মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে দাফনে আপত্তি মুক্তিযোদ্ধাদের

প্রকাশিত : ৮ এপ্রিল ২০১৫
  • পারিবারিকভাবে প্রস্তুতিও চলছে

রফিকুল ইসলাম আধার, শেরপুর থেকে ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আলবদর প্রধান মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের লাশ তার নিজ এলাকা শেরপুরে দাফন করা, না করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। কামারুজ্জামানের লাশ পারিবারিকভাবে এলাকায় দাফনের প্রস্তুতি থাকলেও এলাকায় দাফন না করতে দিতে একাট্টা হয়েছেন একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আর ওই অবস্থায় শেরপুরে চলছে ব্লক রেইড পদ্ধতিতে যৌথ অভিযান।

পারিবারিকভাবে লাশ দাফনের প্রস্তুতি ॥ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দ- কার্যকরের পর শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের কুমড়ি মুদিপাড়া গ্রামে পারিবারিকভাবে লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে। গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন তার মা সালেহা খাতুনের কবরের পাশেই তাকে চিরশায়িত করা হবেÑ মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত এলাকায় থাকা পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন কথাই জানা যায়। যেকোন সময় তার দ-াদেশ কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় স্বজনদের মাঝে বইছে শোকের মাতম। ওই সময় কামারুজ্জামানের বড়ভাই আলমাছ আলী বলেন, পারিবারিক সিদ্ধান্তের আলোকেই কামারুজ্জামানকে মার কবরের পাশে দাফন করা হবে। তবে সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিবারের লোকজন নিয়ে সাক্ষাত শেষে বেরিয়ে কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল বলেছেন, ওনার ইচ্ছা শেরপুরে প্রতিষ্ঠিত নিজের এতিমখানাতে যেন তার দাফন করা হয়। গ্রামের বাড়িতে মার কবরের পাশে কিংবা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা যেখানেই হোক না কেনÑ শেষ ভরসা হারিয়ে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী তার লাশ দাফনে প্রস্তুতই রয়েছেন।

পাল্টা অবস্থানে মুক্তিযোদ্ধারা ॥ কামারুজ্জামানের লাশ পারিবারিকভাবে এলাকায় দাফনের প্রস্তুতি থাকলেও বাদ সেধেছেন একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ সপক্ষের কয়েকটি সংগঠন। তারা কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে দাফন করতে না দিতে এককাট্টা হয়েছেন। ওই বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকীর হোসেন ও পুলিশ সুপার মোঃ মেহেদুল করিমের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড। ওইসময় জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নুরল ইসলাম হিরু, ডেপুটি কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, এটিএম জিন্নত আলী, জেলা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেনসহ বিভিন্ন স্তরের মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। স্মারকলিপিতে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান মুক্তিযোদ্ধারা। সেই সঙ্গে কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে যাতে না ঢুকতে পারে সে জন্য জেলার বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওই কর্মসূচীতে একাত্মতা পোষণ করে কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে না ঢুকতে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও শেরপুর পৌরসভার মেয়র হুমায়ুন কবীর রুমান, জেলা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি আমজাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান, জেলা যুবলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জুনায়েদ নুরানী মনি ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম সম্রাটসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা কামারুজ্জামানের লাশ যাতে শেরপুরের মাটিতে দাফন না হতে পারে সে জন্য তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।

ক্ষমা নেই সমন্ধি ভাইয়ের ॥ একাত্তরে মানবতাবিরোধী মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরও শেরপুরে কামারুজ্জামানের লাশ দাফনের সুযোগ দিতেও নারাজ তারই আপন সমন্ধিভাই অগ্রণী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত জিএম ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নুরল ইসলাম হীরু। অবশ্য চূড়ান্ত বিচারে ফাঁসি বহালের পর থেকেই ওই অবস্থানে রয়েছেন তিনি। নুরল ইসলাম হীরুর সহোদর ছোটবোন নুরুন্নাহার জোৎ¯œার স্বামী হলেও একাত্তরের যুদ্ধকালীন সম্পূর্ণই বিপরীত অবস্থান ও বিপরীত আদর্শের লোক তথা ঘাতক হওয়ায় এবার চূড়ান্ত অবস্থান নিয়েছেন। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান তার আপন ভগ্নিপতিÑএটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ৭৯ সালের দিকে পারিবারিকভাবে কামারুজ্জামানের সঙ্গে নিজের বোনের বিয়ের সময় বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি।

কিন্তু পরিবার বিয়ের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় নিজের ছোটবোন নুরুন্নাহার জোৎ¯œার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন হিরু। কামারুজ্জামানের সঙ্গে নিজের বোনের বিয়ের সেই ট্র্যাজিক অধ্যায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বোনের বিয়ের সময় মাকে বলেছিলাম, একদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে। তোমার মেয়ে বিধবা হবে। মা ও দুই ভাই সেদিন আমার কথা শোনেনি। এ কারণেই তাদের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক আমি ছিন্ন করেছি।

আদর্শের সঙ্গে আমি কোন সময়ই আপোস করিনি। তিনি কামারুজ্জামানের ফাঁসি বহাল থাকায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি তার লাশ শেরপুরে দাফন করতে না দেয়ার ঘোষণা দিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা চাই না ৭১’র নরঘাতক কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরের পবিত্র মাটিতে দাফন হোক। কামারুজ্জামানের দাফন প্রতিহত করতে নকলা, নালিতাবাড়ীসহ শেরপুরে প্রবেশের ৪টি পথে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেবে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস প্রশাসন নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। এ রায় বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে শেরপুর পূর্ণ কলঙ্ক ও দায়মুক্ত হবে।’

যুদ্ধকালীন কামারুজ্জামানের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কামারুজ্জামান ৭১’এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রধান হোতা ছিলেন। আমার ৩ বন্ধু বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা গোলাম মোস্তফা, কৃতী ফুটবলার কাজল ও শেরপুর সরকারী কলেজের ছাত্র আব্দুর রশিদসহ এলাকার নিরীহ মানুষ, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িতদের ধরে নিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায় কামারুজ্জামান। নালিতাবাড়ীর সোহাগপুরে ১শ’ ৮৭ জন পুরুষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে দিনে-দুপুরে নির্মমভাবে হত্যা করায় কামারুজ্জামান। যাদের সেদিন হত্যা করা হয়, তাদের দাফন-কাফনও করতে পারেনি এলাকাবাসী, এমন কথা বলেই আপ্লুত হয়ে পড়েন হিরু। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঘনিষ্ঠ ৩ বন্ধুর মুখায়ব ৪৪ বছর পর আবারও নিজের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কুখ্যাত রাজাকার ও নরপিশাচ কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর হবার পথে। রায় বাস্তবায়িত হলেই শুধুমাত্র ওদের আত্মা শান্তি পাবে। নীরবে আমাদের আর অশ্রু বিসর্জন দিতে হবে না। এ সব কথা বলতে বলতেই আবারও চোখ মোছেন ৭১’র রণাঙ্গনের এ বিপ্লবী মানুষটি।

রেইড ব্লক অভিযান ॥ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার নিজ এলাকা শেরপুরে চলছে রেইড ব্লক পদ্ধতিতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযান। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্যান্য দফতরের সদস্যদের নিয়মিত তৎপরতা বেড়ে গেছে অনেকটাই।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী, ভিকটিম ও জননিরাপত্তা আর স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে রয়েছেন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায়। জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে কয়েকটি স্ট্রাইকিং ফোর্স। যে কারণে রিভিউ খারিজের প্রতিবাদে জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ সুপার মেহেদুল করিমের ভাষ্য, কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং সকলেই সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

প্রকাশিত : ৮ এপ্রিল ২০১৫

০৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: