আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অষ্টম শ্রেণী পাঠ চুকিয়ে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

রংপুরের পায়রাবন্দের বেগম রোকেয়া নন। তারই স্বপ্ন-আদর্শের পথ ধরে নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছেন নেত্রকোনার একজন, তার নামও বেগম রোকেয়া। ডাক নাম মস্তুরা। তিনি নেত্রকোনার বেগম রোকেয়া।

তাঁর জন্ম ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কাওরাট গ্রামে। বর্তমান নিবাস নেত্রকোনা শহরের নিখিলনাথ সড়কে। তখনকার সমাজ ব্যবস্থার কারণে ৮ম শ্রেণীর পাঠ চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁকে। শিশু বয়সেই মা হতে হয় দুই সন্তানের। কিন্তু নানা কারণে সংসার টেকেনি। বিয়ে বিচ্ছেদের পর দুই মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে। নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম করতে হয় তাঁকে। আবার শুরু করেন লেখাপড়া। অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এসএসসি, এইচএসসি, বিএ ও বিএড পাস করেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোনা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন শিক্ষকতার পেশায়। চাকরি আর সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি সারাক্ষণ তার চোখে ভাসত নির্যাতিত, বঞ্চিত ও পরিত্যক্ত নারীদের মুখ। ওদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি নিজের মধ্যে তৈরি করেন প্রতিবাদী, সংগ্রামী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ নারীর প্রতিচ্ছবি। পর্যায়ক্রমে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে।

আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এসসিআই, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমীসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে করতে এক সময় নিজেই একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় সমাজ সেবক অবনীমোহন সরকার, অধ্যাপিকা রওশন আখতার, কাজল চক্রবর্তী, আবদুল মান্নানসহ আরও কয়েকজন সমাজকর্মীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি’ নামে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন। সংগঠনের প্রাথমিক পুঁজি বলতেও ছিল বেগম রোকেয়ার শিক্ষকতার বেতনের সামান্য টাকা। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সমাজ সেবা অধিদফতরের নিবন্ধন প্রাপ্তির পর ওই দফতর থেকে সংগঠনটিকে দুটি সেলাই মেশিন দেয়া হয়। আর তা দিয়ে বেগম রোকেয়ার নিজ বাসার একটি কক্ষে শুরু করেন অসহায় নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ। এর পরের বছর নরওয়ের ক’জন দাতা আরও সাতটি সেলাই মেশিন দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ান। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে সুইডিশ সংগঠন ‘সিডা’ এককালীন অনুদান হিসেবে দেয় ৪৩ হাজার ৫শ’ টাকা। এভাবেই দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এবং বেগম রোকেয়ার দক্ষ নেতৃত্বের কারণে দিনে দিনে সংস্থাটির পরিধি বিস্তৃত হয়। কেনা হয় নিজস্ব সম্পত্তি। সংস্থার লক্ষ্য-আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে একের পর এক দেশী-বিদেশী দাতা সংগঠন। ১৯৯০ খ্রিস্টাবে স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধিত হয়।

বেগম রোকেয়ার ‘স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি’ এখন নেত্রকোনার সবচেয়ে বড় এবং প্রধান স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন। জেলা শহরের শিবগঞ্জ সড়কে তিনতলাবিশিষ্ট বিশাল ভবনে এর প্রধান কার্যালয়। রয়েছে নিজস্ব হাসপাতাল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বহুমুখী আদর্শ খামার, নির্যাতিত ও অসহায় নারীদের আশ্রয় কেন্দ্র, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ অনেক কিছু। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, সুনাম-গঞ্জ, জামালপুর, শেরপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলাতে ছড়িয়ে আছে স্বাবলম্বীর কার্যক্রম।

‘মানুষ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে’Ñ এ মহান ব্রতকে সামনে রেখে সংস্থাটি নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বঞ্চিত ও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় ও আইনী সহায়তা প্রদান, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন, নিরাপদ মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্যসেবা এবং খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি।

এসব কর্মসূচীর মূল উপকারভোগীদের মধ্যে রয়েছেন : শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী, প্রতিবন্ধী এবং মানবাধিকার লংঘনের শিকার সাধারণ মানুষ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বেগম রোকেয়া নিজেই স্বাবলম্বীর প্রধান তথা নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তার নেতৃত্বে সংস্থাটিতে কাজ করছে সহস্রাধিক উন্নয়ন কর্মী। দেশের মাটি ছাড়িয়ে বেগম রোকেয়ার নাম এখন বিদেশেও আলোচিত।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: