কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিদায় টমাস ট্রান্সট্রুমার

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • নাজিব ওয়াদুদ

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (২০১১) সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রুমার গত ২৬ মার্চ ইহজগত ত্যাগ করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবত (১৯৯০ সাল থেকে) স্ট্রোকজনিত কারণে প্রায়-পঙ্গু অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন। জীবনের শেষ দিকে, প্রায় একটি দশক, লেখালেখি করতে পারেননি তেমন একটা।

একজন বড় কবি হিসেবে নোবেল বিজয়ের অনেক আগে থেকেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন ট্রান্সট্রুমার। প্রকৃত অর্থে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর-পরই স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলসহ গোটা ইউরোপে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ৬০টি ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। তার কবিতায় স্বদেশের ঋতুপরিক্রমা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত হয়েছে। আঙ্গিক হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন মর্ডানিজম, এক্সপ্রেশনিজম ও সুররিয়ালিজমকে। নোবেল কমিটি তাকে পুরস্কার দেয়ার যুক্তি দেখাতে গিয়ে বলেছে, তাকে এই পুরস্কার দেয়া হলো ‘তার সংবদ্ধ, স্বচ্ছ প্রতীকের জন্যে, তিনি আমাদের বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশের নতুন অধিকার দান করেন। ...তার রচনার পরিমাণ বাস্তবিকই যথেষ্ট কম। কিন্তু তিনি বড় বড় প্রশ্ন নিয়ে লিখছেন। তিনি লিখছেন মৃত্যু সম্পর্কে, ইতিহাস এবং স্মৃতি নিয়ে, আর প্রকৃতি সম্বন্ধে।’

ট্রান্সট্রুমারের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৫ এপ্রিল, সুইডেনের রাজধানী শহর স্টকহোমে। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে মনোবিজ্ঞানে গ্রাজুয়েশন লাভ করেন। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করেন পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর চাকরি।

১৯৫৪ সালে, ২৩ বছর বয়সে, তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ সতরোটি কবিতা (১৭ ফরশঃবৎ) প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে এ পর্যন্ত তার পনরোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ উইন্ডোজ অ্যান্ড স্টোন্স (১৯৭২), পাথ্স (১৯৭৩), বাল্টিক্স (১৯৭৪), ফর দ্য লিভিং অ্যান্ড দ্য ডেড (১৯৯৫), নিউ কালেক্টেড পোয়েমস (১৯৯৭), দ্য হাফ-ফিনিশ্ড হেভেন (২০০১), দ্য গ্রেট এনিগ্মা : নিউ কালেক্টেড পোয়েমস (২০০৩) ও দ্য সরো গন্ডোলা (২০১০)। তার ছোট্ট আত্মজীবনী মেমোরিজ লুক অ্যাট মি প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ট্রান্সট্রুমার ও রবার্ট ব্লাই-এর চিঠি-পত্রের সংকলন এয়ার মেইল প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে।

সুইডেনের কবিতাপ্রেমীদের কছে তিনি পরিচিত ‘শিকারি কবি’ হিসেবে। তাকে এ নামে ডাকার কারণ তিনি প্রাত্যহিক জগতের ওপর দিয়ে ওড়েন এবং ভূ-প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন কিন্তু মমতাময় দৃশ্যাবলী পর্যবেক্ষণ করেন শিকারি পাখির মতো তীক্ষè দৃষ্টিতে। তার কবিতা শাগালের পেইন্টিং-এর মতো বিস্তৃত দৃশ্যাবলীর প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করে। তাকে রিলকে এবং শেলির সমগোত্রীয় মনে করা হয়, যারা ‘ফেরেস্তা ও স্বর্গারোহণের কবি’ হিসেবে পরিচিত। ট্রান্সট্রুমারের কবিতায় উড্ডয়নের (এবং অবিরাম পতনেরও) স্বপ্নাতুর অভিজ্ঞতার কথা বারবার ফিরে ফিরে আসে। তার শুরুর দিককার একটি কবিতা ‘প্রিলিউড’ আরম্ভ হয়েছে এ রকম একটি চরণ দিয়েÑ ‘ঘুম থেকে জাগা মানে স্বপ্ন থেকে প্যারাসুট-লাফ দেয়া’। প্রত্যেকদিন ভোরে যেন বা কোন গ্রহ থেকে পৃথিবীতে পতনের এই বোধ তার সমস্ত রচনাতেই পাওয়া যায। শেলির অ্যাডোনেইস-এর মতো, ট্রান্সট্রুমারের চরিত্ররাও প্রায়শঃই অনুভব করে যে তারা জীবন-স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে; এবং স্বপ্ন ও বাস্তবতা, রাত ও দিন, সমান্তরাল ও উল্লম্ব জগতের এই বিপরীতধাবিতা এই গভীর মনোযোগী ও প্রশান্ত কবির সব সময়কার থিম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার অনেক কবিতায় আলোকচিত্রসুলভ কল্পনার মুখোমুখি হতে হয়, এর মধ্যে আলো এবং অন্ধকার বারবার স্থান বদল করে; উদাহরণ হিসেবে ‘দ্য কাপল’ কবিতার প্রথম তিনটি চরণ উদ্ধৃত করা যায়Ñ

‘ওরা আলো নিভিয়ে দেয় এবং তার শাদা ছায়া

মিলিয়ে যাওয়ার আগে মুহূর্তখানেক অস্পষ্ট জ্বলে

অন্ধকারের গ্লাসে একটা চাকতির মতো। তারপর ওঠে।’

গতি ও পরিবর্তমানতা ট্রান্সট্রুমারের কবি-প্রবণতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, ‘আধ্যাত্মিক শান্তি’ ভাবনা তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

তিনি এমন সব উপমা-প্রতীক সৃষ্টি করেন যাকে আপাতঃদৃষ্টিতে শিল্পহীন সরলতা বলে মনে হয়, কিন্তু সেগুলি শক্তিশালী এবং মানবীয় বিমূঢ়তা ও বিস্ময়কে সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে ভূমিকা রাখে। তার দৃষ্টিতে জীবন একই সঙ্গে সুন্দর এবং রহস্যময়ও বটে। তার জীবন ও অভিজ্ঞতা সঙ্গীত ও কবিতার অলৌকিকতায় এমনভাবে ম-িত যে, তার বস্তুগত অস্তিত্ব গুরুত্বহীন, বরং তা সূক্ষ্ম ও স্বর্গীয়। এবং বিপরীতক্রমে, এর রয়েছে অসাধারণ শক্তি যা মানবীয় ও বস্তুগত জগতকে বিস্ময়কর উপায়ে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা রাখে। তার লেখায় নতুন, কিন্তু ঐতিহ্যহীন নয় এমন একটি আধ্যাত্মিক জগত ও ভূ-প্রকৃতি মূর্ত হয়ে ওঠে।

তিনি নিজে একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন, তার কবিতাতেও সঙ্গীতের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের সতরোটি কবিতার মধ্যে চারটারই শিরোনাম সঙ্গীতবিষয়ক। এছাড়া কবিতার মধ্যে সঙ্গীত ও সঙ্গীতকাররা তো রয়েছেনই। তার এমনকিছু কবিতা আছে যেগুলোকে সঙ্গীত কম্পোজিশনের টার্ম দিয়ে বর্ণনা করা যাবে। এ ব্যাপারে তার নিজের বক্তব্য হলোÑ ‘কবিতা ও সঙ্গীত খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটা বর্ণনা করা কঠিন, কিন্তু আমার মধ্যে সেটা আছে, কারণ আমি সঙ্গীত নিয়ে কাজ করি, সঙ্গীত শুনি, বাজাই, সঙ্গীতের বোধ তৈরি করি এবং সেটাকে কবিতায় ব্যবহার করি। এটা ফর্ম, কম্পোজিশন বা ধ্বনির চেয়েও বেশি কিছু।’

তার কবিতা নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্কে আমেরিকান কবি-অনুবাদক রবার্ট ব্লাই বলেছেন, বারবার পড়ার পরেও ট্রান্সট্রুমারের কবিতার রহস্য ও বিস্ময় শেষ হয় না।

ষাট-এর দশকে, যখন সুইডেনে রাজনীতির প্রতি প্রবল ঝোঁক দেখা দিয়েছিল, তখন কিছু সমালোচক তার নিন্দাবাদ করত এই বলে যে, তার কবিতা বড্ড রাজনীতিবিমুখ, সামাজিক অঙ্গীকার নেই তার লেখায়। এ ব্যাপারে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘কবিতা যদি খুব দূরস্থিত এবং অঙ্গীকারহীন কিছু নিয়ে লেখা হয় তাহলে নিশ্চয়ই সেটা একটা বাজে ব্যাপার। তবে কবিত্ব দেখাতে চাওয়া কোন ভুল নয়। প্রকৃতপক্ষে, আমি কবিতা ও বাস্তবতাকে পরস্পরবিরোধী বলে মনে করি না। আমি কবিতা ও বাস্তবতাকে পৃথক করতে চাই না, তারা অবশ্যই হাত ধরাধরি করে চলবে।’ তার রাজনীতি আদর্শিকতার চেয়ে মানবিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতির প্রতি আমার খুব আগ্রহ, কিন্তু আমি সেটাকে দেখি যতটা না আদর্শগতভাবে ততটাই বেশি মানবিক দৃষ্টিতে।’

ট্রান্সট্রুমার তার জীবনকে ‘অসঙ্গতির খাতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তার কবিতায় আপাতঃবিরোধিতা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু প্রায়শই অসঙ্গতিকে প্রকৃত অর্থেই অসঙ্গতি হতে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, তার একটি গদ্যকবিতা ‘ফুনচাল’-এর কথা বলা যায়। কবিতাটি শেষ হয়েছে এরকম আপাতঃবিরোধ নিয়েÑ

‘শূন্য পানপাত্রে বুদ্বুদ উঠছে। একজন বক্তা নৈঃশব্দ্য উদগীরণ করছে। একটা পথ প্রত্যেক ধাপের পেছনে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একাকী একটা বইকে রাতে পাঠ করা যায়।’

তার মতে, ‘এটা শেষ পর্যন্ত একটা ধর্মীয় কবিতা। এটা সেই খ্রিস্টীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত যা একগুচ্ছ আপাতঃবিরোধী সত্য দ্বারা উপস্থাপিত হয়। ...কিন্তু বিরোধিতা মানে বিরোধিতাই। বিরোধিতা ছাড়া আপাতঃবিরোধী সত্যের উত্থান ঘটে না,... এ-ও বাস্তবতার একটা ফর্ম। কবিতা বাস্তবিকই যতটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আমি তাকে তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর করে তুলতে চাই না। বরং পাঠককেই সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া উচিত কিভাবে সে পাঠ করতে চায়। কবিতায় এটা জরুরী যে, আপনি এমনকিছু শুরু করবেন যা চলমান, যা চলতেই থাকবে, পাঠক যেন সেটার ওপর কাজ করতে পারে। প্রতিবেদন হচ্ছে এক অর্থে ভেতরের ভ্রমণ, লিখতে লিখতে আমি সেটা আবিষ্কার করি। কিন্তু কবিতার কাজ ব্যাখ্যা দেয়া নয়, ব্যাখ্যা ভ্রমণেরও বাড়া।’

ট্রান্সট্রুমারের রচনায় এ-রকম স্তবক বারবার এসেছে যেখানে দেখানো হয়েছে যে, ব্যক্তিত্ব ব্যাপ্তিপ্রবণ ধারণা কিংবা অস্পষ্ট, হর্ষোৎফুল্ল আত্মসমর্পণের অনুপস্থিতি নয়। ‘ক্যারিলন’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘যে মহান অজ্ঞাতস্থানে আমার শেকড় প্রোথিত নিশ্চয়ই সেটা আমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’ ইস্টার্ন সিজ-এ তার ইতিহাসবোধ আরো শক্তিশালী ও ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু সেটা হয়েছে ইতিহাসের দিকে তাকানোর একটা পৃথক পদ্ধতিরূপে। প্রচল পথে নয়, বরং একটা নতুন ধারায়। এই কাব্যগ্রন্থে তার প্রথম কাব্যের ভূপ্রকৃতির প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, যদিও ভিন্ন আলোকে। সেভেনটিন পোয়েম্স-এ প্রকৃতি ছিল অস্পর্শণীয়। তিনি সেখানে প্রকৃতিকে মিথে পরিণত করেছেনÑ সেখানে কোনো দূষণ বা রাজনীতির চিহ্নমাত্রও নেই। সেটা বিশুদ্ধ, এক ধরনের আর্কেডিয়া, যদিও সেটা অনেক বেশি রুক্ষ, যেখানে বৃষ্টি দরকার। তবে এটা মানব-সৃষ্ট ক্ষতি নয়। ইস্টার্ন সিজ এক অর্থে সেভেনটিন পোয়েম্স-এর বিপরীত। এতে তিনি বাল্টিক সাগরকে হারিয়ে যাওয়া আর্কেডিয়া হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। এটা বিশ্বরাজনীতির উত্তেজনায় উদ্বেলিত একটা জায়গা। এই স্থানটা দুর্ভোগ, দূষণ এবং মানবীয় দুষ্কর্মের প্রতীক। আবার, একই সঙ্গে, সুন্দরও বটে। প্রকৃতি এখানে হুমকির সম্মুখীন, কিন্তু লুপ্ত হয়ে যায়নি। সেখান থেকেই ঘটছে কবির উত্থান। তিনি এখানে যতটা সম্ভব সূক্ষ্মদর্শী হতে চেষ্টা করেছেন।

তার প্রথম দিককার কাজগুলো ছিল ঐতিহ্যের অনুসারী, তারপর এসেছে উচ্চাকাক্সক্ষী ধরনের রচনা। কিন্তু যৌবন পেরিয়ে তিনি ক্রমেই গভীর, ব্যক্তিগত অনুভব ও বোধের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং আঙ্গিকের দিক থেকে মুক্তছন্দ বেছে নেন। তার সৃষ্টিনিচয় ভরে তুলতে চায় শূন্যতাকে, আর অজানাকে বোঝা ও আঁকড়ে ধরা এবং অতীন্দ্রিয়তার সন্ধান করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। ‘দ্য আউটপোস্ট’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেন-

‘আমি সেই আধার

যেখানে সৃজনপ্রক্রিয়া সক্রিয় নিজের সৃজনকর্মে।’

এই কবিতা সম্পর্কে তার নিজের ব্যাখ্যা হচ্ছেÑ ‘এই ধরনের ধর্মীয় মনোভাব আমার পরবর্তী কালের কবিতায় এখানে-সেখানে পুনরাবৃত্ত হয়েছে; আমি দেখি যে, এত্থেকে বর্তমানে অস্তিত্ববান থাকা, বাস্তবতাকে ব্যবহার করা, তার অভিজ্ঞতা লাভ করা, তার থেকে কিছু একটা সৃষ্টি করার এক ধরনের মানে খুঁজে পাওয়া যায়।’ এভাবে ট্রান্সট্রুমার তার কবিতায় প্রকৃতি, বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতাকে একটা যোগসূত্রে সম্পর্কিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: