আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্মরণ ॥ কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা রবিশঙ্কর

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

বয়স তখন কতই-বা? ১৩ কি ১৪। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেবারই প্রথম দেখা তাঁর। সেদিনের সেই কিশোরের মাথায় হাত রেখে রবিঠাকুর আশীর্বাদ করেছিলেনÑ ‘বাবার মতো হও, দাদার মতো হও।’ সেই কিশোর বড় হয়ে অনেক বড় হয়েছে ঠিকই, তবে বাবার মতো কিংবা দাদার মতো হননি, হয়েছেন তাঁর নিজের মতো করে। বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক ও সুরস্রষ্টা প-িত রবিশঙ্কর হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত। সেতারের তানে জয় করেছিলেন তিনি বিশ্ব। তাঁর হাতে সেতার হয়ে উঠেছিল সঙ্গীতের এক অসামান্য মাধ্যম। ভারতীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছিলেন এ কিংবদন্তি শিল্পী। এ সাক্ষাৎকারে তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যের ওই প্রসঙ্গটি তুলে ধরে বলেছিলেনÑ ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার সামনাসামনি যখন দেখা হয়, তখন আমার বয়স ১৩ কি ১৪। সেদিনের কথা এখনও দিব্যি মনে আছে, এখনও চোখের সামনে ভাসে সেই মুহূর্তগুলো। জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয়টি পাইনি। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, যেন উজ্জ্বল সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার বাবা তাঁর নোবেল পুরস্কার মনোনয়নের জন্য গঠিত কমিটিতে কাজ করেছিলেন। বাবার কথা স্মরণ করে আমার মাথায় হাত রেখে তিনি বাংলায় বলেছিলেন, ‘বাবার মতো হও। দাদার মতো হও।’ আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল তাঁর হাতের স্পর্শে। সেটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের উত্তরপ্রদেশের বেনারসে এ শিল্পীর জন্ম। আদি পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায়। প্রথম জীবনে নাম ছিল তাঁর রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী। ঘরোয়া নাম ছিল ‘রবু’। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। তাঁর বাবা শ্যামশঙ্কর চৌধুরী ছিলেন একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এবং আইনজ্ঞ। তবে রবিশঙ্করের প্রায় পুরো ছেলেবেলাটাই কাটে বাবার অবর্তমানে। বস্তুত একরকম দারিদ্র্যের মধ্যেই রবিশঙ্করের মা হেমাঙ্গিনী বড় করেন তাকে। বড় ভাই উদয়শঙ্কর ছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী। ওই সময়টায় তিনি ছিলেন প্যারিসে। রবিশঙ্কর ১৯৩০ সালে মায়ের সঙ্গে প্যারিসে বড় ভাইয়ের কাছে যান। সেখানেই আট বছর বয়সে শুরু করেন স্কুলের শিক্ষা। মাত্র দশ বছর বয়সে দাদা উদয়শঙ্করের ব্যালে ট্রুপে যোগ দিয়ে ইউরোপ সফর করেন তিনি। নিজের সঙ্গীত-জীবনের সূচনা নিয়ে রবিশঙ্কর বলছিলেন, সঙ্গীত নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি বলতে মনে পড়ে বেনারসে বাড়ির ছাদে আকাশভরা তারার নিচে শুয়ে মায়ের গলায় ঠুমরি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। মা অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠে ঠুমরি, কাজরা আর দাদরা গাইতেন। আমাকে পৌরাণিক গল্প শোনাতেন আর আকাশের তারাগুলোর নাম শেখাতেন। আমার জীবনে মায়ের উপস্থিতি ছিল খুব স্বল্প সময়ের জন্য। তিনি যখন মারা যান, আমার বয়স তখন মাত্র ১৬। তার পরও আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন তিনি। শৈশবকাল নিয়ে তাঁর আফসোসেরও কমতি ছিল না। বলেছেন, ‘জীবন নিয়ে আমার একটা আফসোস হলো, আর ১০টা ছেলের চেয়ে আমি অনেক দ্রুত বড় হয়ে গিয়েছিলাম। শৈশব বলতে তেমন কিছু ছিল না। ১০ বছর বয়সে আমি আমার ভাই উদয়শঙ্করের নাচের দলের সঙ্গে প্যারিসে চলে আসি। আমার চারপাশ ঘিরে ছিল নামী-দামী তারকারা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের দেখতে দেখতে বেড়ে উঠেছিলাম আমি। তাই তারকাদের মতো জীবনযাপন করা আমার কাছে তখন খুব স্বাভাবিক মনে হতো। এভাবেই কখন আমার শৈশবের সময়টুকু পালিয়ে গেছে, টেরই পাইনি।’ ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে নর্তকের জীবন ছেড়ে যন্ত্রসঙ্গীতের তালিম নিতে শুরু করেন তিনি। ভারতীয় মাইহার ঘরানায় শাস্ত্রীর সঙ্গীতের তালিম নেন কিংবদন্তিতুল্য সরোদ জাদুকর উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে। প্রিয় ছাত্র রবিশঙ্করকে ধ্রুপদ, ধামার ও খেয়ালের তামিল দিয়েছিলেন উস্তাদ আলাউদ্দিন। সঙ্গীতশিক্ষা শেষে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন রবিশঙ্কর। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা’ গানটিতে নতুন করে সুরারোপ করে তিনি ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওর পরিচালক ছিলেন তিনি সাত বছর। এর আগে একুশ বছর বয়সে রবিশঙ্কর বিয়ে করেন তাঁর গুরু আলাউদ্দিন খাঁর (যাঁকে তিনি বাবা বলে ডাকতেন) মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবিকে। এ বিয়েতে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান শুভেন্দ্র শঙ্করের জন্ম হয়। কিন্তু বৈবাহিক জীবন বেশি দূর টেকেনি। শেষ হয় বিচ্ছেদে। পরবর্তীকালে আমেরিকান কনসার্ট উদ্যোক্তা স্যু জোন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন তিনি। এ সম্পর্ক জন্ম দেয় এক কন্যাসন্তানের। নোরা জোন্স, রবিশঙ্ককরের এই মেয়ে একজন প্রথিতযশা জ্যাজ, পপ, আধ্যাত্মিক এবং পাশ্চাত্য লোকসঙ্গীতের শিল্পী ও সুরকার। ২০০৩ ও ২০০৫ সালে নোরা জোন্স পেয়েছেন ১০টি গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড। পরবর্তী সময়ে রবিশঙ্ককর বিয়ে করেন তাঁর গুণগ্রাহী ও অনুরক্তা সুকন্যা কৈতানকে। এই বিয়েতে জন্ম হয় তাঁর দ্বিতীয় কন্যা অনুশকা শঙ্করের। বাবার কাছে শিক্ষা নিয়ে অনুশকা এখন নিজেও সেতার বাজিয়ে হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

রবিশঙ্কর ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের এক পরম সুহৃদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ব জনমত গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের পপতারকা বিটলস ব্যান্ডের সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কে আয়োজন করেছিলেন সাড়া জাগানো ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। কনসার্টে শুধু সেতারই বাজাননি তিনি, জর্জ হ্যারিসনকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ কনসার্ট একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। আরেকটি কনসার্টের কথা বাংলার মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছেÑ ‘কনসার্ট ফর বেনিফিট’। আদি পিতৃভূমি বাংলাদেশের ৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্যে সেই গিটার হাতে মানবদরদি জর্জ হ্যারিসনকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই তিনি আয়োজন করেছিলেন এই কনসার্টের।

প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং পাশ্চাত্যের ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতকে একসঙ্গে মিশিয়ে সেতার ও অর্কেস্ট্রার মাধ্যমে নতুন নতুন সুর ও সঙ্গীতের একটি নতুন ধারা তৈরির চেষ্টা থেকে একদিনের জন্যও সরে আসতে দেখা যায়নি রবিশঙ্করকে। কৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য তারে পৃথিবীর দুই প্রান্তকে একই ছন্দ, তাল, লয়, সুরে বাঁধতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন এই আজন্ম সুরসাধক। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার ও অন্যান্য চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনায়ও তিনি নিপুণ হাতে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর দীর্ঘজীবনে বিভিন্ন সময়ে ভূষিত হয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কারে। ১৯৯৯ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ভারতরতœ। অস্কার সমতুল্য গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড জেতেন তিন বার। ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান দিয়েগোতে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এ শিল্পী।

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫

০৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: