আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অন্য আলোয় তিতাস জিয়া

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫
  • ইমরান হোসেন

তিতাস জিয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে তাঁর রুমে বসে। বাইরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পুরোদস্তুর একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। অথচ তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এই লোকটিই জিতেছেন এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সেরা অভিনেতার তকমা। ছোটবেলায় বাবাকে দেখতেন অভিনয় করতে। রক্তে অভিনয়ের টান বুঝিবা সেই থেকেই। বাড়ি সিরাজগঞ্জ হলেও জীবনের একটি বড় সময় কাটিয়েছেন ঝিনাইদহে। ছোটবেলার সেই ছেলেটিই রূপকথার গল্পের মতো জিতে নিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সেরা অভিনেতার পুরস্কার। সেখানে তিনি লড়াই করেছেন শাকিব খানের মতো নায়কের সঙ্গে। শুধু লড়াইই করেননি, জিতে নিয়েছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। তবে তিতাস জিয়া একদিনে তৈরি হয়নি। উচ্চমাধ্যমিকে পাস করে পড়তে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হন নাট্যকলা বিভাগে। প্রাদ প্রদীপের আলোয় নিজে একদিন অভিনয় করবেন, মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাঁর অভিনয় দেখবে সেটা ছিল তাঁর কল্পনার বাইরে। ঢাকায় এসে মন দিয়ে অভিনয়টা শিখতে শুরু করেন। বিভাগের অনেক প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে ম্যাকবেথ নাটকে নাম ভূমিকায় তাঁর অভিনয় অনেকেরই মনে আছে। ‘ঈর্ষা’, ‘কয়েদী হায়াত’, ‘মৃচ্ছকটিক’ ‘লালকমল- নীলকমল’ সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে ২০০৭ সালে নাট্যকলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। তিতাস ২০১২ সালে গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছিলেন। এছাড়া ও সাদাত রাসেলের ‘কে তুমি’ এবং গাজী রাকায়েতের ‘তোমায় দেখতে লাগে ভালো’ টেলিছবি দুটিতে অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি শেষ করলেন বিবিসির ‘উজান গাঙ্গের নাইয়া’ সীজন টুতে।

২০০৫ সালে নির্মাতা গাজী রাকায়েত তাকে একটি ধারাবাহিক নাটক তৈরি করেন, যেখানে তিনি তিতাস জিয়াকে একটি চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দেন। তিতাসের অভিনয়ের জাতটা চিনে নেন নির্মাতা গাজী রাকায়েত। তখন থেকেই পরিকল্পনা মৃত্তিকা মায়ার। সরকারী অনুদানে ইমপ্রেসের প্রযোজনায় এই চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য গাজী রাকায়েতের অনেক আগে থেকেই। বাকিটা সবার জানা। ১৭টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে এই চলচ্চিত্র। মৃত্তিকা মায়ার শূটিং এ সবাই মন প্রাণ ঢেলে অভিনয় করেছেন। একটি দৃশ্য ছিল বৈশাখ অর্থাৎ তিতাস প্রমত্তা পদ্মায় লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করবেন। সবাই প্রস্তুত। গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে ঝাঁপ দিলেন তিতাস। সাঁতার তিনি জানতেন, কিন্তু পদ্মা বলে কথা। ব্রজেন দাসও কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়তেন এই অবস্থায়। ঝাঁপ দেয়ার পর দশ বারো হাত পানির নিচে চলে যান তিতাস। সেই ডুবন্ত অবস্থায়ও তিনি চিন্তিত ছিলেন, তার গায়ের চাদর নিয়ে। কারণ সেটি ছিল আরেক অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদের কন্টিনিউটি। সেটি পানিতে হারিয়ে গেলে দশ বারো দিনের করা শূটিংই বাতিল হয়ে যাবে। অভিনয়টা নতুন কিছু না হলেও চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে এসে কো আর্টিস্ট এবং পরিচালকের অকুন্ঠ সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। মৃত্তিকা মায়ায় তিতাসের সহঅভিনেতা ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। চলচ্চিত্রে তাদের চরিত্র গুরু-শিষ্যের। দু’জনেই উপভোগ করেছেন ব্যাপারটা।

প্রথম চলচ্চিত্রেই জাতীয় পুরস্কার। অনুভূতিটা কেমন? জানতে চাইলে তিতাস জিয়ার উত্তর, ‘অনুভূতিটা ভীতিকর, কারণ প্রথম চলচ্চিত্রেই এমন অর্জন। জানি না এরপরে এরকম চরিত্র আর পাব কিনা? অথবা আমাকে নির্মাতারা ডাকবেন কিনা। নিজের ওপরে প্রেশার কিছুটা বেড়ে গেল। কারণ এর চেয়েও ভাল কাজ করতে হবে।’ ছোট পর্দায় এবং বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে অভিনয় করবেন কিনা জানতে চাইলে বললেন, ‘গল্প ভাল হলে অবশ্যই বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমায় অভিনয় করব। আমার কাছে সিনেমা সিনেমাই। আমি ঠিক টাইপ অভিনেতা হতে চাই না। আর ছোট পর্দা এখনও আমাদের জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম। নির্মাতারা চাইলে অবশ্যই আমার কাজ করার আগ্রহ আছে। আমার শুরুটা কিন্তু ছিল ছোট পর্দা দিয়েই।’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেতার প্রিয় অভিনেতা হচ্ছে ড্যানিয়েল ডে লুইস। যিনি রেকর্ড সংখ্যক তিনবার অস্কারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলেন।

সিনেমার প্রতি মানুষ কেন আগ্রহ হারাচ্ছে জানতে চাইলে বললেন, ‘ মানুষ আসলে চলচ্চিত্রে গল্প দেখতে চায়। ভাল বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র দেখতে চায়। কিন্তু সেরকম গল্প এবং চরিত্র সৃষ্টি করার মতো চিত্রনাট্যকার কোথায়? তাই মৌলিক এবং জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের অভাবে দর্শক কিছুটা আগ্রহ হারাচ্ছে। তবে আমি আশাবাদী। সময় পাল্টাবে।’ সামনে কি পরিকল্পনা করছেন? দর্শক কি আপনাকে নিয়মিত রুপালি পর্দায় দেখতে পাবে? জবাবে স্মিত হাসি তিতাসের। বললেন, ‘ অভিনয়টাকে ঠিক পেশা হিসেবে নিতে চাই না। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি। কিন্তু অভিনয়টা ভালোবাসি, তাই চেষ্টা থাকবে প্রতিবছর অন্তত একটা ভালো চলচ্চিত্রে অভিনয় করার।’ দর্শক ভীষণভাবে তাঁর অভিনয় পছন্দ করেছে, এটা তিতাসকে অপনুপ্রেরণা যোগায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক শুভেচ্ছা পেয়েছেন। এটাকেই সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং ভালো অভিনয় করার অনুপ্রেরণা হিসেবে মানছেন তিনি। অবসরে কি করেন জানতে চাইলে বললেন, ‘নিজের মধ্যে থাকতেই ভালোবাসি। নাটকের কোন চরিত্র নিয়ে ভাবি।’

কথা বলতেই রাত এসে টুপ করে নামে যান্ত্রিক ঢাকা শহরে। বিদায় নিয়ে অফিসের পথ ধরি। মনে বাজে তিতাস জিয়ার প্রিয় সংলাপ, ম্যাকবেথ নাটকের সেই উক্তি, ‘জীবন এক চলমান ছায়া’।

ছবি : রণবীর মিত্র বসুনীয়া

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫

০৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: