মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশে সেচ প্রসারণ

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৪.৪ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালের বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশ এ বছর শ্রীলঙ্কায় ১ মিলিয়ন টন চাল রফতানি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ক্রমবর্ধমান হারে শাকসবজি রফতানি হচ্ছে। শাকসবজির বাইরে তেমনি শীতাতপ বাহনে বাংলাদেশ থেকে আলু রফতানি শুরু হয়েছে। খাদ্যশস্যের এরূপ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফলদায়ক হয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত সার সরবরাহ ও সেচ সম্প্রসারণ। সার সরবরাহ নির্ভর করে এর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বিদেশ থেকে আমদানি এবং ভর্তুকি ও সহায়কিসহ বিতরণের উপর। আর সেচের ফলপ্রসূতা নির্ভরশীল রয়েছে খালবাহিত সেচপ্রকল্পসমূহ ও ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির অন্যান্য সেচ মাধ্যমের বিস্তৃতি এবং ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচ দেয়ার নিপুণতার উপর।

২০১০-১১ সালে দেশে সর্বমোট সেচকৃত এলাকার পরিমাণ ১৬.৯ মিলিয়ন একর বলে বিদিত হয়েছে। ২০০১-২০০২ সালে সর্বমোট সেচ এলাকার পরিমাণ ছিল ১১.৩৫ মিলিয়ন একর। ২০০৮-২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৫.৭ মিলিয়ন একর। সমকালের ১৬.৯ মিলিয়ন একর সেচ এলাকার মধ্যে ২.৭৫ মিলিয়ন একর জমিতে ভূ-পৃষ্ঠের পানি শক্তিচালিত পাম্প দিয়ে উঠিয়ে সেচ দেয়া হয়। বাকি ১৪.১৫ মিলিয়ন একর জমিতে সেচ দেয়া হয় নলকূপ দিয়ে। এর মধ্যে ২.৬৩ মিলিয়ন একরে সেচ দেয়া হয় গভীর নলকূপ দিয়ে এবং ১০.৬ মিলিয়ন একরে সেচ আসে (যন্ত্রচালিত) অগভীর নলকূপ দিয়ে। হস্তচালিত নলকূপ বা টিউবওয়েল দিয়ে সেচ দেয়া জমির পরিমাণ ৬০ হাজার একরের চেয়ে বেশি নয়। বাংলাদেশে খালবাহিত সেচ প্রকল্প মূলত দুটি : গঙ্গা-কপোতাক্ষ ও তিস্তা সেচ প্রকল্প। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের বিস্তৃতি নির্ভর করে গঙ্গা নদী দিয়ে প্রবহমান পানির পরিমাণের ওপর। পানি বিভাজন সম্পর্কিত ভারতের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে এতে শুকনো মৌসুমে প্রবহমান পানি বিভাজিত হচ্ছে এবং এর জন্য সমকালে শীত বা শুকনা মৌসুমে এই পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা রয়েছে।

তিস্তা নদীর পানি বিভাজন সম্পর্কিত কোন চুক্তি এখন পর্যন্ত হয়নি বলে তিস্তা নদীর অববাহিকায় যেসব খালবাহিত সেচের অবকাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। গঙ্গা ও তিস্তার বাইরে বাংলাদেশ এবং ভারতের মাঝে যে আরও ৫২টি সাধারণ নদী রয়েছে, তার পানি বিভাজন সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদিত না হলে এসব নদীকে কেন্দ্র করে খালবাহিত সেচের ব্যবস্থা প্রসারিত করা সম্ভব নয়। গঙ্গা ও তিস্তা বাদ দিয়ে কতিপয় অন্যান্য নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থা মূলত বন্যানিয়ন্ত্রণভিত্তিক সেচ প্রকল্প। যেমনÑ বরিশাল সেচ প্রকল্প, মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প, মুহুরী সেচ প্রকল্প মূলত বন্যানিয়ন্ত্রণভিত্তিক প্রকল্প। সেগুলোর সর্বাত্মক ব্যবহার সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিয়মিত সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার নিপুণতার ওপর নির্ভরশীল। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক মনোযোগ প্রশংসনীয় এবং সেচের উৎপাদনশীলতা বা ফিরতি তাৎপর্যমূলকভাবে উৎসাহব্যঞ্জক। এসবের বাইরে হাওড়, বাঁওড়, বিল, ছোট ছোট নদীনালা ও জলাশয় থেকে সেচের জন্য শক্তিচালিত পাম্প দিয়ে পানি ওঠান হয়। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার শক্তিচালিত পাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে। শক্তিচালিত পাম্প দিয়ে সমকালে ২.৭৫ মিলিয়ন একর জমিতে সেচ দেয়া হয়।

বাংলাদেশে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে সেচের ক্ষেত্রে গভীর নলকূপ, ক্ষুদ্র গভীর নলকূপ ও অগভীর নলকূপ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৩ সালে দৈবচয়নের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে গভীর, ক্ষুদ্র-গভীর ও অগভীর নলকূপ উৎসারিত সেচ বিষয়ে একটি জরিপ সম্পাদন করে ২০১৪ সালে তা প্রকাশ করেছে। এই জরিপে নগরাঞ্চলের সেচ, শক্তিচালিত পাম্পের ব্যবহার এবং প্রথাগত যেমন দোন দিয়ে সেচের অবস্থা দেখানো হয়। শক্তিচালিত পাম্প ও প্রথাগত সেচের হাতিয়ার দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ভূমির উচ্চতার তারতম্যের ভিত্তিতে সেচকার্যে ব্যবহৃত হয়। ভূ-পৃষ্ঠে পানির বিদ্যমান নাব্য ভারতের সঙ্গে সাধারণ ৫৩টি নদীর (গঙ্গা বাদ দিয়ে) পানি বিভাজনবিষয়ক চুক্তি এবং ওইসব চুক্তির ভিত্তিতে ভাটিতে বা বাংলাদেশে সেচ অবকাঠামোর পরিকল্পিত প্রসারের অবর্তমানে বাড়ানো কঠিন। নগরাঞ্চলে ফসলের জন্য সেচ প্রায় অনুপস্থিত। সমকালীন সেচকৃত জমির সবচেয়ে বড় অংশ এবং সেচভিত্তিক ফসলাদির সিংহভাগ উৎসারিত হয় নলকূপের সেচ দিয়ে। ২০০৮ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী দেশের সেচ এলাকা ছিল নিট চাষকৃত এলাকার প্রায় শতকরা ৮৪ ভাগ। ২০০৪ থেকে সেচ এলাকা বাড়ার যে ধারা দেখা গিয়েছে তার আলোকে বলা চলে যে, সেচের আওতাধীন জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এই বাড়ার পরিমাণ ২০০৯ এর তুলনায় ২০১০ সালে হয়েছে শতকরা ৪.৪৩ ভাগ। ২০০৪-২০০৫ সালের তুলনায় সমকাল পর্যন্ত এ বাড়ার পরিমাণ শতকরা ২৬ ভাগেরও বেশি। এই হারে বাড়া এখনও বিদ্যমান বলে ধরে নেয়া যেতে পারে । এই হারে বাড়ার কারণ সেচযন্ত্রাদির সংখ্যা এবং সেচযন্ত্রের আওতায় গড় সেচকৃত জমির পরিমাণ বৃদ্ধি। সাম্প্রতিককালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সেচ এলাকার এরূপ প্রসার তাৎপর্যপূর্ণ ও সফলতার পরিচায়ক।

জরিপে দেখা গেছে যে, একটি গভীর নলকূপ দিয়ে গড়ে ৭৯.৩ একর জমিতে সেচ দেয়া হয়। প্রতিটি ক্ষুদ্র অগভীর ও গভীর নলকূপের আওতায় সেচ দেয়া জমির গড় পরিমাণ ৫১.৬ একর এবং অগভীর নলকূপের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ১৩.৪ একর। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা ফসল ও জমির প্রকার ভেদ সত্ত্বেও সেচকৃত জমির গড় আয়তন ন্যূনপক্ষে শতকরা ২০ ভাগ বাড়ানো সম্ভব। স্পষ্টত গভীর ও ক্ষুদ্র গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে সেচকৃত জমির পরিমাণ বাড়ানো যায়। গড় কৃষি খামারেরর স্বল্পায়তন এবং একই খামারভুক্ত জমির ছড়ানো-ছিটানো অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত মালিকানার আওতায় চালিত গভীর নলকূপাদির সর্বাত্মক ব্যবহার সকল ক্ষেত্রে অনুকূলতম শীর্ষ মাত্রায় পৌঁছে না। ব্যক্তি মালিকানায় তত্ত্বাবধানের আপেক্ষিক সুবিধা কৃষক সমিতির ব্যবস্থাপনার চেয়ে অধিকতর ফলদায়ক।

তথাপি বলা চলে, এ ক্ষেত্রে দৃষ্ট ব্যবস্থাপনার ব্যত্যয়গুলো শনাক্ত করে মোটাদাগে উন্নততর পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানাধীন নলকূপের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা অধিকতর ফলদায়ক করা যায়। কৃষক সমিতির নলকূপের ব্যবস্থাপনা তথা ব্যবহার নিপুণতা বাড়ানোর পরিধি নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বিস্তৃত বলে মনে হয়। সমবায়ের সূত্র অনুযায়ী এসব সমিতির পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারী সহায়তা ইপ্সিত মাত্রায় এখনও বিস্তৃত হয়নি বা গড়ে ওঠেনি। সমবায় সমিতি পরিচালনার সূত্রগুলোর প্রয়োগের পরিধি ও নিপুণতা এ ক্ষেত্রে না বাড়ানো গেলে এর বিকল্প হিসেবে ব্যক্তি মালিকানা উৎসাহিত করা বিধেয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর ও অগভীর নলকূপের পানি যেসব সেচযন্ত্রের মালিকের নিকটবর্তী বা পার্শ্ববর্তী কৃষক ব্যবহার করেন, তাদের কাছ থেকে যথা নির্ধারিত হারে সেচের দাম আদায়করণে আইনি ও প্রশাসনিক সমর্থন বিস্তৃত করার পরিধি বিদ্যমান। এদিকে নজর দেয়া সেচ বিস্তৃতকরণ ও তথা অধিকতর ফসল উৎপাদনের জন্য ফলদায়ক হবে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এলাকায় সরকারী ব্যবস্থাপনাধীন গভীর নলকূপের ব্যবস্থাপনা নিপুণতর করা আবশ্যক। সরকার কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তীয় পরিদর্শন ও গবেষণার আওতায় এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা নিপুণতর করার লক্ষ্যে যথা ইপ্সিত পদক্ষেপ শনাক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার পরিধি এখনও বিস্তৃত। (চলবে)

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: