কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশও হবে একদিন

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫
  • ড. জীবেন রায়

২৮ মার্চের পত্রপত্রিকার কয়েকটি শিরোনাম এ রকম : ১. সরকারের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনা দায়ী : খালেদা জিয়া

২. লাঙ্গলবন্দে প্রচণ্ড ভিড়ে ৭ নারী ও ৩ পুরুষ পদদলিত ॥ ১০ পুণ্যার্থী নিহত...

৩. যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে, তাদের কেউ ভোট দিতে পারে না ॥ প্রধানমন্ত্রী

৪. বিচক্ষণতাপূর্ণ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে : বিসওয়াল...

৫. স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে?

৬. JMB targets cops, politicians

বিশ্বজুড়ে প্রতিটি দেশে প্রতিদিনের সংবাদপত্রে কত কত খবর থাকে, ভাবলে অবাক হতে হয়। বাংলাদেশেও একই চেহারা। তবে একটা বিরাট পার্থক্য আছে। বাংলাদেশের পত্রিকায় বেশিরভাগই নেতিবাচক খবর থাকে, পজেটিভ খবর একেবারেই কম। প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে কি বাংলাদেশে পজেটিভ খবর নেই? অবশ্যই আছে। তাই সংবাদপত্রগুলোকে আমার পরামর্শ থাকছে অন্তত আধপৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠা শুধু পজেটিভ খবর পরিবেশন করুন। আপনার কাটতি বাড়বে।

পাঠক, ওপরের শিরোনামগুলোতে একটা খবর আছে যাকে পজেটিভ বলা যায় (৪ নম্বর শিরোনামটি)। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মিস নিশা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন, শুধু তাই নয়, বর্তমান নেতৃত্বেরও। থাম্বস্ আপ, শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে আমি আর একটা থাম্বস্ আপ দেব খালেদা জিয়াকেও। অনেক কাল পরে জনগণের জন্য একটা পজেটিভ কথা বলেছেন। সরকারের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনা দায়ী সম্প্রতি লাঙ্গলবন্দের দুর্ঘটনাটি। অতীব সত্যি কথা। এর জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করব না। বাংলাদেশের সমস্যা অন্তহীন। একা প্রধানমন্ত্রী কত দিক সামলাবেন? তবে আমি খুশি হব, উনি এই লেখাটা যদি পড়েন।

বছরখানেক আগে জনকণ্ঠেই প্রকাশিত একটি লেখায় শেখ হাসিনাকে একসময়কার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। আবারও সেটা প্রমাণ করেছেন তিনি। বলেছেন, ৮১ দিনে কিছু করতে পারেনি, আর পারবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশে তুরাগ নদীর পাড়ে প্রতিবছর একটা নিদিষ্ট সময়ে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ লোকের সমাগম হয় উপাসনার জন্য এবং তা বেশ কয়েকদিন ধরে চলে। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এতবড় একটা জমায়েত মোটামুটি নির্বিঘেœই সম্পন্ন হয়। এতবড় একটা জমায়েতকে ভালভাবে ম্যানেজ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। লাঙ্গলবন্দে বছরে এক-দশমাংশ লোকের কথা চিন্তা করে এটাকে কি ম্যানেজ করা যায় না? সরকারের একটা সিস্টেম নিশ্চয়ই আছে নইলে জরুরী ভিত্তিতে দরকার, যে সিস্টেমের মাধ্যমে ৫৬ হাজার বর্গমাইল শাসিত হবে। থাকবে জবাবদিহিতা। প্রতিটা সরকারী কর্মচারী থেকে টপ বস পর্যন্ত। এমনকি মন্ত্রী পর্যন্ত জবাবদিহিতা থাকতে হবে। গাফিলতির শাস্তিও সিস্টেম অনুযায়ীই হবে। তবে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব অবশ্যই নয়। বঙ্গবন্ধু চোঙ্গা ফুঁকিয়ে ভাষণ দিত। আপনার তা করতে হয় না। বঙ্গবন্ধুর সময়ে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, জিপিএস, মোবাইল ফোন- এসব কিছুই ছিল না। তারপরও বঙ্গবন্ধু তুলনাহীন, অবিসংবাদিত নেতা। এই আধুনিক যুগে উনি থাকলে কী না করতে পারতেন? আপনার সময়ে এত সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও সবকিছুর জন্য জনগণ আপনার দিকে তাকিয়ে আশায় থাকবে কেন? একজনের বাড়িতে ডাকাতি হলো, অন্য একটা বাসায় এক দম্পতি খুন হলো, রাস্তায় দুর্ঘটনা হলো, অফিসে আগুন লাগল, লঞ্চডুবি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি অথবা টেন্ডারবাজি বা ঘুষ, ব্যাংক লোপাট আরও অজস্র কারণে সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে কেন? আপনার হস্তক্ষেপের আশায় থাকবে কেন? বাংলাদেশে কি তেমন কোন সিস্টেমই নেই যা যথাযথভাবে স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে? তাছাড়া সাধারণ জনগণের কথা ভেবে অথবা জনগণ যা নিয়ে সোচ্চার, যুক্তিসঙ্গত হলে আপনার সরকারের কর্মকর্তারা সেই সব নিয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবেÑ এটাই তো নীতি হওয়ার কথা, রাজনীতি নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনি যথার্থই বলেছেন, যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে, তাদের ভোট দেবে কেন? কিন্তু ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে, কোন কারচুপি নয়। একটা স্বচ্ছ নির্বাচন না দিতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে ইসির পদত্যাগ। সুতরাং সরকারকে বরং সহযোগিতা করতে হবে যাতে আইনশৃঙ্খলা ঠিকঠাক থাকে, জনগণ ইচ্ছে অনুযায়ী ভোট দিতে পারে। আপনার সরকারের এই সিটি নির্বাচন একটা এ্যাসিড-লিটমাস টেস্ট।

৫ নম্বরে যে শিরোনামটি তা কোন খবর নয়। একজন বিখ্যাত লেখক এবং এ্যাক্টিভিস্টের পর্যালোচনা। স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে? লেখক নিজের কথা লিখেছেন। কিন্তু আমার মতো অন্য আরও লাখ লাখ লোকের জন্যও হয়ত প্রযোজ্য। তবুও আমরা বাংলাদেশের সমষ্টিগত উন্নয়ন দেখতে চাই। বাংলাদেশের প্রতিটি লোকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ন্যূনতম ব্যবস্থা হলেই যথেষ্ট। কাউকে যাতে সিমেন্ট-টিউবে বাস করতে না হয়। তিন বেলা খেতে পায়, ভিক্ষা না করতে হয়। ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়ে যেন একটু স্বপ্ন দেখতে পারে। শুদ্ধতম শাসন ব্যবস্থা সেই জন্যই দরকার, শুধু ক্ষমতার জন্য নয়।

৬ নম্বরে যা আছে, তার প্রতিফলন এখন বিশ্বজুড়ে। সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোন প্রাপ্তিই নেই। একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী, কিসমত হাসেম ৬৫ বছরে মারা গেছে। সে ৮০ বছরও বাঁচতে পারত। তাছাড়া কানাডাতে থেকে মারা গেলেও নিশ্চয় তেমন সুখে থাকেনি। খুন করে পার পাওয়া যায় না। এই তো সেদিন যুক্তরাষ্ট্রে এক কোটিপতি ৩০ বছর আগে ৩টি খুনের জন্য ৭০ বছর বয়সে নতুন করে এ্যারেস্ট হয়েছে। মনে হয় এই কোটিপতির বাকি জীবনটা কারাগারেই কাটাতে হবে। সন্ত্রাস দমন সরকারের পক্ষে একা সম্ভব নয়। এর গোড়া থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু দমন-নিপীড়ন করে বন্ধ করাও সম্ভব নয়।

গত পঁচিশ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে থেকে অনেক ভাল দেখেছি। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে খারাপ যে নেই তা নয়। কিন্তু সেসব দেশে সুব্যবস্থা এত বেশি যে খারাপ কিছু মনেই আসে না। তবে এদেরও একসময় আমাদের বাংলাদেশের মতোই ব্যবস্থা ছিল। অনেক বছর লেগেছে আজকের অবস্থায় পৌঁছাতে। বাংলাদেশও হবে একদিন, আমরা হয়ত দেখব না। পাঠকরা যেমন ভাববেন, সরকারী কর্তাব্যক্তিগণও ভাবতে পারেনÑ এমন কিছু বিষয় শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য তুলে ধরছি :

১. মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উৎসাহিত করা

বাংলাদেশে কোথাও স্বেচ্ছাসেবার তেমন একটা নিদর্শন দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে এটাকে ভর্তি, চাকরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। আমার ছোট মেয়ে দশম গ্রেডে পড়ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে সে জড়িত। লিডারশিপ কাউন্সিলে যোগ দিয়েছে। এলিমেন্টারি স্কুল থেকেই এদের স্বেচ্ছাসেবা, ফান্ড রেইজ করা ইত্যাদি কাজে অভ্যস্থ করে তোলা হয়। এতে একে অন্যের প্রতি সহানুভূতি বাড়ে। ভবিষ্যতে লিডার হতে পারবে। ভাল কিছু করার জন্য উৎসাহিত হবে। আমার মনে আছে, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে একটা বাধ্যতামূলক নিয়ম হয়েছিল, পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ককে অক্ষরজ্ঞান শেখাতে হবে। বিষয়টা, খুবই ভাল বলতে হবে। সেই রকমই একটা সিস্টেমের মধ্যে ফেলতে হবে এই স্বেচ্ছাসেবাকে। সরকারী-বেসরকারী সব ছাত্রছাত্রীর জন্যই এটা প্রযোজ্য হবে। এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবক থাকলে, তাদের মাধ্যমে লাঙ্গলবন্দের উপচে পড়া ভিড়ের ঘটনা ম্যানেজ করা যেত।

২.শিক্ষক-স্টাফদের কমিউনিটি সেবায় উৎসাহিত করা

প্রতিবছর প্রতিবেদনে আমাদের উল্লেখ করতে হয় কত ঘণ্টা ব্যয় করেছি কমিউনিটি সেবায়। বাংলাদেশের শিক্ষকদের জন্য রাজনৈতিক কর্মকা-ে সময় ব্যয়ের প্রতিবেদন চাইলে সবাই এ প্লাস পাবে।

৩. বয়েস স্কাউট এবং গার্লস গাইডকে সম্প্রসারিত করা

শুধু স্কাউটিং কেন? খেলাধুলাসহ নানা রকম কাজকর্মের মধ্য দিয়ে এই প্রজন্মকে গড়ে তোলা যায়।

৪. প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষক, স্টাফদের পাঠদান, পা-িত্য (গবেষণা) ও সার্ভিস

এই তিন ক্যাটাগরিতে প্রতি বছর বাধ্যতামূলক বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। জবাবদিহিতা না থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিস্টেমের অপব্যবহার হয়।

৫. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আবশ্যিক বিষয় হিসেবে চালু করা দরকার।

লেখক : অধ্যাপক,

ডিপার্টমেন্ট অব সায়েন্সেস ও ম্যাথমেটিকস্

মিসিসিপি ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান

কলম্বাস, মিসিসিপি ৩৯৭০১

যুক্তরাষ্ট

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: