কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মধুপুর পাহাড়ে ব্যতিক্রমী হাসপাতাল, গরিবের চিকিৎসা

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫
মধুপুর পাহাড়ে ব্যতিক্রমী হাসপাতাল, গরিবের চিকিৎসা
  • বিদেশী বন্ধু ডাঃ এড্রিক বেকারের মানবসেবা

ইফতেখারুল অনুপম ॥ গাছের ফাঁক গলে সকালের রোদ যখন উঁকিঝুঁকি মারছে, মাটির ঘরগুলোতে তখন বেশ মানুষের উপস্থিতি। ঘরের বাইরে কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো বেশ কয়েকটা বেঞ্চ। তারই উপর বসা ব্যথায় কাতর দু’জন অসুস্থ মানুষ। সাতসকালেই কাঠের বেঞ্চগুলো দখল করে অপেক্ষা করছিলেন আরও অনেকে। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্যায় “ডাক্তার ভাইয়ের” হাসপাতালের প্রতিদিনের শুরুটা এমনই। এ হাসপাতালে টাকাওয়ালা বিত্তশালীদের চিকিৎসা দেয়া হয় না। এখানে দিনের শুরু হয় পাখির ডাকে। বনের মধ্যে চারপাশের অসংখ্য গাছগাছালি থেকে নাম না জানা পাখি ঘুম ভাঙায় রোগীদের। এড্রিক বেকার ‘ডাক্তার ভাই’ নামে পরিচিত একজন ভিনদেশী শুভ্রকেশ চিকিৎসক, যার মনটাও একই রকম সফেদ। আর কিছু মানুষ যাদের মন তাদের ঘরগুলোর মতোই মাটিতে গড়া। এরা সবাই মিলে পরিচালনা করছেন ব্যতিক্রমী এই হাসপাতাল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানীদের হত্যা, বর্বরতা, ভারতগামী স্মরণার্থীদের ছবি নিয়মিত ছাপা হতো। এই দেখে নিউজিল্যান্ডের তরুণ চিকিৎসক এড্রিক বেকারের বাংলাদেশী মানুষের জন্য মন কাঁদতো। এড্রিক বেকার মনে মনে সঙ্কল্প করেন এদেশে আসবেন। ’৭১ সালে কাজ করছিলেন ভিয়েতনামের একটি মেডিক্যাল টিমে। ডিসেম্বরে বিজয়ের খবর শুনে খুবই উল্লসিত হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এরপর ৩৬ বছর ধরে মধুপুর গড় এলাকায় অবস্থান করে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিন্টনে এড্রিক বেকারের জন্ম। তার বাবা ছিলেন পরিসংখ্যানবিদ। মা বেট্রি বেকার শিক্ষক। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এড্রিক ডুনিডেন শহরের ওটাগো মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন। পরে ওয়েলিন্টনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের সার্জিক্যাল টিমে যোগ দিয়ে চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে কাজ করেন ’৭৫ সাল পর্যন্ত। মাঝে অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন কোর্স করেন ট্রপিক্যাল মেডিসিন, গাইনী, শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে। ’৭৬ সালে পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। কিন্তু কোথাও মন টেকেনি। এরই মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। এক বছর পর সুস্থ হয়ে ’৭৯ সালে চলে আসেন বাংলাদেশে। এদেশে এসে এড্রিক বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দু’বছর ও পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ৮ মাস কাজ করেন। বেকারের বড় কোন হাসপাতালে কাজ করার ইচ্ছে কখনও ছিল না। ইচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার। অন্যরকম কিছু করার। সে চিন্তা থেকেই চলে আসেন টাঙ্গাইলের মধুপুর পাহাড়ী গড় এলাকায়। তখন সাধারণ মানুষের মাঝে কাজ করতে গিয়ে বুঝে ভাষা শিক্ষা নেয়া দরকার। তাই মধুপুরের জলছত্র খ্রীস্টান মিশনে এক বছর থেকে বাংলা ভাষা শিখেছেন।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকায় কাইলাকুড়ি গ্রামের অবস্থান। এলাকার আদিবাসী-বাঙালী প্রায় সবাই দরিদ্র। এ রকম একটি প্রত্যন্ত এলাকায় চার একর জায়গার উপর ডা. এড্রিক বেকারের স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ছোট ছোট মাটির ২৩টি ঘরে হাসপাতালের ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষ্মা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগ, ডায়রিয়া বিভাগসহ আলাদা আলাদা বিভিন্ন বিভাগে ৪০ রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে আগত রোগীদের সবাই দরিদ্র। তবে এখানে টাকা উৎপার্জনকারী স্বচ্ছল ও বড়লোক রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয় না। এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় একশ’ জন রোগী দেখা হয়। এছাড়া হাসপাতালে নিচের পক্ষে ৪৫ জন রোগী সবসময় ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগে নতুন রোগী এলে টিকেট কাটতে হয়। নতুন রোগীর জন্য টিকেটের মূল্য ২০ টাকা এবং পরবর্তীতে ১০ টাকা। তবে রোগী যদি গ্রাম কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হন, সে ক্ষেত্রে টিকেটের মূল্য ৫ থেকে ১০ টাকা। কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীকে পাঠানো হয় নির্দিষ্ট প্যারামেডিকের কাছে। ছোটখাটো অসুখের ক্ষেত্রে প্যারামেডিকেরাই বলে দেন রোগ নিরাময়ের উপায়। জটিল কোন রোগের ক্ষেত্রে আছেন এমবিবিএস ডাক্তার। রোগ নির্ণয় শেষে নামমাত্র মূল্যে মিলবে ওষুধ। গুরুতর অসুখ হলে প্রয়োজনে রোগীকে ভর্তি করে নেয়া হয় হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে। আছে জরুরী বিভাগও। সবসময় ডাক্তারা রোগীর খোঁজখবর নেন। হাসপাতাল শব্দটি শুনলেই সচরাচর যে দৃশ্যগুলো চোখে ভাসে, তার সঙ্গে মিলবে না একদমই। প্রকৃতি, আধুনিকতা আর সেবার ব্রত মিলেমিশে একাকার এখানে। সত্যিকারের সেবার ব্রত আছে বলেই হাসপাতালের রোগীরা আনন্দিত। সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে ডাঃ এড্রিক বেকার রোগী দেখছেন। আগত রোগীদের সবাই দরিদ্র। জামালপুর জেলার শৈলেরকান্দা গ্রাম থেকে এসেছেন দিনমজুর জুলহাস। তার ৮ বছরের ছেলে মালেকের ডায়রিয়া হয়েছে। তিনি জানান, পয়সার অভাবে তিনি ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। পরে এক আত্মীয়ের কাছে ডাঃ বেকারের এই হাসপাতালের খবর পেয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে আসেন। এখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা চলছে মালেকের। পাহাড়ী গড় এলাকার কামারতাফাল গ্রাম থেকে বৃদ্ধা জরিনা বেগম এসেছেন তার ৭ বছরের নাতি মামুন মিয়াকে নিয়ে। মামুন মিয়ার হাত ভেঙে গেছে। তাই ভর্তি করে রেখে এখানে চিকিৎসা চলছে। ভর্তি বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত বিজয় বর্মণ জানান, এখানে রোগী ভর্তির সময় রোগীর জন্য দুইশ’ টাকা এবং রোগীর সঙ্গের লোকের জন্য একশ’ টাকা নেয়া হয়। এর মধ্যেই রোগীর থাকা খাওয়াসহ যতদিন সময় লাগে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালের কর্মী রতন মিয়া জানান, এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় একশ’ জন রোগী দেখা হয়। নিচের পক্ষে ৩০ জন রোগী সবসময় ভর্তি থাকে।

প্রত্যন্ত এই পাহাড়ী দরিদ্র এলাকার আদিবাসী গারো, বাঙালী মানুষেরা ডাঃ বেকারকে কেউ ডাকেন ‘ডাক্তার ভাই’, আবার কেউ ডাকেন ‘বেকার ভাই’ বলে। কাইলাকুড়ি গ্রামের প্রবীণ আদিবাসী নীরেন্দ্র দফো বলেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে ভালবাসে ও শ্রদ্ধা করে। প্রত্যন্ত এই এলাকায় রাস্তাঘাট ছিল না। রোগ বালাই হলে গ্রাম্য কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো হতো। অনেকের কপালে তাও জুটতো না। ডাঃ বেকার আসার পর এখন পাহাড়ী এ এলাকার কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যান না। কারও অসুখ হলে ছুটে আসেন এই হাসপাতালে এবং বিনা পয়সায় ডাঃ বেকারের সেবা পান। ডাঃ বেকারের মধ্যে কোন চাওয়া পাওয়া নেই। তিনি ছোট একটি মাটির ঘরে থাকেন। মেঝেতে ঘুমান। খাবার-দাবার অতি সাধারণ বাঙালীদের মতোই। নিঃস্বার্থভাবে তিনি দরিদ্র মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। ডা. এড্রিক বেকার বলেন, হাসপাতালটা তো আমার না। এই হাসপাতালের পরিচালক হলো গরিব সমাজকর্মী ও সমর্থকরা। তবে হ্যা, এদের দলনেতা আমি। এদেশের মানুষ খুব ভাল। দরিদ্র মানুষেরা অধিকাংশই চিকিৎসা সেবা পায় না। এইসব মানুষের সেবা করার জন্যই আমি এদেশে থেকে যাই। দেশে আমার চার ভাই, দুই বোন ও বৃদ্ধা মা রয়েছে। বাবা ২০০৯ সালে মারা গেছেন। তারা সবাই আমার এই কাজকে মেনে নিয়েছেন। দেশে গেলে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কবে আবার তোমার দেশে ফিরে যাচ্ছো? আমি দেশে গেলে বন্ধু-বান্ধব এবং বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের কাছে হাসপাতালের কথা তুলে ধরি। তাদের আর্থিক সাহায্যেই চলে এই হাসপাতাল। বেকার বলেন, প্রতিবছর কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছে। আমি প্রতীক্ষায় আছি এদের মধ্যে অন্তত একজন, একদিন চলে আসবেন আমাদের হাসপাতালে। নিজেকে নিয়োজিত করবেন গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সেবায়।

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: