কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

খ্রিস্টের আত্মত্যাগ ও তাঁর পুনরুত্থানের শাশ্বত বাণী

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫
  • মার্টিন অধিকারী

খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসের বিষয়ে বলতে গেলে খ্রিস্টের ক্রুশীয় মৃত্যুর কথাটি প্রথমেই আসবে। প্রেমময় ক্ষমাশীল ঈশ্বর মানুষকে পাপের দাসত্ব থেকে উদ্ধার করার জন্য মানবদেহে যিশুখ্রিস্টরূপে অবতার হয়ে এলেন। তিনি ঘৃণ্য ক্রুশে আত্মবলিদান করলেন যেন তাঁর অনুগ্রহের অমূল্য দানে পাপীর প্রায়শ্চিত্ত হয়। পুরাকালে যিশাইয় ভাববাদী যেমন ভাববাণী করে বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের অধর্মের নিমিত্ত বিদ্ধ, আমাদের অধর্মের নিমিত্ত চূর্ণ হইলেন; আমাদের শান্তিজনক শাস্তি তাঁহার ওপরে বর্ত্তিল এবং তাঁহার ক্ষতসকল দ্বারা আমাদের আরোগ্য হইল...’ (যিশাইয় ৫৩:৫)।

জগতের দৃষ্টিতে যা ঘৃণ্য ও অপমানজনক ঈশ্বর তাকেই বেছে নিয়েছিলেন। তাই ঈশ্বরপুত্র হয়েও তিনি তাঁর ঈশ্বরত্বকে ধরে না রেখে মানুষের পাপজনিত সমস্ত দুঃখকে বরণ করে নেয়ার জন্য শুধু মানুষই হলেন না, তিনি জঘন্য অপরাধের কারণে কৃতদাসের জন্য নির্ধারিত সেকালের সেই মৃত্যুদ-, ক্রুশীয় মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন, যদিও তিনি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ছিলেন। দীনদরিদ্র, জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত-ক্লান্ত মানুষের সঙ্গে তিনি বাস করেছিলেন এবং মৃত্যুর জন্য তিনি হলেন দস্যু-তস্করদের মাঝে ক্রুশবিদ্ধ। অধিকারবঞ্চিত জনতার উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘হে পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত লোকসকল, তোমরা আমার নিকটে আইস, আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব।’ তিনি দুঃখী মানুষের চিরসঙ্গী, দীনবন্ধু। বিখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক খলিল জীব্রানের সত্য এ কথাটি মনে পড়ে ‘We can forget those with whom we have laughed, but we can never forget those with whom we have cried.’ পাপের ভয়াবহতার জন্য ঈশ্বরপুত্র ক্রুশে পিতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাঁদলেন। পাপী মানুষের শান্তির জন্যই ছিল তাঁর সে আর্তচিৎকার।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কথায় বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে- ‘খ্রিস্টিয়ান শাস্ত্রে বলে ঈশ্বর মানবগৃহে জন্মগ্রহণ করে বেদনার ভার বহন ও দুঃখের কণ্টককিরীট মাথায় পরেছিলেন। মানুষের সকল প্রকার পরিত্রাণের একমাত্র মূল্যই সেই দুঃখ। মানুষের নিতান্ত আপন সামগ্রী যে দুঃখ, প্রেমের দ্বারা তাকে ঈশ্বরও আপন করে এই দুঃখসঙ্গমে মানুষের সঙ্গে মিলেছেন, দুঃখকে অপরিসীম মুক্তিতে ও আনন্দে উত্তীর্ণ করে দিয়েছেন। ইহাই খ্রিস্ট ধর্মের মর্মকথা।’ পাপের ভয়ঙ্কর ফল খ্রিস্টের আত্মদানে প্রতীকী অর্থে প্রোথিত হয়েছে তাঁর ক্রুশে। ক্রুশ তাই খ্রিস্ট ধর্মের সর্বজনীন চিহ্ন।

কিন্তু খ্রিস্টের ক্রুশীয় মৃত্যুতেই মানবের পরিত্রাণের কাজের শেষ কথাটি নয়! ক্রুশে হত খ্রিস্ট আপাত পরাজিত এক সৈন্য; কিন্তু মৃত্যু থেকে তাঁর গৌরবদীপ্ত পুনরুত্থানে তিনি হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী বিজয়ী বীর। মৃত্যু থেকে পুনরুত্থান খ্রিস্টের ক্রুশকে দিয়েছে অনন্য এক মহিমা, নতুন এক অর্থ। খ্রিস্ট যদি পুনরুত্থিত না হতেন তাহলে ক্রুশ যে কেবল ঘৃণার বস্তু হয়েই থেকে যেত তা-ই নয়, খ্রিস্ট ধর্ম বলে কিছু হতো না। পুনরুত্থান খ্রিস্ট ধর্মের নির্ভরবিন্দু। বিখ্যাত প্রচারক Dr. Billy Graham-Gi K_vq- ÔThe resurrection of Christ is the fulcrum of Christian Theology.Õ

খ্রিস্টের পুনরুত্থানের অর্থ খ্রিস্ট শাশ্বত ও চিরঞ্জীব; তিনি সমস্ত সৃষ্টির উর্ধে কর্তৃত্বকারী প্রভু ও ঈশ্বর। জন্মে তিনি সৃষ্টিরূপে সৃষ্টির মাঝে এসেছিলেন; পুনরুত্থানে তিনি স্রষ্টারূপেই সবকিছুর উপরে তাঁর ঐশ্বরিক কর্তত্ব ও ক্ষমতা পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করলেন। বিশ্বাসীদের কাছে তাঁর দাবি এই, যেন তারা তাঁকে কেবল বিশ্বাসই নয়; তারা যেন তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে চলেন। তিনি চান আমাদের হƒদয়ের পরিবর্তন, ফলে আমাদের মধ্যে তৈরি হবে পাপের প্রতি ঘৃণা; কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি ও অন্য মানুষের প্রতি ভালবাসা ও সম্মানবোধ। পাপে পরিপূর্ণ এ জগতে আজ যেন সর্বত্রই অন্যায়, অসত্য ও অশান্তির রাজত্ব। জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ রাজা শলোমন বলেছিলেন, ‘দেখ, কেবল ইহাই জানিতে পাইয়াছি যে, ঈশ্বর মনুষ্যকে সরল করিয়া নির্মাণ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহারা অনেক কল্পনার অন্বেষণ করিয়া লইয়াছে’ (উপদেশক ৭:২৯)। এ কথার অর্থ এই যে, ঈশ্বর মানুষকে তাঁর প্রেম, পবিত্রতা ও ধার্মিকতার নৈতিক গুণাবলী দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু পাপের কারণে তার মধ্যে ওই সব গুণ আর প্রধান স্থানে নাই। ফলে ঈশ্বরের সঙ্গে ও অন্য মানুষের সঙ্গে তার সুসম্পর্কও সে হারিয়ে ফেলেছে। মানবসমাজে তাই যত পাপাচার, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও অপবিত্রতা।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণীভেদে সকল সাধারণ মানুষের জীবন এক অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। প্রকৃত শান্তি আজ বড়ই দুর্লভ। খ্রিস্টের পুনরুত্থান আমাদের সমস্ত প্রকারের লোভ, হিংসা ও সঙ্কীর্ণতার উর্ধে জীবনযাপনের আহ্বান জানায়। ঈশ্বরের যে আত্মার শক্তিতে খ্রিস্টের পুনরুত্থান হয়েছে, সেই শক্তিতেই আমাদের জীবনে পাপাত্মার উপরে জয়লাভ সম্ভব। তাই পুনরুত্থানের উৎসব পবিত্র আত্মাকে আমাদের জীবনকে নতুন করে তৈরি করার জন্য আহ্বানের মহাপর্ব।

খ্রিস্টের এ জগতে আসার পরে প্রায় দু’হাজার বছর চলে গেছে। তবুও মানবসমাজের অবস্থার বড় তারতম্য কি হয়েছে? জগতে সুন্দর ও ভাল অনেক কিছুই আছে। হিংসার পাশাপাশি প্রেম, অশান্তির মাঝে শান্তি, দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে সুখ-আনন্দ, হতাশার মাঝে আশা চিরদিনই আছে। কিন্তু সবকিছু মিলে মানবসমাজে অশান্তি, শঙ্কা ও হতাশার পাল্লাটিই বেশি ভারী। মন্দতার শক্তি ও প্রভাবই যেন প্রবল। বাইবেলে বলা হয়েছে, ‘একজন পাপী বহু মঙ্গল নষ্ট করে।’ এ কথার অর্থ এই যে, একটা সমাজের অকল্যাণ ও অমঙ্গল সৃষ্টিতে অল্প লোকই যথেষ্ট। তাই মন্দতার প্রভাব ধীরে ধীরে প্রবলই হয়ে থাকে। সবকিছুতেই আজ মূল্যবোধের দারুণ অবক্ষয়। খ্রিস্টের শিক্ষা, যেন আমাদের জীবন হয় ঈশ্বরকেন্দ্রিক ও মানবমুখী। তিনি বলেছেন, মানুষের জন্য দুটি শ্রেষ্ঠ আজ্ঞা আছে; প্রথমটি- স্রষ্টা ঈশ্বরকে আমাদের সমস্ত শক্তি ও সত্তা দিয়ে ভক্তি করতে হবে; দ্বিতীয়টি- অন্য মানুষকে নিজের মতোই ভালবাসতে হবে ও তার ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করতে হবে। আসলে খ্রিস্টীয় শিক্ষায় ঈশ্বরকে ভালবাসা ও মানুষকে ভালবাসা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানুষ তার নিজের বুদ্ধি, কোন উর্বর চিন্তা বা মেধা বা আয়ত্তবলে তার গুণগত কোন স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারে না। তা যদি হতো তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত উন্নতির যুগে মানুষের মূল্যবোধের এমন অবক্ষয় হতো না। ‘অন্যের জন্য বিবেচনা’ সর্বযুগে ও সর্বস্থানেই মানুষের এক বড় বাস্তবধর্মী মূল্যবোধ। কিন্তু আজ তা বোধ করি সব সমাজেই কোন না কোন প্রকারে লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে।

খ্রিস্টের আত্মদান ও পুনরুত্থানের শাশ্বত আহ্বান চির সত্য ও সুন্দরের জন্য খ্রিস্টের মহাজীবন ও শিক্ষাকে অনুসরণ করে চলার আহ্বান। সমস্ত জরাজীর্ণতা ও কলুষতার উর্ধে নতুন জীবনে চলার আহ্বান। খ্রিস্টের শক্তি ও আশীর্বাদে আমরা ইহজগতে আমাদের জীবন নতুন ও সুন্দর করে নিতে পারি। কঠিন এ বাস্তবতার জগতে জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের পথে তিনি আমাদের সহযাত্রী। আমাদের কেবল তাঁর কাছে ফিরে আসতে হবে, মাথা নোয়াতে হবে তাঁর কাছে। ‘Earth has no sorrwo heaven cannot healÕ- বলেছিলেন টমাস মূর। মানুষের এমন কোন ব্যথা নাই যা ঈশ্বর সেরে দিতে পারেন না। তাঁকে দিতে হবে আমাদের হৃদয় ও মন। তাঁর অনুসারীর কাছে মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রিস্টের আহ্বান- ‘তোমার হৃদয় আমাকে দেও, কারণ সেখানেই যে প্রকৃত জীবনের আরম্ভ!’

লেখক : খ্রিস্টীয় ঈশতত্ত্ব মহাবিদ্যালয় বাংলাদেশের অধ্যক্ষ

প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০১৫

০৫/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: