ্টি থেমে-যাওয়া আলোর বিকেলে অন্য এক মোহরের জন্ম-কথা। আর গাইতেন বেহাগে ওই গানটা, ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে/তোমারি সুরটি আমার মুখের ’পরে, বুকের ’পরে।’

কবেকার স্মৃতির মেহগনি দেরাজ খুলে ডাউন মেমোরি লেনে হাঁটছিলেন গোরা। যেনবা জলপাই কাঠের ঘাতক এস্রাজ বেজে চলেছে নিভৃতে।

একলা ‘আনন্দধারা’ বাড়িজুড়ে শুধু এলোমেলো স্মৃতি। বাকসো উপচেপড়া সাদাকালো ফটোগ্রাফ, উলঢাল সেলফ, দেশ-বিদেশের মানপত্র, হারমোনিয়ম, ভাঙা রেকর্ড সবখানে স্মৃতির নিয়ত ওড়াউড়ি!

স্মৃতির বাঁধন খুলে দেওয়া হাওয়ায় হাওয়ায় পাক খেয়ে উড়ছে গীতবিতানের ছেঁড়া মলাট।

রবিঠাকুরের গান শিখতে জার্মানী যাওয়ার মোহ ছেড়ে একদিন শান্তিনিকেতন চলে এসেছিলেন গোরা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের এ্যাডমিশন টেস্ট হচ্ছে শুনে ইন্টারভিউ দিয়ে দেন।

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অবশ্য তখনও তাঁর আলাপ হয়নি। ইন্টারভিউ বোর্ডে তাই তাঁকে প্রথমে চিনে উঠতে পারেননি। তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, পুজোর সময় গানের বইতে ছাপা একজনের মতো অবিকল তাঁর মুখ! মনের গহনে, গানের খেয়া শুরু সেই তখনই!

‘‘মনে হয়, এই তো সেদিন! অথচ, দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে কয়েক দশক। ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকে, ভিতরে দেখি বসে আছেন একজন ওস্তাদজি। প্রায় ধমক দিয়ে বসতে বললেন। পাশে একজন তানপুরা বাজাচ্ছেন। তাঁরও পাশে বসে আরও কয়েকজন সুন্দরী মহিলা। একজনকে দেখে চেনা মনে হলো। কোথায় যেন ছবি দেখেছি... কোথায় যেন... ভাবছি! মনে পড়ল, এইচএমভির পুজোর রেকর্ডের সঙ্গে গানের বইতে ছবি দেখেছি ওই সুন্দর মুখের মহিলার। উনিই মোহর! কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভয় করতে লাগল। মোহরের সামনে রবীন্দ্রনাথের গান গাইব! তখন একটাই রবিঠাকুর জানতাম। ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ গাইলাম।”

শুরু হলো গোরার গানের দীক্ষা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সখ্য বাড়ল তাঁর। সঙ্গীতভবনে সে সময় গান-বাজনা শেখাচ্ছেন শান্তিদেব ঘোষ, বীরেন পালিত, সুশীল ভঞ্জচৌধুরী, ভি ভি ওয়াজেলওয়ার, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেনরা।

তখনকার শান্তিনিকেতনে এত বাড়ি-ঘর হয়নি। এত গাড়িও চলাচল করত না আশ্রম এলাকায়। স্বামী বীরেন বাবুর সঙ্গে মোহর থাকতেন বিশ্বভারতীর কোয়ার্টারে।

সবুজ মাঠ পেরিয়ে মোহর হাঁটতে হাঁটতে আসতেন সঙ্গীতভবন, গানের ক্লাসে। কোনো দিন তাঁর হাতে থাকত গানের খাতা, কোনো দিন গীতবিতান।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথিতযশা শিল্পীদের মধ্যে ‘মোহরদি’কেই স্বতন্ত্র মনে হয়েছিল গোরার। গানের ক্লাসে তাঁর গান শুনে কেবলই তাঁর মনে হতো, ‘মোহরদির গলার গান যেন বিরামহীন আত্মদীক্ষার গান। কম হলেও অন্য গানও শুনেছি তাঁর গলায়। কিন্তু রবিঠাকুরের গানে ওঁর গলায় অদ্ভুত এক মনকেমনের মীড় লেগে থাকত।’

রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া অন্য কারও গান মোহরকে গাইতে না শোনা গেলেও, ১৯৩৭ সালে জীবনের প্রথম রেকর্ডটি করেছিলেন আধুনিক গানের। সে কালের বিখ্যাত সুরকার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের সুরে দুটি গানের কথা লিখে দিয়েছিলেন কবি নীহারবিন্দু সেন।

রেকর্ডের প্রথম গানটি ছিল, ‘ওরে ওই বন্ধ হল দ্বার’, দ্বিতীয় গানটি ‘গান নিয়ে মোর খেলা’।

হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির ট্রেনার যামিনী মতিলালের তত্ত্বাবধানে ’৩৮ সালে সে রেকর্ড বাজারে প্রকাশিত হতেই গান শুনে কষ্ট পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ!

‘যাত্রাপথের আনন্দগান’ বইতে শৈলজারঞ্জন মজুমদার লিখছেন, ‘গরমের ছুটির পর শান্তিনিকেতন ফিরে এসেছি, গুরুদেবকে প্রণাম করছি, উনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, জানো, তোমার ছাত্রী মোহর গান রেকর্ড করেছে? এটা আমার নয়, বাইরের! কথাটি বললেন বেশ অভিমানের সুরে!’

সে বছরই হিন্দুস্থান থেকেই প্রকাশিত হলো মোহরের প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড।

এক পিঠে ছিল, কবির ছিয়াত্তর বছর বয়সে লেখা প্রেমের গান ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’, অন্য পিঠে বিভাস-কীর্তনে গাঁথা ‘না না না ডাকব না’। গান দুটি শুনে ভালো লেগেছিল কবিরও। তিনি মোহরের গলায় আরও চারটি গানের রেকর্ড শুনে যেতে পেরেছিলেন। ‘ওগো তুমি পঞ্চদশী’, ‘ওই মালতীলতা দোলে’, ‘ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে’ এবং সেতারী সুশীলকুমার ভঞ্জচৌধুরীর গৎ-ভাঙা সুরে কবির লেখা বর্ষার গান ‘এসো শ্যামলসুন্দর’।

মোহরের গাওয়া সলিল চৌধুরীর সেই গণসঙ্গীত দুটি এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়নি। গান দুটি ছিলÑ ‘প্রান্তরের গান’ ও ‘আমার কিছু মনের আশা’। বাজারে এসেছিল অন্য এক শিল্পীর কণ্ঠে। সলিল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, অন্য কোনো গান গাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বভারতীর আপত্তির কথা জানিয়ে মোহর তাঁকে চিঠি দিয়েছিলেন।

কী লিখেছিলেন মোহর?

সলিল বাবুকে লেখা চিঠিতে মোহর লিখেছিলেন, ‘কর্তৃপক্ষ বলেছেন, তোমার গান গাইলে আমাকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হবে!’

অনেক পরে এই সলিল চৌধুরীর করা মিউজিকেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করেন গোরা।

মোহরের রেকর্ডিং থাকলে তখন গোরাকেই যেতে হতো সঙ্গে। একদিন গ্রামোফোন কোম্পানিতে গিয়েছেন। কোম্পানির কর্ণধার পি কে সেন স্টুডিওতেই ছিলেন। মোহরকে ডেকে বললেন, ‘এই ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরিস কেন রে মোহর?’

মোহর বললেন, ‘ও ভাল গান করে। ওর গান রেকর্ড করুন।’

রেকর্ড হলো গোরার গান। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানে মিউজিক করলেন সলিল চৌধুরীও! প্রথম গানটি ছিল মিশ্র কাফি রাগে ‘হাসি কেন নাই ও নয়নে।’

‘মোহরদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ল গানের ক্লাস থেকে নানা অনুষ্ঠান ও এমন সব রেকর্ডিংয়ে গিয়ে। তাঁর বাড়ি, পরিবারের সঙ্গেও একটু একটু করে জড়িয়ে পড়লাম।

সে সময় দিল্লীর এক পাঞ্জাবী মেয়ে গান শিখত সঙ্গীতভবনে। মোহরদির কাছে যাওয়া নিয়ে তাঁর সঙ্গে খুব রাগারাগি হতো। দিদির খুব প্রিয় ছিল সে-ও। তবে, মোহরদি সারাক্ষণ ‘গোরা গোরা’ করত বলে, ও খুব রেগে যেত! পাস করে বিশ্বভারতীতেই গান শেখাতে শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় থাকব? বাবা আপত্তি করেছিল, তবুও থাকতে শুরু করলাম বীরেনদা-মোহরদির সঙ্গেই। ঠিকানা বদল হতে হতে একদিন আমরা তিনজনে এসে উঠলাম এই আনন্দধারা বাড়িতে।’ নতুন বাড়িতে উঠে আসার পর শিল্পী-সাহিত্যিকরা অনেকে এলেও, কোনো কোনো শিল্পীর সঙ্গে মোহরের পরিচয় ছিল বিয়ের আগে থেকেই। বিশ্বভারতীর কোয়ার্টারে থাকার সময়েও তাঁরা শান্তিনিকেতন এসেছেন। তাঁদের একজন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মোহর তাঁর আত্মজীবনী ‘আনন্দধারা’য় লিখছেন, ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একবার বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে আমাকে বলেছিলেন, তাঁদের বন্ধু বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায় গেছেন শান্তিনিকেতন। চাকরি নিয়ে। আমি যেন তাঁর সঙ্গে আলাপ করি। সেই আলাপের পরিণতি হলো বিয়ে!’

বিশ্বভারতী কোয়ার্টার থেকে আনন্দধারা বাড়িতে উঠে আসার পর এই বাড়িতে আমৃত্যু কেটেছে মোহরের। এই বাড়িতেই রবিশঙ্কর থেকে জর্জ বিশ্বাস, হেমন্ত, উত্তমকুমার, সত্যজিৎ, লতার মতো নানা শিল্পী এসেছেন। লতা যেবার বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম সম্মান পেলেন, সেবার মোহরও দেশিকোত্তম পান। লতা আগে থেকেই মোহরকে বলেছিলেন, অনুষ্ঠানের পর, তাঁর আনন্দধারা যাবেন। গিয়েছিলেন। বেশ কয়েক ঘণ্টা দু’জনে কাটিয়েছিলেন।

সুনীল-শক্তির মতো বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্টরা আসতেন মোহরের কাছে। মোহরের খুব অল্প বয়স থেকে দেখা মানুষ, রামকিঙ্করকে নিয়ে সমরেশ বসু যখন ‘দেখি নাই ফিরে’ লিখছেন, তখনও বার বার এসেছেন মোহরের কাছে। দোলের সময় আনন্দধারা হয়ে উঠত চাঁদের হাট।

গোরা এখনও মনে করতে পারেন সেই স্মৃতি। ‘কত দিন দেখেছি, সুচিত্রাদি এসেছে। দু’জনে ছাদের সিঁড়িতে বসে নিভৃতে কাঁদছেন ঝরঝর করে। পুরনো শান্তিনিকেতনের কথা বলতে বলতে কত সময় যে বয়ে যেত! কেন কাঁদতেন ওঁরা দু’জনে!’

কথার মাঝে উঠে গিয়ে কয়েকটা ফটোগ্রাফ নিয়ে এলেন গোরা। ব্রোমাইড প্রিন্ট সে সব সাদাকালো ছবিতে কোনোটায় গোরার দু’পাশে সুচিত্রা-মোহর, কোনোটায় জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গে দুই শিল্পী, আবার কোনোটায় শুধুই দুই সখি।

মোহরদি তখন অসুস্থ, খুব মনে আছে, পুরনো শান্তিনিকেতনের কথা বলতে বলতে দু’জনের চোখ ভিজে একসা! সুচিত্রাদি বললেন, ‘কত পুরনো কথা মনে পড়ছে। তোরও বয়স হলো, আমারও দিন ফুরাল। একা হয়ে যাচ্ছি রে মোহর!’ উত্তরে মোহরদি খুব আস্তে আস্তে বললেন, ‘তুইও একা, আমিও একা!’ কথা যেন ফুরাতে চাইত না দু’জনের। সুচিত্রাদি বলেছিলেন, ‘জানিস মোহর, এই বয়সে এসে একা কথাটার মানে বুঝতে পারছি! তোর গোরা আছে। মনে রাখিস, তোর গোরা আছে!’ উনি এমনই বলতেন। একবার আনন্দধারায় এসেই বললেন, ‘মোহর তুই গোরাকে পেয়েছিস! আমার হিংসে হয়! ও তোর কত খেয়াল রাখে!’ আর একবার, কবির উদয়ন বাড়িতে। সেবার ৭ পৌষের অনুষ্ঠান। সুচিত্রাদি গাইবেন। আমাকে বললেন, ‘গোরা তুমি আজ বাজাও।’ তারপর বললেন, ‘কী জানো, রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে বসে গান গাইতে একটু নার্ভাস লাগছে! রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে গান গাইতে এলেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়! হাতটা ধরে দ্যাখো!’ ধরলাম হাত! উনি বললেন, ‘তুই কখনও মোহরকে ছেড়ে যাস না!’

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাগত জানিয়েছিলেন মোহরদিকে। বীরেনদা নিজের হাতে তোলা গুরুদেবের ছবি আর মোহরদির রেকর্ড নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁর জন্য। গিফট হাতে পেতেই মুজিবুর বললেন, ‘আপনার কত রেকর্ড ছিল, শয়তানরা সব চুরমার করে দিয়ে গেল! নিজে এসেছেন, এইটেই বড় প্রাপ্তি আমাদের দেশের!’ আর একবার, আশ্রমিক সংঘের অনুষ্ঠানে বম্বে গিয়ে দিলীপকুমারের শুটিং দেখতে হাজির হয়েছিলাম সকলে। পর পর রবীন্দ্র-নৃত্যনাট্যে গান করার ফাঁকে আমরা শান্তিনিকেতনের গানের দল জানতে পারলাম, কাছেই স্টুডিওতে শুটিং চলছে। স্টার দিলীপকুমার-সায়রাবানু রয়েছেন সে ছবিতে! হই হই করে মোহরদিকে নিয়ে সকলে স্টুডিওতে হাজির। সেখানে তখন ছিলেন সলিল চৌধুরীও। সকলের সঙ্গে তিনি আলাপ করিয়ে দিলেন দিলীপকুমারের। শান্তিনিকেতন থেকে গিয়েছি শুনে, দিলীপকুমার খুবই আগ্রহ দেখালেন। মোহরদির সঙ্গে কথা বললেন। সকলে মিলে ছবিও তোলা হলো।’

এসব গানের অনুষ্ঠানে কখনও কখনও তাঁর মোহরদির সঙ্গে হারমোনিয়ম বাজানো খুব মুশকিল হতো। কয়েকবার বাজাতে গিয়ে বিপত্তিও ঘটেছে। চল্লিশ বছর হারমোনিয়াম বাজানোর অভিজ্ঞতায় গোরা বলেন, ‘মোহরদির গলা এতো সুরেলা, যে একটু ভুল ফিঙ্গারিং হয়ে গেল, আর সামলানো যেত না। ভুল হলে খুব বিরক্ত হতেন উনি। অনেকে চেষ্টা করেছিল ওঁর সঙ্গে বাজাতে। কিন্তু ভুল করে একসা! একবার বসুশ্রী সিনেমা হলে মোহরদি গাইবেন। আমার ফেবারিট শিল্পী সাগর সেন বললেন, ‘আমি বাজাব।’ মোহরদি বললেন, ‘গোরা তো বাজায়। সাবধানে বাজাবেন কিন্তু।’ গানের অন্তরায় বার বার ভুল হচ্ছে। মোহরদি কেবলই তাকাচ্ছেন। তারপর... ‘কী হচ্ছে কী!’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। সাগর সেন ক্ষমা চাইলেন। গানটা ছিল, ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’।’

জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গেও মোহরের খুব কম বয়স থেকে আলাপ। জর্জের গান নিয়ে বিশ্বভারতী-র সঙ্গে বিরোধ হলেও, মোহর নিজে খুব ফ্যান ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাসের। তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘প্রিয় জর্জদাকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। ... সেই স্মৃতি কোনোদিন ম্নান হবার নয়। জর্জদা আজও আমার হৃদয়ে।’

গোরা নিজে সতেরো-আঠারো বছর বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডে ছিলেন। সেদিনের রিহার্সাল রুমের ঘটনার কথা তুলতেই বললেন, ‘জর্জদার গান আটকানোয় মোহরদির হাত ছিল না। উনি নিজে কখনও সমিতির বৈঠকে যেতেনও না। বলতেন, ‘যত দিন গান গাইব, কারও গান নিয়ে নেগেটিভ বলতে পারব না। নিজে আগে শুদ্ধ গাই!’ জর্জদার গান আটকানোয় কিছুটা হাত ছিল কলকাতারই দুই প্রখ্যাত পুরুষ ও এক মহিলা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর!’ সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫

১০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: