কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘এমন প্রশ্ন করবে যার উত্তর খুঁজে পাবে না’

প্রকাশিত : ৮ এপ্রিল ২০১৫
  • বলেছিলেন সতীর্থরা
  • মোঃ মামুন রশীদ

বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেটার যাঁর ওয়ানডে ও টেস্ট ক্যারিয়ার মিলিয়ে ১০০ সেঞ্চুরি রয়েছে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৪৯ আর টেস্ট ক্যারিয়ারে ৫১ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। বিরল সেই রেকর্ডের মালিক জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি বনে যাওয়া ভারতের ব্যাটিং বিস্ময় শচীন টেন্ডুলকর। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে সেঞ্চুরিটা পেতে বেশ অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। ভারতীয়দের চোখে ‘ব্যাটিং ঈশ্বর’ হিসেবে গণ্য লিটল মাস্টার প্রথম শতক যেদিন হাঁকালেন তখন খেলে ফেলেছেন ৮ টেস্ট। ওয়ানডে শতকটা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও দীর্ঘ সময়। ৫ বছর এবং ৭৯ ওয়ানডে! তবে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরুর এক বছরের মাথাতেই কাক্সিক্ষত শতকটার দেখা পেয়ে গিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড সফরে ১৯৯০ সালে শতকটা হাঁকান। শুধু সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন এমন নয় পুরো একদিন উইকেটে থেকে ১১৯ রানে অপরাজিত অবস্থায় ফিরেছেন, দলকে বাঁচিয়েছেন পরাজয় থেকে। ১৯৯০ সালের আগস্টে ম্যানচেস্টারের ঘটনা সেটি। তা কি কখনও ভুলতে পারবেন শচীন! একটা কিছু বারবার করার জন্য অন্তত শুরুটা তো করতে হয়। সেই শুরুটা যে ম্যানচেস্টার থেকেই হয়েছিল!

ক্যারিয়ারের প্রথম শতক, তাও আবার ম্যাচ বাঁচানো অপরাজিত ইনিংস। স্বীকৃতিটাও পেয়েছিলেন ম্যাচসেরার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেটাও আবার প্রথম ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়া। সবমিলিয়ে একেবারে সোনায় সোহাগা! প্রথমবার সংবাদ সম্মেলনে মুখোমুখি হতে হবে তাই কিছুটা অস্বস্তি আর স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন। যেতেও চাননি। কিন্তু যেতে হবেই। ১৭ বছর বয়সী কিশোর তখনও, পরিণত হননি, অভিজ্ঞতাও নেই। বুক তো দুরু দুরু কাঁপবেই বিশ্ব মাতানো লেখিয়েদের প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে! সতীর্থরা তখন মজা করে বলেছিলেন, ‘এমন কঠিন প্রশ্ন করবে যে কোন উত্তরই খুঁজে পাবে না। খুবই কঠিন মুহূর্ত অপেক্ষা করছে তোমার জন্য!’ ক্যারিয়ারে অনেকবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্ব কাঁপানো লেখিয়ে, সাংবাদিকদের হাজারো প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন অকপটে। কিন্তু প্রথমবার সেটা করতে গিয়ে যে মজার অভিজ্ঞতা সেটাই নিজের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’-তে বর্ণনা করেছেন শচীনÑ

ক্যারিয়ারের শুরুতেই কঠিন সব চ্যালেঞ্জ। ১৬ বছর বয়সী একজন ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেশের মাটিতে খেলার সুযোগটাই পাননি কাঁটায় কাঁটায় একটা বছর। আন্তর্জাতিক ম্যাচে নস্যিতুল্য হলেও চ্যালেঞ্জিং সেসব সফরটা ভালভাবেই উতরে যাচ্ছিলেন তিনি। তবু যদি পরিচিত এবং বন্ধুভাবাপন্ন জায়গায় হতো সেটাও কথা ছিল। কিন্তু শুরুই করলেন চিরশত্রু দেশ পাকিস্তান সফর দিয়ে। এরপর উপমহাদেশের দলগুলো যেসব পরিবেশে খাবি খেতে থাকে সেসব দেশে সফর করতে হয়েছে। পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড। তবে নিজের ব্যাটিং দক্ষতা দেখিয়ে ঠিকই দলে নিয়মিত হয়ে গেছেন। বয়সে ছোট হলেও কাজে কারও অংশে কম যাননি। মিডলঅর্ডারে নির্ভরতা দেখানোটা খুবই জরুরী। সেই নির্ভরতা কিশোর শচীনের ব্যাটে খুঁজে পেয়েছিল টিম ইন্ডিয়া। অভিষেক হওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় ইংল্যান্ড সফরে প্রথমবারের মতো দলের সঙ্গে গেলেন শচীন। ক্রিকেট মক্কা লর্ডসে খেলার যে স্বপ্ন সব ক্রিকেটারের থাকে তা পূর্ণ হলো সফরের শুরুতেই। তবে সেই উত্তেজনায় হোক, আর ইংল্যান্ডের অপরিচিত পরিবেশের কারণেই হোক ব্যর্থ হলেন শচীন। লর্ডসে প্রথম টেস্টে করলেন ১০ ও ২৭ রান। শচীনের ব্যর্থতার পাশাপাশি দলও ব্যর্থ। ২৪৭ রানের বিশাল পরাজয় নিয়ে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য ম্যানচেস্টারের পথ ধরে ভারতীয় দল।

ভারতকে চেপে ধরার উপলক্ষ পেয়ে যায় স্বাগতিক ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে গ্রাহাম গুচ, মাইক আথারটন ও রবিন স্মিথের সেঞ্চুরিতে ৫১৯ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায়। জবাবটা অবশ্য খারাপ দেয়নি ভারতীয় দলও। অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ১৭৯ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস, সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারের ৯৩ রান ৪৩২ রানে শেষ করে ভারত। দারুণ এক জুটি গড়ে দলকে বড় সংগ্রহ পেতে বড় অবদান রেখেছিলেন শচীনও। করেছিলেন ৬৮ রান। তবে দ্রুতই দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ৩২০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে ভারতকে ঠেসে ধরে ইংলিশরা। শেষদিনে ৪০৮ রানের জয়ের লক্ষ্য, ১২৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের শঙ্কাই ধুঁকছে ভারত। সেই সময় ত্রাণকর্তা হয়ে গেলেন ১৭ বছরের কিশোর শচীন! রবী শাস্ত্রী, নভজ্যোত সিং সিধু, মাঞ্জেরেকার, দিলীপ ভেংসরকার ও আজহারউদ্দিনরা সাজঘরে। শচীন সঙ্গী হিসেবে পেলেন কপিল দেবকে। কিন্তু কপিল বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। পরে যোগ দিলেন মনোজ প্রভাকর। দু’জন মিলে অপরাজিত থাকলেন দিনের শেষ সময় পর্যন্ত। দলকে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। অবিচ্ছিন্ন ১৬০ রানের জুুটি হলো সপ্তম উইকেটে। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ইনিংসটা খেলে বিস্ময় উপহার দিলেন শচীন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডবাসী দেখল এ্যাঙ্গাস ফ্রেজার, ডেভন ম্যালকম আর ক্রিস লুইসদের মতো বোলারদের বিরুদ্ধে এক কিশোরের একক লড়াই। দিনশেষে ১৮৯ বলে ১৭ চারে ১১৯ রানের ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলে হাসিমুখে দলের তাঁবুতে ফিরলেন তিনি।

ম্যাচসেরার পুরস্কারটা জুটল শচীনের কপালেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার এমন পুরস্কার। তাই এমনিতেও উত্তেজিত ছিলেন এবং দারুণ সন্তুষ্টও। এ সময় ভয়ঙ্কর খবরটা দিলেন দলের ম্যানেজার মাধব মন্ত্রী। তিনি শচীনকে জানালেন, ম্যাচপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শচীনকেই মুখোমুখি হতে হবে গণমাধ্যমের। ভয়ের একটা শীতল স্রোত সঙ্গে সঙ্গেই বয়ে যেতে লাগল শচীনের শিরদাঁড়া বেয়ে। সারাবিশ্বের প্রখ্যাত ক্রীড়ালেখকদের প্রশ্নের মুখে দাঁড়ানো, এটাও কি সম্ভব? ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের জন্য সারা দিনরাত ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়াটাও এর চেয়ে ঢের সহজ! তাই ম্যানেজার মাধবকে তিনি বললেন,‘আমাকে কোনভাবে বাদ দেয়া যায় না? এটা কি অত্যাবশ্যক, কোনভাবে এড়ানোর উপায় আছে কি?’ মাধব বললেন, ‘কোন উপায় নেই, যেতেই হবে। এটা চিরাচরিত একটির সহজ কাজ। সাংবাদিকরা শুধু তোমার নিজের পারফর্মেন্স এবং ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন করবেন।’ তবে শচীনের এ কথোপকথন শুনে মজাটা নিতে ভোলেননি সতীর্থ অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা। তাঁরা এসে ভয় দেখালেন, ‘অত সহজ না! কঠিন একটা কাজ! এমন প্রশ্ন করবে যে কোন উত্তর খুঁজে পাবে না।’ তবে শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে বিষয়টা দারুণ উপভোগ করেছিলেন শচীন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘আমি খুবই অস্বস্তি নিয়ে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেটা খুবই সোজাসাপ্টা ধরনের একটা কথোপকথন ছিল। আমার শুধু নিজের চিন্তাভাবনাটা বর্ণনা করতে হয়েছিল। কোনভাবেই সেটা ভীতিকর কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। অধিকাংশ প্রশ্নই ছিল খুব ভদ্রোচিত। আর আমি বিখ্যাত সব ক্রিকেট লেখিয়েদের কাছ থেকে নানাবিধ মন্তব্য পেয়ে খুব আনন্দিত বোধ করেছি।’

তথ্যসূত্র : শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ৮ এপ্রিল ২০১৫

০৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: