কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তিন সিটি নির্বাচন ॥ বেকায়দায় থাকলেও বিএনপির ভেতরে ভেতরে জোর প্রস্তুতি

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫
  • প্রার্থী সমর্থকদের মাঠে নামার নির্দেশ

শরীফুল ইসলাম ॥ বাহ্যিক দৃষ্টিতে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বেকায়দায় থাকলেও দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি জোরদার করছে। এদিকে দলীয় হাইকমান্ড থেকে প্রার্থী ও সমর্থকদের পুলিশের হাতে গ্রেফতারের ভয় উপেক্ষা করে নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নামতে বলা হয়েছে। যারা এ নির্দেশ মানবে না তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

সূত্র মতে, ৩ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র ও কমিশনার প্রার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন মামলার আসামি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কারাগারে আছেন আর অন্যদের মধ্যে অধিকাংশই এখনও আত্মগোপনে। এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও এখনও সারাদেশে অবরোধ এবং ৩ সিটি কর্পোরেশন এলাকা ছাড়া হরতাল কর্মসূচী অব্যাহত রাখায় জনমনে নানামুখী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে দলীয় প্রার্থীদের। আর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে পূর্বনির্ধারিত বিএনপি দলীয় প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এসব কিছু মিলিয়ে বিএনপি এখনও চরম বেকায়দায়।

জানা যায়, সরকারকে চাপে রাখতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বিভিন্ন দাবিদাওয়া মেনে নেয়ার কথা বললেও বিএনপি হাইকমান্ড ধরে নিয়েছেন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার খুব একটা ছাড় দেবে না। তাই দলীয় মেয়র ও কমিশনার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ভেতরে ভেতরে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্র্মী, সমর্থক ও প্রার্থীদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা অনুসারে নিজ নিজ এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী ও সমর্থকরা কৌশলে প্রচার জোরদার করছেন। যেসব প্রার্থী-সমর্থকরা এখনও কারাগারে আছেন তারা আত্মীয়-স্বজন ও মহল্লাবাসীর সহযোগিতা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত এমন এক সূত্র জানায়, ৩ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা চলছে। এর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আত্মগোপনে থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ঢাকা উত্তরে আত্মগোপনে থাকা দলের যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমির খসরুকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তাদের এ কাজে সহযোগিতা করছেন আরও কয়েক বিএনপি নেতা। আর কেন্দ্রীয়ভাবে ৩সিটি কর্পোরেশনে একক প্রার্থী করার বিষয়টি তদারকি করছেন বর্তমানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করা স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি সময় সময় খালেদা জিয়ার পরামর্শ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ কাজের সমন্বয় করেন। আর যারা ৩ সিটিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তাদের একটি তালিকা নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে সবখানে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা করছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন ৯ এপ্রিলের মধ্যেই মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী ঠিক করা হবে বলে জানা গেছে। তবে দলীয় হাইকমান্ডের এ সিদ্ধান্ত যিনি মানবেন না তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, প্রকাশ্যে হাঁকডাক দিয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাতে না পারলেও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা গোপনে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করছেন। বিশেষ করে স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এবং পারিবারিক গ-িতে ঘরোয়া বৈঠকের মধ্য দিয়ে কোন্ পদে দলীয় প্রার্থী কে এবং কোন্ পদে কাকে ভোট দিতে হবে সে ব্যাপারে জোরালো প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারী দলের প্রার্থীদের পক্ষে এখনও এ ধরœর প্রচারণা শুরু না হওয়ায় এলাকাভিত্তিক প্রচারণায় বিএনপি-জামায়াত এ কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে।

৩ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে বিএনপির ৭ এবং কাউন্সিলর পদে ২ শতাধিক নেতাকর্মী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই দলের একক প্রার্থী করা হয় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুকে। তার বিরুদ্ধে আদালতে বেশ ক’টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় বিএনপি এখন চরম বেকায়দায় পড়েছে। যদিও আবদুল আউয়াল মিন্টু তার মনোনয়নপত্র বৈধ করতে আপীল করেছেন এবং আজ আপীলের শুনানি হবে। কিন্তু যে ভুলের কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তা সংশোধনের সুযোগ কম। কারণ তার মনোনয়নপত্রে সমর্থক হিসেবে দেখানো হয়েছে আবদুর রাজ্জাক নামক এক ব্যক্তিকে যিনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভোটারই নন। তবে মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন পেতে বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছেন। মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালও বিএনপির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি হাইকমান্ডও আজ মিন্টুর মনোনয়নপত্র টিকে কিনা তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান। তবে মাহী বি চৌধুরীকে ইতোমধ্যেই বিএনপির পক্ষ থেকে গ্রীন সিগন্যাল দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই সিটিতে ৩৬টি ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন মামলার আসামি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। তার পরও তাকে ওভারটেক করে দলীয় সমর্থন পেতে বিএনপির অন্য ৪ নেতা যথাক্রমে অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল বাশার এবং কারাবন্দী সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাসিরউদ্দিন পিন্টু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অবশ্য পিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও তার পক্ষে আপীল করা আইনজীবীরা জানিয়েছেন আজ তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সিটি কর্পোরেশনের ৫৭ টি ওয়ার্ডে বিএনপি দলীয় যেসব কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন মামলার আসামি।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আগেই একক প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে মঞ্জুর আলমের নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। তিনি জোরেশোরে প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এবার চট্টগ্রামের সর্বস্তরের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ায় এবার মঞ্জুর আলম এখন পর্যন্ত কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন। এই সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে যারা বিএনপির সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তাদের মধ্যে বেশ ক’জন বিভিন্ন মামলার আসামি। তারপরও কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ৩ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা চলছে। দলের কিছু নেতা এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। চট্টগ্রামে মেয়র পদে আগেই একক প্রার্থী দেয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তরেও আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দেয়া হয়। তবে আজ যদি তার আপীলের বিষয়ে নেতিবাচক রায় আসে তাহলে পরে বিকল্প প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেয়া হবে। ঢাকা দক্ষিণেও মেয়র প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত । তবে এখানে অন্য যারা আছেন তারা সময়মতো প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। আর ৩ সিটিতে কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী দেয়ার কাজ এগিয়ে চলছে। আর সব সিটিতেই দলীয় মেয়র ও কাউন্সিল প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ কৌশলে কাজ করতে বলা হয়েছে।

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: