কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মেক ইন বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
  • ড. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন খান

শিল্পোন্নয়নেই আমাদের দেশের ভবিষ্যত। বর্তমানে এ খাত থেকে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র ২০.০% আসছে। ২০১০ সালের শিল্পনীতিতে এ খাতের অবদান ২০২১ সাল নাগাদ ৪০.০% এ উন্নীত করার আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। তবে এটা শুধু বেসরকারী খাতের ওপর ভরসা করে অর্জন করা সম্ভব নয়। সরকারী খাতকেও এ প্রক্রিয়ায় শক্তভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিল্পনীতিতে সরকারী খাতের উপরও সমগুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। চীনের আদলে সরকারী খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের সমস্যা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তার দ্রুত সমাধান করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধুর আমলে আমদানি বিকল্প শিল্পনীতি করা হয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলো অন্য অনেক কিছুর মতো এটাকে নির্বাসনে পাঠায় যা আমাদের শিল্পোন্নয়নের পথকে বন্ধ করে দিয়েছিল বলা যায়। সাম্রাজ্যবাদীদের পরামর্শে আমদানি বিকল্প নীতি বাদ দিয়ে তারা রফতানি তাড়িত শিল্পনীতি অনুসরণ করে। ফলে আমাদের দেশ আমদানিনির্ভর দেশে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর আমদানি বিকল্প শিল্পনীতি অনুসরণ করে নতুন শিল্পনীতি রচনা ও বাস্তবায়ণ করা এখন সময়ের দাবী।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকারগুলোর ঢালাও বাজার অর্থনীতি তথা বেসরকারী খাতের বিকাশের অবাধ নীতির সুযোগে আমাদের দেশের তথাকথিত পুঁজিপতিরা সরকারী খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহে নির্বিচার এক লুণ্ঠনযজ্ঞ চালায়। সরকারী ব্যাংকসমূহ থেকে ঋত নিয়ে ফেরত দেয়নি, উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগও তেমন একটা করেনি। সরকারী ব্যাংকের ঋণ নিয়ে সরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়েছে পানির দামে। সরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়ে তারা সেগুলো লাভজনকভাবে চালানোর কোন উদ্যোগ তো নেয়ইনি; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলোর জমি, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি স্থায়ী সম্পদ উচ্চ দামে বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে, আর কোন বেসরকারীকরণ বা বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হবে না। তাঁর এ ঘোষণা সাধুবাদযোগ্য।

বন্ধ ও চলমান সকল সরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনের অভিজ্ঞতার আলোকে লাভজনকভাবে চালানোর জন্য যা যা করণীয়, তা অতি দ্রুত সুপরিকল্পিতভাবে করা দরকার। তা’ছাড়া নতুন নতুন খাতে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ আমাদের দেশের ব্যক্তিগত খাত ল্যাপটপ, মোবাইলসহ আইসিটি খাতে কিন্তু এতদিনেও বিনিয়োগে এগিয়ে আসেনি। তারা বরং আমদানি ব্যবসা করতেই উৎসাহী। ২০১০ সালে টঙ্গী টেলিফোন শিল্প সংস্থায় সরকার দেশীয় ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ ও মোবাইল উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু দেখা গেল, ব্যক্তিগত খাতের ব্যবসায়ী তথা কমিশনভোগী কায়েমী স্বার্থের কাছে সরকার নতি স্বীকার করে উৎপাদন কর্মকা- বন্ধ করে দেয়। সম্ভবত ওখানে সামান্য তহবিল যোগান দেয়ার ব্যাপার ছিল। এ প্রকল্পে ১০০ কোটি এমনকি প্রয়োজনে ১০০০ কোটি টাকা দেয়া উচিত। কারণ দেশীয় ব্র্যান্ড বলে কথা। এ কাজে ১০০০ কোটি দিলে বিদেশী মুদ্রায় অন্তত ২০,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। কমিশন বাণিজ্য ও চোরাকারবারীর মতো অপরাধগুলো থেকে দেশ অনেকাংশে মুক্ত থাকত বৈকি। সরকারকে এ বিষয়ে জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমরা গড়ে তুলেছি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। আর চীনারা গড়ে তুলেছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ দু’য়ের মধ্যে পরিমাণগত ও গুণগত পার্থক্য রয়েছে। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে শুধু রফতানির জন্য উৎপাদন করা হতো। প্রথমদিকে এখানে উৎপাদিত পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রয় করা নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অভ্যন্তরীণ বাজারে অন্তত ৪০% পণ্য বিক্রি করা যাবে মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়। করমুক্তি, শুল্ক রেয়াত ইত্যাদি নানা ধরনের সুবিধাদি এখানে বিনিয়োগকারীদের দেয়া হয়। অপরদিকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেয়া হয়। বৈশিষ্ট্যসমূহকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো হয়। কোন রকম কর ও শুল্ক রেয়াত দেয়া হয় না। অর্থাৎ চীনারা কোন রকম কর বা শুল্ক রেয়াত দেয়নি। ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিস দিয়েছে তারা। ফলে তারা বিনিয়োগ নিয়ে কুলোতে পারেনি। অপরদিকে এত এত রেয়াত দেয়া সত্ত্বেও আমরা কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ পাইনি দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে। আশির দশকের গোড়ার দিকে চীনারা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের অঞ্চলগুলোতে মোট ১৪টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে। এগুলো খুবই সফল হলে তারা নব্বইয়ের দশকে মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে তা ছড়িয়ে দেয়। বর্তমানে তারা দুর্গম ও পশ্চাদপদ তিব্বত অঞ্চলেও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা শুরু করেছে। ভারতও চীনের এ সফলতায় উৎসাহিত হয়ে ভারতবর্ষব্যাপী ১০০-এর মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার এক উচ্চাকাক্সক্ষী কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। আমাদের দেশেও অঞ্চলভিত্তিক ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে দ্রুতই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা দরকার। চীনের আদলে আধুনিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলতে হবে এবং ‘ওয়ান স্টপ’ সেবা চালু করতে হবে। গোটা প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। তা’হলে আর রেয়াত, প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজন হবে না।

পোশাক শিল্প আমাদের ভবিষ্যত নয়। হাই টেক্ প্রোডাক্ট হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত। মূল্য সংযোজনের সুযোগ বেশি, এ ধরনের শিল্পায়নে যেতেই হবে আমাদের। সরকারী ও ব্যক্তিগত এ দু’খাতেই ক্ষুদ্র ও ভারি যন্ত্রপাতি, গাড়ি-বাস, লোকোমটিভ-ওয়াগন, কম্পিউটার-ল্যাপটপ, ফোনসেট-মোবাইল ইত্যাদি শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি টেক্সই শিল্পোন্নয়নের জন্য অবশ্যই শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা চীনারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছে। চীনারা সারা দেশব্যাপী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর খোল্-নল্চে পাল্টে ফেলেছে, গড়ে তুলেছে অসংখ্য বিশ্বমানের গবেষণাগার। আর এ কারণেই তারা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নিজ ব্র্যান্ডের পণ্য নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে। মেধাস্বত্ব ও প্যাটেন্টের ক্ষেত্রে চীনারা বিশ্বে এখনই তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পরেই তাদের স্থান। আর তাই চীনাদের পূর্বের ‘মেড ইন চায়না’এর সঙ্গে আরেকটি সেøাগান যুক্ত হয়েছে : ‘ডিজাইন্ড ইন চায়না’ অর্থাৎ শুধু চীনে প্রস্তুতকৃত নয়, চীনে আবিষ্কৃতও বটে। আমাদের শিল্পায়নে গবেষণার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদনের সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য নিয়ে দেশীয় ও বিদেশী বাজারে প্রবেশ করতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ সেøাগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। এর দ্বারা তিনি মূলত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছেন। আমরাও তা চাই। কাজেই আমাদের সেøাগান এ ক্ষেত্রে হবে তিনটি : ‘মেক ইন বাংলাদেশ’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ এবং ‘ডিজাইন্ড ইন বাংলাদেশ।’

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ

অর্থনীতি সমিতি

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: