মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চারুকলার লিচুতলায় চলছে বর্ষবরণের বিশাল কর্মযজ্ঞ

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
চারুকলার লিচুতলায় চলছে বর্ষবরণের বিশাল কর্মযজ্ঞ
  • দুয়ারে পহেলা বৈশাখ ॥ উৎসবে রং ছড়াতে আঙিনাজুড়ে ব্যস্ত চারু শিক্ষার্থী শিক্ষকরা

মনোয়ার হোসেন ॥ ঋতুচক্রের পালাবদলে দুয়ারে বাজছে বসন্তের বিদায় ঘণ্টা। খরতাপ নিয়ে আসছে নয়া ঋতু গ্রীষ্ম। শুরু হবে নতুন বছর। কেবল প্রকৃতিতে নয় রং লেগেছে হৃদয়েও। সেই আবহেই চলছে নতুন বছরের আগমনী বার্তা। বিদায় নেবে ১৪২১ বঙ্গাব্দ, গ্রীষ্মের উত্তাপ নিয়ে হাজির হবে বঙ্গাব্দ ১৪২২। সেই সূত্রে বাংলা বর্ষপঞ্জির নতুন মাসের প্রথম তারিখ পহেলা বৈশাখ নিয়ে বাঙালীর রয়েছে অন্তহীন আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও উদ্্যাপনের ঘনঘটা। ইতোমধ্যেই জাতিসত্তা প্রকাশের সবচেয়ে বড় এই উৎসবের রং ছড়িয়েছে রাজধানী শহরে। সেই রঙের বর্ণিল আভায় এখন স্নিগ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। চলছে নববর্ষ বরণের বহুমুখী কর্মযজ্ঞ। বিশাল আঙিনাজুড়ে শিল্পযজ্ঞ নির্মাণে তুমুল ব্যস্ত চারুশিক্ষার্থীরা। শিল্পকর্ম নির্মাণে তাঁদের পরামর্শ দিচ্ছেন চারুকলার শিক্ষকরা।

পহেলা বৈশাখে রাজধানীতে সবচেয়ে রং ছড়ানো আয়োজনটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা বর্ণে বর্ণময় এ শোভাযাত্রাটি কালক্রমে পরিণত হয়েছে নববর্ষ উদ্্যাপনের অন্যতম জাতীয় অনুষঙ্গে। আর এ কারণেই পহেলা বৈশাখকেন্দ্রিক কর্মযজ্ঞে বর্ণময় রূপ নিয়েছে চারুকলা প্রান্তর। বৈশাখের অন্যতম আকষর্ণ মঙ্গল শোভাযাত্রা সামনে রেখে অনুষদে চলছে বিপুল কর্মযজ্ঞ। এবারের শোভাযাত্রার সেøাগান ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’। সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধময় বাংলাদেশের বার্তা থাকবে শোভাযাত্রায়। প্রতিবারের মতো এবারও চারুকলার স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তৈরি করছেন নানান ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের কাঠামো তৈরি ও কাগজ লাগানোর কাজ চলছে। কাঠামোগুলোর নির্মাণ শেষে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে পরিপূর্ণ অবয়ব।

চারুকলার অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন ও পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষক শিশির ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা নির্দেশনা দিচ্ছেন চারুকলার বর্ষবরণ আবাহনের শিল্পকর্ম গড়ার। বর্তমান চারুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে মনের টানে যোগ দিচ্ছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সরাচিত্র সৃজন, পেপার কার্টিংয়ে নির্মিত মুখোশ, কাগজের ম্যাশের মুখোশ, জলরংয়ে চিত্রকর্ম সৃজন ও শোভাযাত্রার মূল অনুষঙ্গ কাঠামো নির্মাণÑ এই পাঁচটি ভাগে প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত রয়েছে বিশাল এই কর্মযজ্ঞে।

ঐতিহ্য ও শেকড়ের বার্তাবহ এমন আয়োজন সফল করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও চারুকলা অনুষদ অতীতের মতোই কোন প্রতিষ্ঠানের অনুদান নেয়নি। নিজস্ব ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বাংলা সংস্কৃতির শৈল্পিক উপস্থাপনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম বিক্রি করেই প্রতিবারের মতো এবারও এই আয়োজনের তহবিল গঠন করছে। চারুশিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রম এবং মেধা ও মননের নিখুঁত সংমিশ্রনে তৈরি হচ্ছে নানান শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম। এসব শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম বিক্রি করে মঙ্গল শোভাযাত্রার তহবিল গড়া হচ্ছে।

শনিবার সকালে চারুকলার সামনের করিডরে দেখা যায় বিশাল টেবিলে ওপর ছড়িয়ে আছে সারি সারি সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলছে চারুশিক্ষার্থীরা। আর সেসব সরাচিত্রে উদ্ভাসিত হচ্ছে পল্লীবধূর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেক রকমের পাখি, হাতি, লক্ষ্মীপেঁচা, বিড়াল, বাঘ, রাখালসহ বৈচিত্র্যময় লোকজ নানা বিষয়। সরাচিত্র সৃজনের পর সেগুলো ঠাঁই পাচ্ছে পাশের দুটি টেবিলে। বিভিন্ন আকৃতির এসব সরাচিত্র বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে হাজার টাকায়। সরাচিত্রের সঙ্গে রয়েছে তুহিন পাখি, কাগজের ফুল, বাঘের ছোট মুখোশ। পঞ্চ প্রদীপের সেটগুলো বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে হাজার টাকায়।

আরেক অংশে দেয়ালজুড়ে সাজিয়ে রাখা চারুশিক্ষার্থীদের চিত্রিত জলরংয়ের নানা বিষয়ভিত্তিক চিত্রকর্ম। এই অংশের তত্ত্বাবধান করছে নাহিদা নিশা ও অমিত নন্দীসহ একঝাঁক শিক্ষার্থী। নিশা জানান, ৮০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি ছোট আকৃতির চিত্রকর্মগুলো। আর বড় আকৃতিরগুলো বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়। এখানে কর্মরত রনি নামের এক চারুশিক্ষার্থীর ভাষ্য, আমি এই প্রথম শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছি। অনেক আনন্দ নিয়ে কাজ করছি। অনুষদের বড় ভাইরা খুবই আন্তরিকভাবে সাহায্য করছে। তাদের কাজ দেখে অনেক কিছু শিখছি।

মঙ্গল শোভাযাত্রার অনুষঙ্গ ॥ চারুকলার লিচুতলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ। এবারের শোভাযাত্রায় থাকবে ১০ থেকে বারোটি শিল্প-কাঠামো বা ভাস্কর্য। বিশাল আকৃতির একটি কাঠামোয় দেখা যাবে অশুভের ইঙ্গিতবহ একটি বিশাল হাতের থাবা। ২৫ ফুট উচ্চতার এই হাত চেপে ধরবে সাধারণ এক মানুষের গলা। বর্তমান সময়ের সহিংসতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হবে। জানালেন স্থাপনা প্রস্তুতকরণের সমন্বয়ক লিটন পাল। এই চারুশিক্ষার্থী বলেন, শোভাযাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গটি এই হাতের পাঞ্জার স্থাপনাটি। এটির মাধ্যমে চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাব। এছাড়াও অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে থাকছে পায়রা, কাকাতুয়া, মাছ, ঘোড়া, হাতি ও বাঘ। এবারের বিশেষ আর্কষণ থাকবে একটি ছাগল ও তার দুই ছানার স্থাপনা। যার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হবে গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধি। কারণ, গ্রাম বাংলায় সমৃদ্ধির আশায় ছাগল মানত করে কোরবানি দেয়া হয়। সেই বিষয়টি লক্ষ্য রেখেই এই স্থাপনাটি তৈরি হবে। এছাড়াও আনন্দের প্রতীক হিসেবে অধিকাংশ কাঠামোয় জুড়ে থাকবে শিশুর অবয়ব। শোভাযাত্রায় আরও থাকছে বিশালাকৃতির হাতি। এটি ভারতীয় বরেণ্য শিল্পী যামিনী রায়ের মোটিফ অনুসরণে নির্মিত হচ্ছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় কাঠামোটি হবে ২৮ ফুট উচ্চতার একটি টেপা পুতুল। পুতুলটি এক কোলে থাকবে কলসি আর অন্য কোলে জায়গা করে নেবে শিশুসন্তান। তবে আকৃতি বড় হওয়ায় এটি শোভাযাত্রায় অংশ নেবে না। এটি পহেলা বৈশাখের দিন চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। বেশিরভাগ স্থাপনায় অনুষঙ্গ হিসেবে শিশুদের আকৃতির কারণ প্রসঙ্গে লিটন পাল বলেন, আসলে বাচ্চারাই আনন্দের মূল অংশীদার। বিষয়টি মাথায় রেখেই আনন্দের প্রতীক হিসেবে অধিকাংশ স্থাপনাতেই বাচ্চাদের রাখা হচ্ছে।

মার্চের ২৫ তারিখ চারুকলা অনুষদের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধায়নে শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজ শুরু করেছেন। চারুকলা অনুষদের লিচুতলায় চলছে স্থাপনা তৈরির কাজ। সেখানে এখন বিভিন্ন স্থাপনার প্রাথমিক কাজ শেষ করা হয়েছে। বিশাল বিশাল বাঁশের তৈরি স্থাপনাগুলো এখন দেখতে নান্দনিক না হলেও, পহেলা বৈশাখের দুই আগে অর্থাৎ ১২ এপ্রিলের মধ্যেই শেষ করা হবে শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ। তখনই দেখা যাবে স্থাপনার আসল রূপ।

রঙ্গিলা মুখোশ ॥ ‘বৈশাখী সৈন্য ছাড়া প্রবেশ নিষেধ’ এমন কথা লেখা চারুকলা অনুষদের নিচতলার একটি শ্রেণীকক্ষে। ভেতরে চলছে কাগজ কেটে অবয়ব তৈরি ও রংয়ের প্রলেপে তা ফুটিয়ে তোলার কাজ। নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে প্রবেশ করতেই নজরে এলো অনেক রঙ্গিলা মুখোশ। রকমারি মুখোশের মাঝে চারুশিক্ষার্থীদের কর্মব্যস্ত অনেক মুখ। তাদের কাজের সমন্বয় করছেন অনুষদের স্নাতকত্তোর শেষ পর্বের শিক্ষার্থী এষা। এষা বলেন, ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল মুখোশ তৈরির কাজে ব্যস্ত। এদের মধ্যে রয়েছেন-সুফিয়ান, তপু, হামিদ, তমাল, সাকিবসহ অনেকে। এছাড়াও আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বড় ভাইয়া ও আপুরা। আর সর্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করছেন শিক্ষকরা।

শোভাযাত্রার পথপরিক্রমা ॥ পহেলা বৈশাখের দিন রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী বর্ষবরণ শেষে সকাল নয়টার দিকে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। উদ্বোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ আর বিশাল আকৃতির বাহনের সঙ্গে বাদ্য-বাজনার সহযোগে এ শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে বের হয়ে রূপসী বাংলা হোটেল চত্বর ঘুরে আবারও চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে।

চার দিনব্যাপী বৈশাখী অনুষ্ঠান ॥ নববর্ষ বরণে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে চারুকলা অনুষদ। ১৩ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তি উদ্্যাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ অনুষ্ঠান। ১৪ এপ্রিল বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় চারুশিক্ষার্থীদের অভিনয়ে মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা। এছাড়াও অনুষ্ঠিত হবে লোকগানের আসর।

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: