কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাসে বসে বাহাস

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য
  • ক্যাম্পাস বাস

বাসে চড়ে ফিরছিল কয়েক বন্ধু। হাবিব, তনয়া, মেহেদী, শাম্মী, সুমন। তাদের কথার বিষয় আগামীকালের ক্লাস টেস্ট। বিষয়টি নিয়ে একটু দুশ্চিন্তাই কাজ করছে তনয়ার মনে। তাকে সাহস দিচ্ছে মেহেদী। শুনাচ্ছে অভয়বাণী। মেহেদীর উপদেশ-বাক্য শুনে মুচকি মুচকি হাসছিল অপর তিন বন্ধুÑ সুমন, হাবিব ও শাম্মী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাসে এমন কথোপকথন শোনা নতুন কিছু নয়। এছাড়াও কথা বলাবলি হয় বাসের ভাড়া মিটিয়ে নিয়ে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বাস ভাড়া মিটিয়ে দেয় বন্ধুদের। গায়েও লাগে না। আর লাগবেই বা কেন? সাভার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল বা রাজধানীর আসাদ গেট যাওয়া কিংবা আসায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বাস ভাড়া মাত্র এক টাকা! এ কথা শুনে অনেকে হয়ত ভ্রƒ কুঁচকে ফেলেছেন। অবিশ্বাসের সুরে হয়ত বলতেও পারেনÑ এক টাকা? এ টাকা দিয়ে তো এখন বর্তমান বাজারে কিছুই পাওয়া যায় না। এমনকি সামান্য টফি-লজেন্স কিনতেও নিদেনপক্ষে দুই টাকা লাগে! কেউ কেউ আবার এ কথাও তুলতে পারেন, এ বুঝি শায়েস্তা খাঁর আমলের কথা বলছি আমি, কিংবা শোনাচ্ছি মোবাইল কোম্পানির অফারের চমকপদ বিজ্ঞাপন বার্তা। না, এটাই সত্যিÑ আর এটা এ আমলেরই কথা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বাস ভাড়া সত্যিই এক টাকা। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তাই সত্য।

পরের দিনের কথা। আস্তে আস্তে সময় বাড়ছে দিনের। ঘড়ির কাঁটা ঠিক দেড়টা বাজতেই বাসের টিনে কন্ডাক্টরের থাপ্পড়। ছেড়ে গেল, উঠে পড়েন। হুড়মুড় করে বাসে ওঠা। এরপর চলে তরুণ-তরুণীদের বাসের জানালার পাশে বসার অনুনয়। জানালার পাশে বসেই তৃপ্তির ঢেকুর। হেরে গলায় গান- চল না ঘুরে আসি অজানাতে, কিংবা ‘ওই দূর-দূরান্তে’। আবার কেউ কেউ হিন্দী ছবির সুপার রোমান্টিক গান গেয়ে চলে আপন সুরে। একদল তরুণের গিটার তারে সুরের ঢেউ আর কণ্ঠে রোমান্টিক গানের সুরের মূর্ছনা এটিই যেন চলে বাসের মধ্যে। পুরো বাসে এ সময় একরকম আনন্দের ঢেউ খেলে যায় সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত। ছোট ছোট চুটকি, দরাজ গলায় গান, কারো বা কর্কশ গলায় শুনে বন্ধুদের ‘এই থাম’ তিরস্কার। এর মাঝে যখন আসেন কন্ডাক্টর, মামা-খালা ভাড়া দেন। তখন সামনে পেছন থেকে সতীর্থ সুহৃদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘এই তোদের ভাড়া হয়ে গেছে’ কিংবা ‘তোদের ভাড়া আমি দিব’। সানজিদা তনয়া বাংলা বিভাগের তেমন এক ছাত্রী। তার বন্ধু মেহেদী, হাবিব, শাম্মী যখন বাসে গল্পে মশগুল, তখন কন্ডাক্টর কাছে যেতেই বলে ওঠেন ‘তোদের ভাড়া হয়ে গেছে’। শিক্ষার্থীদের এই একে-অপরের ভাড়া দেয়ার সংস্কৃতিকে ভাটা পড়ে মাঝে মধ্যে।

যখন কোন কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস মিস করে গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়, তখন। গণবাসগুলোও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঢাকা পর্যন্ত দশ-পনেরো টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে। অন্যদের তুলনায় যা প্রায় অর্ধেক। এইসব বাসে যাতায়াত করার সময় ভাড়া ‘হিজ হিজ হুজ হুজ’ মানে নিজেরটা নিজে। তখন আর আগ বাড়িয়ে সুহৃদকণ্ঠে কেউ বলে ওঠে না, ‘এই আমি তোদের ভাড়া’ দিচ্ছি কিংবা ‘তোদের ভাড়া হয়ে গেছে’। রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র রাশেদের মন্তব্য ‘আফটার অল শিক্ষার্থী, দশ টাকা ভাড়া কম নয়। তাই এক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব নিতে হয় নিজেদেরই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আসা-যাওয়া তার আনন্দই আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খালেদ হোসাইন তাঁর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে এমন কিছু মধুর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল আমরা সবাই সবাইকে চিনতাম। আর এর ফলে আমাদের মধ্যে ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত। বাসে বড়দের দেখলে কখনও বড় ভাই কিংবা বড় আপুরা সিট না পেলে তাদের জন্য আমাদের সিট ছেড়ে দিতাম। ক্যাম্পাস বাসে বেশিরভাগ সময়ই সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। তবে এ দাঁড়ানোর মধ্যে অনেক মজা হতো। তপ্ত দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনুষ্য প্রকৃতি ও নিসর্গ প্রকৃতির মধ্যে বিরাজ করত উদ্ভূত ভাললাগা। রাতে ক্যাম্পাসের বাসে ছিল অন্যরকম ভাললাগার দৃশ্যপট। দূরের শিয়ালের উচ্চ ডাকুনী আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার মন্ত্র, তার মধ্যেই রাস্তার দুই পাশের টিমটিম বাতির ল্যাম্প পোস্টের সামনে দিয়ে যেত বাস। সবাই কেমন উৎফুল্ল থাকতাম। যত দূর মনে হয় এ নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। ‘এটুকুন হেলপার,/এতো বড় বাস,/হেলপার বাসটাকে,/ মারে ঠাস ঠাস,/ বাস থেমে যায় যদি,/ মারে এক চড়,/ দুই চরে বয়ে যায়/ বৈশাখী ঝড়।’

দুপুর দেড়টায় দোতলা এই বাস ছাড়লেও প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিত্য সমাবেশ ঘটে দুপুর বারোটা থেকে। নতুন ট্রান্সপোর্টে সারি সারি সবুজ গাছের তলায় কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দু’পায়ে কিংবা এক পায়ে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের সঙ্গে গল্প করা, চায়ের কাপে চুমুক, বন্ধুর সঙ্গে খুনসুটি প্রভৃতি নিত্য লক্ষণীয়। এর মধ্যেই চলে সিøপে নাম লিখে সিট রাখার তুমুল প্রতিযোগিতা। এমন অভিযোগও আছে, একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের জন্য নয়; একই সঙ্গে ১০/১২ জনের সিট রাখেন। আর বাসে এমন সিøপে সিট রাখা নিয়ে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় বিরোধ। ঘটে ছোটখাটো তর্ক-বিতর্ক, হৈ চৈ, হাঙ্গামা। আহসান হাবিব নামের এক শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক নোটিশে সিট রাখার নিয়ম বাতিল করে দিলেই এ অবস্থার নিরসন হতে পারে। আমরা এটা দাবিও করছি। এছাড়া ক্রমশ বাসের ভাড়াটি এক টাকা হারে নিলেও, তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তুলে নিচ্ছেন। আগামী পর্যায়ে এটি বার্ষিক হারে তোলা হবে বলে বলা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে শিক্ষার্থীদের আচরণে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পরিবর্তন। এখন পুরো সময়জুড়ে বাসের ভেতর নান্দনিক কর্মকা-ের অনুশীলন দেখা যায়। চলে গল্প বলা, গানের শেষ লাইন থেকে অপর জনের গান গাওয়ার প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয় নাটক দলের যাওয়ার সময় সংলাপের অনুশীলন, আর কোন শিক্ষকের ক্লাস নেয়ার ভঙ্গি কেমন প্রভৃতি। এর মধ্যে চলে অপরাজনীতিকে ঘিরে তীব্র ঘৃণা ও নিন্দা প্রকাশ, রাষ্ট্র-সমাজ নিয়ে সংশয়। মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও প্রগতিশীলতা রুদ্ধ করতে প্রতিক্রিয়াশীলদের আস্ফালনের বিরুদ্ধে গাওয়া হয় প্রগতির গান। দেশের কোন কোন রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকদের বিরুদ্ধে চলে খিস্তি খেউর। গাবতলীতে প্রবেশ করে যখন বাসের চাকা ঘুরতে চায় না যানজটের কবলে পড়ে, তখন চলে যাচ্ছেতাই গালমন্দ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে যখন যে যার গন্তব্যে পৌঁছে নামার সময় হয়, তখন উচ্চারিত হয়Ñ ‘বন্ধু, ভাল থাকিস, নিরাপদে থাকিস, কাল দেখা হবে।’ এভাবেই চলছে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাস সার্ভিস, বাসের ভেতর বসে বাহাস, কথোপকথনের রেশ।

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: