কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫
  • মেঘে ধনাত্মক-ঋণাত্মক বিদ্যুতের সঞ্চালন থেকেই সৃষ্ট বজ্র হাজার হাজার ডিগ্রী তাপ নিয়ে ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে

নিখিল মানখিন ॥ প্রতিবছরই বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। চলতি বছরেও বজ্রপাত বেশি হতে পারে- এমনটি মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বে বাংলাদেশেই বেশি। বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে প্রতিবছর গড়ে দেড় শ’ থেকে দু’শ’ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। বেসরকারী হিসাবে আরও বেশি। প্রতিবছর এপ্রিল থেকেই শুরু হয় বজ্রপাত। এ বছর মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ত্রিশ ছাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলদেশে বজ্রপাত নিয়ে কোন গবেষণা থেকে মৃত্যুরোধ বিষয়ে কোন কার্যক্রম নেই। সীমিত পরিসরে বজ্রপাত সম্পর্কিত পুস্তিকা ও লিফলেট প্রকাশ এবং সেমিনার আয়োজন করার মধ্য দিয়েই সরকারী দৃায়িত্ব সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এপ্রিল থেকেই বাংলাদেশে বজ্রপাত শুরু হয়। এ বছর বজ্রপাতের তীব্রতা বেশি থাকতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছর বজ্রপাতে অনেক মানুষ মারা যায়। কিন্তু এ বছর ধ্বংসের মাত্রা বিশেষ করে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকের অনেক বেশি। বজ্রপাতে গত কয়েক সপ্তাহে গত বছরের পরিসংখ্যানকেও পেছনে ফেলেছে। বজ্রপাতের বড় কারণ হতে পারে বায়ু ম-লে অস্থিরতা সৃষ্টি। শীত মৌসুমে দেশে প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি। শীতপরবর্তী সময়েও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ছিল না। আবহাওয়ায় একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে।

বাংলাদেশে বজ্রপাত বিষয়ে কোন গবেষণা নেই। ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকায় এ বিষয়টি নিয়ে বড় বড় গবেষণা চলছে। ২০০৮ সালে সুইডেনের উপসালায় ২৯তম ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ট্রেনিং প্রটেকশন’ শীর্ষক সম্মেলনে তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কলিন প্রাইস তাঁর ‘থান্ডারস্টর্ম, লাইটিং এ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণ তথা পরিবেশ দূষণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বজ্রপাতের। বজ্রপাতে একদিকে যেমন বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বেড়েছে পরিবেশে বজ্রপাতের হার ও তীব্রতা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের সাপ্তাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসের তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে বজ্রঝড়।

বিশিষ্ট আবহাওয়াবিদ ড. সমরেন্দ্র কর্মকার জানান, বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। মৌসুমী বায়ু প্রবেশের আগে বাংলাদেশে কালবৈশাখী শুরু হয়। সাধারণত মার্চ থেকে শুরু করে মে পর্যন্ত চলে এ ঝড়। কালবৈশাখীর সময় বেশি বজ্রপাত ঘটে, মানুষ বেশি মারা যায়। আবহাওয়া বিজ্ঞানে বলা হয়, গ্রীষ্মকালে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বাতাস গরম হয়ে উপরে উঠতে থাকে। জলীয়বাষ্পও উপরে উঠে আর মেঘের ভেতর যত বেশি জলীয়বাষ্প ঢুকবে তত বেশি উষ্ণ মেঘের সৃষ্টি হবে। এ সময় বাতাসে ‘আপ ড্রাফ’ এবং ‘ডাউন ড্রাফ’ চলতে থাকে। একে বলা হয় বজ্রমেঘ। মেঘের উপরের অংশে পজিটিভ এবং নিচের ও মধ্য অংশে নেগেটিভ বিদ্যুত তৈরি হয়। পজিটিভ ও নেগেটিভ বিদ্যুত মেঘের ভেতরের আধারে দূরত্ব বেড়ে গেলে প্রাকৃতিক নিয়মে ভারসাম্য আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পজিটিভ ও নেগেটিভ মেঘ থেকে বিদ্যুত আদান-প্রদান শুরু হয়। পজিটিভ ও নেগেটিভ বিদ্যুত সঞ্চালন শুরু হলে বজ্রের সৃষ্টি হয়। আর তখনই বজ্রপাত হতে থাকে। পজিটিভ ও নেগেটিভ মেঘ একত্র হলে বিদ্যুত সঞ্চালনের কারণে বাতাসের তাপমাত্রা ২০ হাজার ডিগ্রী থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে। মেঘের ভেতর থাকা নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসের সম্প্রসারণ ঘটে। গ্যাসের কম্পনে সৃষ্টি হয় মেঘের গর্জন। বজ্র সৃষ্টি হয়ে তা পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ার প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল বলে জানান ড. সমরেন্দ্র কর্মকার। বজ্রপাতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাও খুবই কঠিন। তবে সতর্ক হলে মৃতের সংখ্যা কমানো যেতে পারে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশের আগমুহূর্তে ঘন কালো মেঘ দেখলেই সাবধান হতে হবে। গুড়গুড় মেঘের ডাক শুনলেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। পাকা বাড়িতে আশ্রয় বেশি নিরাপদ। গাড়ির ভেতরেও আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। গাছের নিচে, টেলিফোনের খুঁটির পাশে বা বিদ্যুত সঞ্চালন লাইনের খাম্বার পাশে দাঁড়ানো মোটেও নিরাপদ নয়। ফাঁকা মাঠের মধ্যে অবস্থান সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলে তিনি জানান। পানির সংস্পর্শে মোটেই যাওয়া যাবে না। মার্চ থেকে এপ্রিলে কালবৈশাখী সাধারণত দুপুরের পরে হয়ে থাকে। এরপর মের শেষ পর্যন্ত সকালেও হয়ে থাকে। পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর আকাশে মেঘের গুড়গুড় শুরু হলেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে বিদ্যুত চমকালে বজ্রপাতে মৃত্যুর আশা কম থাকে। আর বৃষ্টি ও মেঘের গর্জন না থামা পর্যন্ত নিরাপদে থাকা বাঞ্ছনীয় বলে জানান ড. কর্মকার। তিনি আরও জানান, বজ্রপাতের আওয়াজ শোনার আগেই তা মাটি স্পর্শ করে। সোজাসুজি মানুষের গায়ে পড়লে মৃত্যু অবধারিত। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করাও বিপজ্জনক। শুকনো কাঠ দিয়ে ধাক্কা দিতে হবে। তিনি জানান, বজ্রপাতের সম্ভাবনা আবহাওয়া বিভাগের রাডারে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘নাউকাস্টনিং’ পদ্ধতিতে মিডিয়াতে প্রচার করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ স্থানে যেতে পারে। এতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। ঝড়ের পূর্বাভাস দেখলে কখনও খোলা মাঠ, পাহাড়ের চূড়া, সমুদ্রসৈকতে অবস্থান করবেন না। গাছের নিচে, বিদ্যুতের খুঁটি বা তারের নিচে, পুরনো-জীর্ণ বাড়ির নিচে অবস্থান করবেন না। চলন্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে গাড়িতে অবস্থান করুন। কর্ডযুক্ত কোন ফোন ব্যবহার করবেন না। মাটির সঙ্গে সংয্ক্তু ধাতব পদার্থে হাত বা হেলান দিয়ে দাঁড়াবেন না। বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত পানির ফোয়ারায় গোসল করবেন না। মরা কিংবা পচন ধরা গাছ ও খুঁটি কেটে ফেলুন। বাসা, অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হলে বিদ্যুতের সব সুইচ বন্ধ রাখুন এবং দরজা-জানালা ভালমতো বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন আবহাওয়াবিদ ড. সমরেন্দ্র কর্মকার।

প্রকাশিত : ৯ এপ্রিল ২০১৫

০৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: