কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আবারও বৈশ্বিক মন্দার পূর্বাভাস বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
  • কাওসার রহমান

আবারও বড় ধরনের মন্দার আভাস দিল বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মোড়ল এ সংস্থাটি মন্দার কারণে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি কতটা হ্রাস পেতে পারে তারও একটা সঙ্কেত দিয়েছে। বলেছে, চলতি বছর বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে শতকরা ৩ ভাগ এবং আগামী বছর শতকরা ৩ দশমিক ৩০ ভাগ। অর্থাৎ মন্দার কারণে বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।

বিশ শতকের ত্রিশ দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার শিকার হয়েছিল। সেই মন্দা কাটিয়ে উঠতে চার বছর সময় লেগেছিল। একইভাবে একুশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক মন্দার শিকার হয়, যা এখন দেশটি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার পথে। তবে এটা ঠিক, ত্রিশ দশকের মন্দা আর বর্তমান সময়ের মন্দা এক নয়। ত্রিশ দশকের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব শতকরা ৬ ভাগে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু দিন দিন বেকারত্বের হার কমছে যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও ২ লাখ ৯৫ হাজার জনের কর্মসংস্থান হয়েছে দেশটিতে। এর ফলে দেশটিতে বেকারত্বের হার ৫.৭ থেকে কমে ৫.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিসহ গত ১২ মাসে গড়ে ২ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির এ হার গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি দেশটিতে ডলারের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কিছুটা বাড়িয়েছে। দেশটিতে বেশিরভাগ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগ খাতে। তাছাড়া খাদ্য ও পানীয় দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুদামেও কর্মসংস্থান হচ্ছে মানুষের। ফলে ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারী খাত থেকে মানুষ আয় করেছে ঘণ্টাপ্রতি ৩ সেন্ট এবং দিনে গড়ে ২৪.৭৮ ডলার করে। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে মানুষের আয় বেড়েছে ২ শতাংশ।

শ্রমবাজারে যে গতি এসেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম) গত ৬ বছরে সুদহার শূন্যে নামিয়ে এনেছিল। আর তার প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ছে। বেড়েছে ক্রয়ক্ষমতাও। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আবার যে নতুন মন্দার আভাস দিয়েছে তা কি যুক্তরাষ্ট্র একা সামাল দিতে পারবে! অর্থনীতিবিদরা বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একার পক্ষে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা হ্রাস করা সম্ভব নয়। আবার ইউরোপীয় অর্থনীতির অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। বহু দেশের ব্যাংক সুদের হার কমিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করছে। কিন্তু ইউরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও সঙ্কটাপন্ন এবং অতি দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

বিশ্ব অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে একটি চালিকাশক্তির মাধ্যমে, সেই চালিকাশক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ দেশটির অর্থনীতি গোলাপের সুবাসিত মোহ নয় যে, তার সুবাসে বিশ্ব রক্ষা পাবে মন্দা থেকে। তবে বিশ্ব এক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা পাবে জ্বালানি তেলের বাজার থেকে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশ আর্থিক লাভবান হবে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে চীন এবং ভারত। এ দুটি দেশের অর্থনীতিতে অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হবে। অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি হ্রাস পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি কমবে এবং ব্যাংক সুদের হার হ্রাস পাওয়ায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

তবে তেল রফতানিকারক দেশগুলোর জন্য রয়েছে অশনিসঙ্কেত। অশনিসঙ্কেত হলো, তেলের মূল্য আরও কমতে পারে এবং যেসব দেশ তেলের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল তাদের আর্থিক বিপর্যয়ও অত্যাসন্ন। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে শতকরা ২ দশমিক ৯০ ভাগ। আর ২০১৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি হবে শতকরা শূন্য দশমিক ১০ ভাগ।

বৈশ্বিক মন্দার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, যার প্রধান কারণ ছিল গৃহায়ণ বুদ্বুুদ; যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাব-প্রাইম বন্ধকি বাজারে, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতের শিথিল নিয়ন্ত্রণ। আর্থিক খাত ও অর্থনীতিতে মন্দা এভাবে শুরু হওয়ার পর তা ছড়িয়ে পড়ে ওইসব শিল্পে, যেগুলো আর্থিক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ২০০৭ সালে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ লক্ষণগুলোর সমাধান করার নীতি গ্রহণ না করে বরং এমন নীতি গ্রহণ করা হয়, যা সমস্যাকে আরও বিস্তৃত ও গভীর করে ২০০৮ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় রূপ নেয়। এই অর্থনৈতিক মন্দা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যদিও সবচেয়ে ক্ষতি করে বৈশ্বিক আর্থিক খাত, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং উন্নত অর্থনীতিকে।

সেই ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিয়েছে, সেটা মিলে গেলে তা হবে পৃথিবীর মানুষের জন্য বিপর্যয়কর। এতে সারাবিশ্বে অর্থবাজারে অস্থির অবস্থা বজায় থাকতে পারে। একইভাবে সরকারী ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতে সরকারকে ব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদে ঋণ নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো কোনভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি বা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর নেতিবাচক নীতি থেকে মুক্ত নয়; যার ফলস্বরূপ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি বড় অংশকে এরা প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। শুধু পাকিস্তানই নয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে ভাল করছে। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের ওপর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল গতিশীল। ২০০৮-০৯ সালে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব বিরাজ করেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সারাবিশ্বের অর্থনীতিকে । কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তেমন আঘাত করতে পারেনি। এর কারণ হচ্ছে, বিদেশে বাংলাদেশের লোকেরা শ্রমিকের কাজ করে। দক্ষ কাজে বাংলাদেশের অংশীদার একেবারেই নগন্য। ফলে বৈশ্বিক মন্দায় রেমিট্যান্স তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আবার দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। বাংলাদেশ মূলত স্বল্প মূল্যের তৈরি পোশাক রফতানি করে। ফলে দেশের প্রধান রফতানি আয়ও খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বৈশ্বিক মন্দার ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়Ñ উভয়েই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণেই গতিশীল থেকে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অংশীদার। তাই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সমস্যা আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। এজন্য আমাদের আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো এই মন্দা মোকাবেলায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও টানা এক দশক ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার না কমা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে আগত মন্দা এ দেশটি কিভাবে মোকাবেলা করবে সেটাই, এখন ভাবার বিষয়।

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: