কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জাদু কেবলই বিনোদন নয়...

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫
  • জনাকীর্ণ রাজপথে চোখ বেঁধে মোটরসাইকেল চালাতে পারেন

কিশোরবেলায় জাদুবিদ্যায় হাত পাকিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর বয়সেও জনাকীর্ণ রাজপথে চোখ বাঁধানো অবস্থায় মোটরসাইকেল চালাতে পারেন তিনি। তখন ট্রাফিক কনস্টেবলও বুঝে উঠতে পারেন না কি করবেন। মঞ্চে তো আরও কয়েক কাঠি সরেস। মানব মস্তিষ্কের (নিউরণ) যত নিউক্লিয়াস আছে সবগুলোকেই কিলবিল করে নাচিয়ে এতটাই সম্মোহন করেন যে, পিনপতন নীরবতায় তাক লেগে যায় দর্শক।

অডিয়েন্সে বলাবলি হয়, এসব কি সম্ভব! ম্যাজিশিয়ানের (জাদুকর) কথা- মঞ্চের সবকিছুই বিজ্ঞান। জাদুবিদ্যায় তন্ত্রমন্ত্র কিছুই নেই। সবই মেডিটেশন থেকে কয়েক ধাপ পেরিয়ে সাধনার মাধ্যমে সম্মোহন (হিপনোটাইজ)। জাদুকররা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে (সিক্সথ সেন্স) টানা সক্রিয় রেখে কণ্ঠ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, হাতসাফাইকে শৈল্পিক কারুকাজে পরিপূর্ণতা আনেন। এই জাদুকরের পুরো নাম আমিনুল ইসলাম মিন্টু। অধিক পরিচিতি এ আই পিন্টু নামে। তিনি বাংলাদেশ জাদুকর পরিষদের যুগ্মসম্পাদক। বাড়ি চট্টগ্রাম। পাহাড়তলী রেলওয়ে হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় জাদু শেখেন আব্দুল গফুরের (প্রয়াত) কাছে। তারপর চট্টগ্রামের পরিচিত মুখ আলাদীন চাচার হাত ধরে জাদু শিখে ভারতে গিয়ে দীক্ষা নেন নারায়ণ চক্রবর্তীর কাছে। এরপর নেপাল হয়ে বাংলাদেশ। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সমানতালে এগিয়ে চলেছেন।

বর্তমানে অবস্থান করছেন বগুড়ায়। তাও বছর চারেক হয়ে গেল। এরমধ্যে বগুড়া-রংপুর সড়কের ধারে ইন্দ্রজাল ম্যাজিক একাডেমি গড়ে তুলেছেন। একাডেমিতে শিক্ষার্থী বাড়ছে। বললেন, জাদু শেখার আগ্রহ একটা নেশা। তবে ধৈর্য, অধ্যাবসায় ও সাধনা খুবই গুরুত্ব বহন করে। একই সঙ্গে পদার্থব্যিদা, রসায়নবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র জানা দরকার। উন্নত জাদু প্রদর্শনে বিজ্ঞানের বিষয়ের ওপর দখল থাকা বাঞ্ছনীয়। এ আই মিন্টু এক শ’রও বেশি উন্নতমানের জাদু প্রদর্শন করেন।

অনেক জাদু মঞ্চের বাইরে যে কোন স্থানে পরিবেশন করতে পারেন। তাঁর কথায়, ‘ওয়ানস এ ম্যাজিশিয়ান অলওয়েজ এ ম্যাজিশিয়ান’। ভাবার্থ হলো, জাদুশিল্প এমন একটি মাধ্যম যিনি একবার এটি আয়ত্ত করে নিজের দখলে নিতে পারেন, তিনি পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে ম্যাজিক দেখাতে পারবেন না। মঞ্চে, পথেঘাটে, খোলা মাঠে বদ্ধ জায়গায়, বন্ধুদের আড্ডায় ম্যাজিক দেখাতে তারা দর্শকদের চেয়ে বেশি মজা পান। উদাহরণ দিলেন এভাবে- কোন ম্যাজিশিয়ান কোথাও কারও সঙ্গে গল্প করলেও এর মধ্যেই কোন না কোন ম্যাজিক দেখিয়ে পরম তৃপ্তি পান।

কখনও নিজে থেকেই বলে বসেন, হয়ে যাক একটা ম্যাজিক। এই জায়গাতেই অন্যান্য শিল্পীর সঙ্গে ম্যাজিশিয়ানের পার্থক্য। যেমন কোন গানের শিল্পীকে গান গাইতে বললে মুডি হয়ে যান। কণ্ঠ ঠিক নেই, এটা গানের জায়গা নয়- এমন কথা বলে নীরব থাকেন। জাদুশিল্পীরা ঠিক উল্টো। প্রবাদের সেই কথা, একে তো নাচুনি বুড়ি তার ওপর ঢাকের বাড়ির মতো। জাদুর কথা বলতেই তা হয়ে যায়। এজন্য জাদুকররা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কিছু না কিছু নিয়েই বের হন। যেমন এ আই মিন্টুর পকেটে থাকে সুতাসহ ছোটখাটো নানা জিনিস।

সুতা দিয়ে তিনি মিসরের জিপসি থ্রেড জাদু দেখান। জাদুকররা সুন্দর করে কথা বলা শেখেন। কারণ প্রতিটি জাদুতেই একটি করে গল্প তৈরি করেন। গল্পের ছলে মোহাচ্ছন্ন হলেই সম্মোহনের মাত্রা বেড়ে যায়। এরমধ্যেই যা করার করে ফেলেন জাদুকর। সাধারনত প্রতিটি জাদুর একটি করে নাম দেয়া হয়। যেমন কৃপণের স্বপ্ন, পদ্মার পানি, ঢাকির বাজনা, ম্যাজিক ফটো ফ্রেম, মাই জাস্ট ড্রিম, লিংকিং রিং, স্টোরি অব এ্যা রোপ ইত্যাদি। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য হলোÑ মানুষেকে দ্বিখ-িত করা, শূন্যে ভাসিয়ে নেয়া, দূরের বাঁশি, ইন এ্যা বক্স ইত্যাদি।

তিনি বলেন, ম্যাজিকের অন্যতম উপাদান হলো হিপনোটাইজ। এই কাজের অন্যতম উপাদান মেডিটেশন। সেখান থেকে সম্মোহন। তারপর দর্শকদের মিস ডিরেকশনে নিয়ে যাওয়া এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার। জাদুর প্রতিটি পরতেই রয়েছে নানা ধরনের সিগন্যাল। এই সিগন্যাল এসছে টেলিপ্যাথি থেকে। নিউরণ থেকে সৃষ্ট জাদুর সিগন্যাল ঠিকমতো ফলো করতে না পারলে একটু এদিক ওদিক হলেই দর্শক ধরতে পারবে।

এ আই মিন্টু বললেন, জাদুকর মঞ্চে উঠেই সাবধান হয়ে যান দর্শক সারিতে এমন কেউ আছে কিনা, যিনি হাত সাফাই ধরতে পারেন। তখন কৌশল ও হিপনোটাইজের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। জাদুকর এ আই মিন্টু ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পাসের পর ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। জানালেন, জাদু প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্মরণশক্তি বৃদ্ধির জন্য মেডিটেশন প্রশিক্ষণ দেন।

এ পর্যন্ত তিনি প্রায় সাড়ে তিন শ’ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্মরণশক্তি বাড়াতে মেডিটেশনের কোর্স করিয়েছেন। তাঁর অভিমত, স্বাস্থ্য, স্মরণশক্তি সর্বোপরি নিজেকে সব সময় ফিট রাখার জন্য মেডিটেশন খুবই প্রয়োজন। প্রতিটি মানুষের দিনে অন্তত ১৫ মিনিট করে মেডিটেশন করা দরকার। তাঁর মতে, মেডিটেশনের মাধ্যমে অনেক কিছু আয়ত্তে আনা যায়। জাদু যে শুধুই বিনোদন তা নয়, জাদুর বিভিন্ন উপধারা মানবজীবনের সুন্দর থাকার সবচেয়ে বড় উপাদান।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: