কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত

প্রকাশিত : ৭ এপ্রিল ২০১৫
ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত
  • ‘নাজি’র চেয়েও বর্বর’ যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের রিভিউ খারিজ
  • আজ রিভিউ রায়ের কপি সই হতে পারে
  • যে কোন মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর

আরাফাত মুন্না/মশিউর রহমান খান ॥ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কুখ্যাত বদর নেতা, ‘নাজির চেয়েও বর্বর হত্যাকারী মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখে সুপ্রীমকোর্টের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রীমকোর্ট। এর ফলে এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর করতে আর কোন বাধা রইল না। এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় জেল কোডের বিধান কার্যকর না হওয়ায় যে কোন সময়ই কামারুজ্জামানের এই মৃত্যুদ- কার্যকর করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নি জেনারেল।

সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপীল বেঞ্চ এ রায় দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

সোমবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের অন্য সদস্যরা এজলাসে ওঠেন। এরপর বেঞ্চ কর্মকর্তা কার্যতালিকার এক নম্বরে থাকা কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনটি ডাকেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ‘ডিসমিসড’ বলে এক শব্দে এ রায় ঘোষণা করেন।

এদিকে, রায় ঘোষণার পর থেকেই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রস্তুতি শুরু হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর অংশ হিসেবে কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরাও কারাগারে কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেন। অন্যদিকে, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রিভিউ খারিজের রায়ের অনুলিপিতে বিচারপতিদের স্বাক্ষর হয়নি বলে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোর্ট থেকে এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে কপি পৌঁছায়নি। বিচারপতিরা রায়ের অনুলিপিতে স্বাক্ষর করার পরই অনুলিপি আমাদের কাছে পৌঁছবে। আর কপি পেলেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এদিকে আজ সকালে কামারুজ্জামানের রিভিউ খারিজের রায়ের অনুলিপি পাওয়া যেতে পারে বলে সুপ্রীমকোর্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন।

এর আগে রবিবার কামারুজ্জামানের আবেদনের ওপর প্রায় দুই ঘণ্টা শুনানি হয়। কামারুজ্জামানের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। কামারুজ্জামানের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন রায় পুনর্বিবেচনার জন্য শুনানিতে চারটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো ধোপে টেকেনি। অন্যদিকে এ্যাটর্নি জেনারেল এর বিরোধিতায় বলেছিলেন, আজ যদি আমরা এই যুদ্ধাপরাধীদের অনুকম্পা দেখাই, তাহলে আমরা কিন্তু ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকব।

এদিকে, সোমবার রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ আইন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, আসামি পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং অন্যতম আইনজীবী শিশির মনির।

শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুরে ১২০ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায় গত বছর ৩ নবেম্বর আপীল বিভাগের এই বেঞ্চই বহাল রাখেন। পরে আপীলের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর তিন বিচারক। এরপর মৃত্যু পরোয়ানা পাঠিয়ে দেয়া হয় কারাগারে, কামারুজ্জামানকে তা পড়ে শোনানো হয়। মৃত্যু পরোয়ানা জারির চতুর্দশ দিনে গত ৫ মার্চ আপীল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিভিউ আবেদন জমা দেন কামারুজ্জামানের আইনজীবী জয়নাল আবেদিন তুহিন। ৪৫ পৃষ্ঠার এই আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে কামারুজ্জামানের খালাস চাওয়া হয়। গত ৮ মার্চ আপীল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রিভিউ আবেদনটি শুনানির দিন ধার্য করার জন্য আপীল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। এর পর দুই দফায় শুনানির দিন পিছিয়ে গত রবিবার শুনানি হয় কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনের।

এ্যাটর্নি জেনারেলের ব্রিফিং ॥ রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আপীল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরের দিনক্ষণ ঠিক করবে সরকার। সোমবার কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কামারুজ্জামান এখন দুটি সুযোগ পাবেন। একটি হলো রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া, অপরটি হলো তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাত করা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা কবে কখন চাইবেন আইনে তার নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা নেই। তবে আসামিকে যুক্তিসঙ্গত সময় দিতে হবে প্রাণভিক্ষার জন্য । তিনি আরও বলেন, তবে যুক্তিসঙ্গত সময় তো আর ৭ দিন বা ১৫ দিন হতে পারে না। জেল কর্তৃপক্ষ ঠিক করবেন তাকে কতক্ষণ সময় দেবে। কত দিনের মধ্যে কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর হতে পারে, প্রশ্নের জবাবে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কবে কখন রায় কার্যকর হবে তা ঠিক করবে সরকার। সরকার যে কোন সময়ই দ- কার্যকর করতে পারে।

রিভিউ খারিজের আদেশ কিভাবে জেল কর্তৃপক্ষ পাবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আপীল বিভাগ থেকে ট্রাইব্যুনাল হয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারে। আবার আপীল বিভাগ থেকে সরাসরিও জেল কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারে।

আসামি পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য ॥ রায় ঘোষণার পর কামারুজ্জামানের অন্যতম আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, কামারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেই তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবেন। তবে বিকেলে তারা কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলেও তাদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। বিকেলে শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তার সঙ্গে (কামারুজ্জামান) সাক্ষাত করার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ দেখা করতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। কী কারণে তাদের ‘না’ করে দেয়া হয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামারুজ্জামানের এ আইনজীবী বলেন, আমরা এখনও জানি না। তবে, একজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার আছে তার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কি চাইবেন না, সে বিষয়ে মতামত জানানোর। রাষ্ট্র তাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে বলেও অভিযোগ তোলেন শিশির মনির। তবে আইনত সর্বোচ্চ আদালতে রিভিউ নিষ্পত্তির পরে আর কোন আইনী কার্যক্রম নেই। যার ফলে আসামির সঙ্গে কোন আইনজীবীর দেখা করার কোন বিধান নেই।

পরিবারের সাক্ষাত সম্পন্ন ॥ ইতোমধ্যে কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন। দুপুর তিনটায় কারা কর্তৃপক্ষ তাদের কারাগারে ডেকে পাঠান। কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়ে কামারুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছান। এদের মধ্যে ৫ জন বয়স্ক ও ৪টি শিশু। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কামারুজ্জামানের স্ত্রী নুরুন্নাহার, দুই ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামি ও হাসান ইমাম ওয়াফি, মেয়ে আতিয়া নূর ও ভাগ্নি রোকসানা জেবিন। আগে থেকেই কারা ফটকে ছিলেন জামায়াতের একাধিক নেতা। সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে তারাসহ মোট ১৪ জন কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারের ভেতরে ঢোকেন।

দ- কার্যকরে কারাগারের প্রস্তুতি সম্পন্ন ॥ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। সরকারী নির্দেশ আসার পর যেন বিলম্ব না হয় সেজন্য কারা কর্তৃপক্ষ সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছে। ইতোমধ্যে একটি এ্যাম্বুলেন্সে করে কফিন কারাগারের ভেতরে পাঠানো হয়েছে। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছে যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসির আয়োজন। পাশাপাশি কারাগার ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতিতে যা প্রয়োজন তাও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। উপরের সামিয়ানা সাঁটানো হয়েছে। দড়িও প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়াও জল্লাদের একটি গ্রুপকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

দায়মুক্তির পথে এগুলো বাংলাদেশ ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের চূড়ান্ত রিভিউ আবেদনে মৃত্যুদ- বহাল রাখায়, স্বস্তি প্রকাশ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার। সোমবার সকালে রিভিউ নিষ্পত্তির প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে দায়মুক্তির পথে বাংলাদেশ আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। আশা করছি, অবিলম্বে এ রায় কার্যকর করে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করা হবে। এ রায়ের মাধ্যমে সোহাগপুরের বিধবা পল্লীর নারীদের বুকের ভেতর জমানো ৪৪ বছরের জগদ্দল পাথরটি সরে গেল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, এ রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান তারেকসহ অন্যান্য কর্মীরাও। এদিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে শাহবাগ থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের করে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। তাদের ‘জয় হলো রে জয় হলো, মুক্তিযুদ্ধের জয় হলো’, ‘জয় হলো রে জয় হলো/শাহবাগের জয় হলো’ প্রভৃতি সেøাগানে মিছিল মেতে ওঠে।

সাত অভিযোগে আপীল বিভাগের রায় ॥ একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষ সাতটি অভিযোগ এনেছে। এই অভিযোগ গুলা হলো- ১ নম্বর অভিযোগ : ২৯ জুন ১৯৭১ সাল রাত ১১টার দিকে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি থানার কালীনগর গ্রামের মোঃ ফজলুল হকের পুত্র শহীদ বদিউজ্জামানকে মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী ঝিনাইগাতি থানার রামনগর গ্রামের আহম্মদ মেম্বারের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। আহম্মদনগর ক্যাম্পে সারা রাত নির্যাতন করে পরের দিন আহম্মদ নগর রাস্তার ওপর গুলি করে হত্যা করা হয়। লাশ টেনে নিয়ে কাছে কাঠের পুলের নিচে পানিতে ফেলে দেয়। মোহাম্মদ কামারুজ্জামান আলবদর বাহিনীর নেতা হিসেবে সব সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিপে করে ওই ক্যাম্পে আসা-যাওয়া করত। এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হত্যাকা- সংঘটিত করত। এই অভিযোগ থেকে আপীল বিভাগ কামারুজ্জামানকে খালাস দিয়েছেন।

২ নম্বর অভিযোগ : একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি এক দুপুরে শেরপুর কলেজের তৎকালীন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ আব্দুল হান্নানকে খালি গায়ে মাথা ন্যাড়া করে, গায়ে ও মুখে চুনকালি মাখিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় চাবুক দিয়ে পেটাতে পেটাতে শেরপুর শহর ঘোরায় আসামি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা। এই অভিযোগে নিম্ন আদালতের দেয়া ১০ বছর কারাদ- বহাল রেখেছেন আপীল বিভাগ।

৩ নম্বর অভিযোগ : আসামির পরিকল্পনায় ও পরামর্শে একাত্তরের ২৫ জুলাই ভোর বেলায় রাজাকার, আলবদরসহ সেনাবাহিনী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাসপুর গ্রাম ঘিরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরুষ লোকদের হত্যা করে এবং মহিলাদের ধর্ষণ করে। ঘটনার দিন থেকে উক্ত গ্রাম বিধবা পল্লী নামে সর্ব মহলে পরিচিত। সেদিন ওই গ্রামে ১২০ জনকে হত্যা করা হয়। এই অভিযোগে আপীল বিভাগের চার বিচারপতিই কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন।

৪ নম্বর অভিযোগ : ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট মাগরিবের নামাজের সময় গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে ধরে নিয়ে যায়। কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর বাহিনীর লোকজন তাকে ধরে নিয়ে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে আসে। তার চাচা তোফায়েল ইসলাম আসামি কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে তাকে ছাড়িয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। ওই রাতেই কামারুজ্জামান ও তার আলবদর বাহিনী গোলাম মোস্তফা ও আবুল কাশেম নামে অপরা একজনকে মৃগি নদীর ওপর শেরী ব্রিজে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। গোলাম মোস্তফা মারা যায়। কিন্তু আবুল কাশেমের হাতের আঙুলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যায়। ট্রাইব্যুনালে এই অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দিলেও আপীল বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন।

৫ নম্বর অভিযোগ : একাত্তরের রমজান মাসের মাঝামাঝি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শেরপুরের চকবাজারের বাসা থেকে মোঃ লিয়াকত আলী, পিতা মোঃ সাদেক আলী মিয়া এবং মজিবুর রহমান জানু, পিতা মৃত আঃ আজিজ খান উভয় সাং চকবাজার, থানা শেরপুর। আসামি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ৪-৫ জন তাদের বাসা থেকে ধরে রঘুনাথ বাজারের বানথিয়া বিল্ডিংয়ে অবস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেখানে তাদের ৪ দিন আটক থাকার পর আসামি কামারুজ্জামানের নির্দেশে তাদেরসহ আরও ১১ জনকে ঝিনাইগাতি আহমদ নগর আর্মি ক্যাম্পে চালান দেয়। তাদের সকলকে আহমদ নগর ইউপি অফিসের পিছনে একটি গর্তের পাশে দাঁড় করায়। তাকেসহ তিনজনকে ওই লাইনে থেকে আলাদা করে বাকিদের গুলি করে হত্যা করে। গুলি করার সময় আসামি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগী কামরান উপস্থিত ছিল। ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগে কামারুজ্জামানকে খালাস দিয়েছিলেন। আপীল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায়ে এ বিষয়ে কোন আদেশ দেননি।

৬ নম্বর অভিযোগ : একাত্তরের নবেম্বর মাসে দিদারসহ কয়েকজনকে ময়মনসিংহ শহরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য দিতে বাধ্য করতে সেখানে নির্যাতন চলে তাদের ওপর। ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগে কামারুজ্জামানকে খালাস দিয়েছিলেন। আপীল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায়ে এ বিষয়ে কোন আদেশ দেননি।

৭ নম্বর অভিযোগ : একাত্তরে ২৭ রোজার দিন দুপুরে টেপা মিয়ার বাড়ি ঘেরাও করে আলবদর বাহিনী। এরপর কামারুজ্জামানের নির্দেশে টেপা মিয়াসহ ৫ জনকে হত্যা করা হয়। টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জাহিরুল ইসলাম দারাকে আলবদর বাহিনী ধরে আনে। প্রথমে টেপা মিয়াকে বেয়নেট চার্জ করা হয়। পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, কামারুজ্জামান এসব অপরাধ করেছেন একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে। তার বিচরণক্ষেত্র ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনার কামারুজ্জামানকে ১০ বছর কারাদ- দিয়েছিলেন। আপীল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের রায়টিই বহাল রেখেছেন।

কে এই কামারুজ্জামান? ॥ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন। তার বাবা ইনসান আলী সরকার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র কামারুজ্জামান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি।

এই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়। জামালপুরে আলবদর বাহিনীর সাতটি ক্যাম্পের মধ্যে শেরপুরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়ি দখল করে বানানো ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন কামারুজ্জামান। সে সময় বহু মানুষকে হত্যা করা হয় ওই ক্যাম্পে।

স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান। ১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে রয়েছেন।

জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যার সর্বোচ্চ সাজার রায় কার্যকরের পর্যায়ে এল। এর আগে আপীল বিভাগে আসা যুদ্ধাপরাধের প্রথম মামলায় জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

প্রকাশিত : ৭ এপ্রিল ২০১৫

০৭/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: