কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মাটির ঘ্রাণ

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • মহি মুহাম্মদ

ঐ যে আসছে খোঁড়া মুক্তিযোদ্ধা। তরপ আলি। হালকা-পাতলা দেহ। ছোট ছোট কদমছাঁট চুল। সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে।

সম্মুখ যুদ্ধে কাঁধে গুলি লেগেছিল। এক খাবলা মাংস চলে গেছে কাঁধের। পায়েও গুলি লেগেছে। হাড় ফুটো হয়ে গেছে। গুলি বেরিয়ে গেছে। বাঁচার আশা ছিল না। তারপরেও কোনো রকমে বেঁচে আছে। পা কেটে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু কাটেনি। তবে পাটা শুকিয়ে গেছে। তেমন ভর দেয়া যায় না। তবে ডান পাটা চিরতরে খোঁড়া হয়ে গেছে। সবাই ওকে খোঁড়া মুক্তিযোদ্ধা বলে।

রতনপুর চা বাগানের ফ্যাক্টরিতে ও ফিটারের কাজ করত। ভালই কাটছিল জীবন। কিন্তু ম্যানেজার চাকরিটা নট করে দিল। ইঞ্জিনিয়ারের দোষটা তার মাথায় এসে চাপল। তারপর ম্যানেজারের পায়ে পড়ে চৌকিদারি যা একটা পেল, তাও ভাগ্যটাতে সইল না। বড় বাংলোয় বিদ্যুতের তার চুরি হলো। দোষী তরপ আলি। দে ওকে চাকরি থেকে তাড়িয়ে। তারপরেই তরপ আলির কপাল পুড়ল। করার কিছুই নেই।

কিছু করে না বললে ভুল হবে। সে এখন গরু, ছাগল চড়ায়। বউ, ছেলে-মেয়েরা চা বাগানে কাজ করে। আর নিজে খোঁড়া পা নিয়ে খুব বেশি ভারি কাজ করতে পারে না। তাই গরু, ছাগল চড়িয়ে বেড়ায়। তাদের সঙ্গে অনেক সহযোদ্ধারা এখন সরকারি ভাতা পায়। কেবল তরপ আলিই কোন ভাতা পেল না। কত চেষ্টা তদবির করল। কতজনকে ধরল। ভেবেছিল পেয়ে যাবে। কিন্তু হলো না। তারা অনেকেই রামগড় হয়ে শাবরুম বর্ডার ক্রস করেছিল। তারপর ইন্ডিয়ার হরিণায় ট্রেনিং নিয়ে এক নম্বর পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধ করেছে। ট্রেনিংয়ের সময় পঁচাত্তর টাকা যে সম্মানী পেয়েছিল তাই প্রথম তাই শেষ। ইন্ডিয়ায় যখন যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিল তখন মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা সেখানে নামও উঠেছিল এইটুকুই। এরপর বাংলাদেশ হওয়ার পর কত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি হলো কিন্তু তার কোন গতি হলো না।

ওর মতো আরও দু’জন কপাল পোড়া মুক্তিযোদ্ধা হলো খুরশিদ ও মহরম আলি। ওরা একসঙ্গেই যুদ্ধ করেছিল। মহরম আলি এখন আর বেঁচে নেই। খুব কষ্ট পেয়েছে। দরিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মারা গেছে। খুরশিদ পঙ্গু। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরায়। কোনদিন হয়ত ফট করে মরে যাবে। যাক, মরে গেলেই ভাল। অন্তত না খাওয়ার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাবে।

তরপ আলি স্থানীয় কমান্ডারকে ধরেছিল কিন্তু সেও ধানাই-পানাই করে কাজটি করেনি। কতজনের কাছে যে ধরনা দিল সে, তবুও একটা সার্টিফিকেট যোগাড় করতে পারল না। পাইন্দংয়ের আবুল মিঞা তো তার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা খসিয়ে নিল। ভেবেছিল হয়ে যাবে কাজটা কিন্তু আবুলের আর খবর নেই। টাকা চাইলেও এখন ঘ্যাটঘেডানি মারে। কিন্তু তার বিনিময়েও সার্টিফিকেট তার পাওয়া হলো না। খুরশিদ যখন বিছানায় খাবার-দাবারে কষ্ট পাচ্ছে তখন তরপ আলি দেখতে গিয়েছিল।

খুরশিদ কোনো রকমে মাথা তুলে বলল, তরপ ভাই আইছনি? ভাইরে খিদার জ্বালায় বাঁচি না। একটু থেমে বলল, ভাইরে কিছু খাইতে দে।

ক্যানরে খাছ নাই কিছু!

না ভাই, খালি খিদা। কে খাইতে দিব?

তরপ আলি তাড়াতাড়ি লাইনের দোকান থেকে কলা আর মুড়ি কিনে এনে দিল। বুভুক্ষু খুরশিদ হাপুস হুপুস করে রাক্ষসের মতো নিমিষেই খেয়ে ফেলল। তারপর আধাজগ পানি খেয়ে বলল, তরপ ভাই দোয়া করিচ তাড়াতাড়ি য্যান মইরা যাই।

তরপ আলি কী বলবে, ভেবে পায় না। চুপ মেরে থাকে। আর খুরশিদ ময়লা ঘিঞ্জি ঘরটার স্যাঁতসেঁতে বালিশে মুখ বুজে শামুকের মতো পড়ে থাকে। তরপ আলি কিছুক্ষণ মাটিলেপা ঘরের ওপর টিকটিকির ছোটাছুটি দেখল। বাইরের রোদ দেখল। খুরশিদের পায়ে পচন ধরেছে। ভয়ঙ্কর গন্ধ। মানুষের মাংস পচা গন্ধ এত বিটকেলে যে বমি উঠে আসে। তরপ আলি কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে আসে। তারপর কিছুদিন হলো খুরশিদের কোন খবর-বার্তা নেই। মাসখানেক পর বিনা চিকিৎসায়, বিনা পথ্যে খাবারের অভাবে খুরশিদের মৃত্যু ঘটে। ওকে কবর দেয়া হয়েছে তিন নম্বর লেবার লাইনের গোরস্তানে। লাইনের গোরস্তান বললে ভুল হবে। আসলে এই রতনপুরে কোন গোরস্তান নেই। বৈরাগিটিলার অপরপাশে শ্রমিকরা নিজেরাই গোরস্তান বানিয়ে নিয়েছে।

দুই

এ চা বাগানের আরেকজন বাবু যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাগান ছেড়েছিল। এ খবর বাগানের অনেকেই জানে না। নাম তার শামসুদ্দিন। সে রাতে শামসুদ্দিন আনোয়ার বাবুর কাছে এলো। রাত তখন ১২টা। মির্জারহাট থেকে গুলির আওয়াজ থেকে থেকে সচকিত করে তুলছে পাহাড়ের খানা-খন্দ। আবার মানিকছড়ির ওদিক থেকেও গুলির আওয়াজ ভেসে আসছে। শামসুদ্দিন এসে ডাক দিল, চাচা ঘুমায়ছেন নাকি? কোন শব্দ নেই।

এত রাতে আগন্তুক দেখে পাড়ার নেড়ি কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠল। শামসুদ্দিন আবার ডাকল, চাচা, ও চাচা। এবার আনোয়ার বাবু ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলেন।

কে, কে? এই কিডারে?

চাচা আমি শামসুদ্দি।

শামসুদ্দিন সব সময় নিজের নাম বলত, শামসুদ্দি। কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর কূলে বাড়ি ছিল। এত বছর বাগানে চাকরি করল, চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশল, বিজাতীয় মানুষের ভাষার সঙ্গে মিশল কিন্তু ভাষা বদল হলো না। খাঁটি কুষ্টিয়ার ভাষায় সে কথা বলত। মিষ্টি একটা সুরে চাচা ডাকত। পরিচিত কাউকে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করত, কিরে কেমন আছিস? খবর বার্তা ভাল তো। বাসার সবাই ভাল আছে তো? কথার সুরই ছিল অন্যরকম।

আনোয়ার বাবু দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন।

কিরে শামসুদ্দিন, এত রাইতে তুই! কোন সমস্যা?

হ চাচা, একটা কথা আপনাক না বইলে গেলে শান্তি পাচ্ছিলাম না।

কি কথারে শামসুদ্দিন! ক তাড়াতাড়ি ক।

চাচা আমি যুদ্ধে যাতিছি।

কুথায় যাবি?

যুদ্ধে যাব চাচা। চাচা ঠিক করেছি শালাদের আচ্ছা করে প্যাঁদায়ে দিয়ে আসি। হেনে বইসে শুকনা শুকনা রুটি চিবুতি চিবুতি দিন যাবি তারচে দুই তিনডে শত্রু খতম কইরে দিয়ে আসি।

কারো সাথে কথা হইছে?

হ চাচা, মির্জারহাটে ওহাব মাস্টেরের দল আয়ছে। ওদের দলের সাথি যাব।

ঠিক আছে, যাবি যহন যা।

চাচা মাফ সাফ কইরে দিও।

শামসুদ্দিন ঝাঁপিয়ে পড়ে আনোয়ার বাবুর বুকের ওপর। কিছুক্ষণ দু’জন দু’জনকে আলিঙ্গন করে রাখে। আজ হঠাৎ সমবয়েসী এই লোকটার জন্য মনটা কেমন অজানা ব্যথায় টনটন করে ওঠে আনোয়ার বাবুর। তারপর শামসুদ্দিন বেরিয়ে আসে।

সেই শামসুদ্দিন ফিরে এসেছিল দেশ স্বাধীন হবার অনেক পরে। সবাই ভেবেছিল শামসুদ্দিন বুঝি সম্মুখ যুদ্ধে মারা গেছে। একদিন সকালে সবাইকে আনন্দে ভাসিয়ে শামসুদ্দিন ফিরে আসে। সব মিলিয়ে সে পাঁচ মাস ছিল। শামসুদ্দিনের যুদ্ধে যাবার খবর অনেকেই জানত না। কারণ বাগানের আশপাশেই থাকত রাজাকার মজু। মজু রীতিমতো ক্যাম্পে যেত আসত। সব খবরাখবর পাচার করত। সেখান থেকে এসে বাগানের সবাইকে ভয় দেখাত। ভয় দেখিয়ে সে অনেক ফায়দা লুটেছে। অনেককেই জোরে ধমক দিয়েছে। ভয়ে মজুর কথার কেউ কোন প্রতিবাদ করেনি। সপ্তায় সপ্তায় টাকা নিয়েছে সে। ছাগল, গরু সাপ্লাই দিয়েছে। অনেকের বউয়ের দিকে নজর দিয়েছিল। কিন্তু কাজ হাসিল করতে পারেনি। বাগানের মানুষ সব একাট্টা হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য একদিন মজুকে ধরে আচ্ছা করে ধোলাই দিয়েছিল বাগানের মানুষ। নাকের কাছে তুলা ধরে শ্বাস-প্রশ্বাস আছে কিনা পরীক্ষা করতে হয়েছিল। সেই মজুর ভয়ে শামসুদ্দিনের যুদ্ধে যাবার কথাটি যে জেনেছিল তারাই লুকিয়ে রেখেছিল।

শামসুদ্দিন ফিরে এলো এক দঙ্গল দাড়ি-গোঁফ নিয়ে। তারপরেও তার চোখে মুখে এক ধরনের দীপ্তি ছড়িয়ে ছিল। অফিসে এসে শামসুদ্দিন যে কথাটি বলল, তা হলো সে যুদ্ধ করতে পারেনি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল। তাদের ভাত-তরকারি রেঁধে দিয়েছে এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছে। ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে। স্টেনগান, রাইফেল, এলএমজি, গ্রেনেড হাতে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেÑ সে কথাও বীরত্বের সঙ্গে শামসুদ্দিন প্রচার করল। তবে শামসুদ্দিনের বলা একটি কাহিনী সবার চোখে জল এনে দিল।

হারান মাঝির ঘটনা বলতে বলতে শামসুদ্দিন নিজেও কেঁদে ফেলল। গ্রামটির নাম শামসুদ্দিনের মনে নেই। হারান মাঝি সে গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘরের কামলা। হারান জাতে চামার। তিনকূলে তার কেউ নেই। একসময় মরা গরুর চামড়া ছাড়িয়ে জুতা, স্যান্ডেল বানাত। চামড়ার কারবার করত। পঁচিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল। বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি। আরও পঁচিশ বছর পরে বউ মারা গেলে হারান একাই রয়ে গেল। মজাহার মিঞার খামারে মজুর খাটত সে। তবে মজাহার মিঞা মানুষ ভাল। হারানকে সে শ্রদ্ধা করত। জমি-জমার সব কিছু হারানের ওপরে ছেড়ে দিয়েছিল সে। বৃদ্ধ হারানের বয়স তখন ষাট, পঁয়ষট্টি। তবু সে নিজের হাতে লাঙল চষে, মই বায়, বীজ বোনে। ধান পাকলে জমিতে গিয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। কখনও ফসলের ক্ষেতে মাটিকে আদর করে। কখনও কচি চারার সঙ্গে কথা বলে। কখনও গাছের সঙ্গে কথা বলে। কখনও আকাশের সঙ্গে কথা বলে। হারানের জাতটাই যেন কেমন। সবাই বলে হারান মাটির মানুষ। কেউ বলে হারান ভাল মানুষ। সব মিলিয়ে ঐ গ্রামে হারানের মতো আর মানুষ হয় না। তাই নীচু জাতের হলেও হারানকে সবাই পছন্দ করে। আর হারানের হাতেও যেন আছে যাদু। গাছপালা, ফুল-ফল, তরি-তরকারি, শস্য সবকিছু ফুলে ফেঁপে ওঠে। কারও ক্ষেতে কোন কিছু না জন্মালেও সেবার হারানের ক্ষেতে ফসলাদি হবেই। হবে তো হবে একেবারে বাম্পার ফলন হবে।

তো যুদ্ধ লাগলে গ্রামের যে কয় ঘর হিন্দু ছিল তারা সবাই চলে গেল ভারতে। হারানদের স্বজাতি দু-একজন যারা ছিল তারাও চলল ভারতের দিকে। যাবার সময় খুব কাকুতি মিনতি করল।

হারান দা চল যাই। এখানে তো তোমার কেউ নাই। শুধু শুধু গুলি খেয়ে মরে যাবে। কষ্ট পাবে। চল তারচে তোমাকে আমরা বর্ডার পার করে দিই।

হারান কিছুতেই রাজি হলো না। এই সবুজ মাটি অবারিত ফসলের মাঠ শস্য দানা আর মানুষের ভালবাসা ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। তা ছাড়া সে বৃদ্ধ মানুষ মাঠে-ঘাটে কাজ করে পাক বাহিনী তাকে কিছু বলবে না। পাশের দেশে গেলে সে উদ্বাস্তু হয়ে যাবে।

পাক বাহিনী তাকে কিছু বলবে না- এই বিশ্বাস সবার ছিল। কিন্তু বিশ্বাস ভাঙতে বেশি দিন লাগল না। প্রথমে ওরা ধরে নিয়ে গেল মোজাহের মিঞাকে। রাজাকাররা লাগিয়ে দিয়েছে মোজাহের মিঞা মুক্তি বাহিনীকে খানাপিনা দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে। এই অপরাধে মোজাহের মিঞাকে ধরে নিয়ে গেছে। মোজাহের মিঞাকে অমানবিকভাবে কষ্ট দিয়েছে। বাড়ি থেকে প্রতিদিন ভাত পাঠানো হতো। মোজাহেরকে ওরা খেতে দিত না। কিন্তু টিফিন ক্যারিয়ারে ওরা মোজাহের মিঞার আঙুল কেটে কেটে পাঠাত। যখনই টিফন ক্যারিয়ার ফেরত আসত, তখন আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি গুমরে গুমরে ফিরত। এভাবেই একদিন ওরা তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মোজাহের মিঞাকে মারে। তারপর ঘটল সেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।

তিন.

সেদিন সকালে যথারীতি হারান মাটির পরিচর্যা করছিল। নিড়ানি দিয়ে শস্যক্ষেতের আগাছা তুলছিল। এমন সময় ওরা বুড়ো হারান মাঝিকে ধরে নিয়ে গেল। গাছের সঙ্গে বেঁধে বেদম পেটাল ভাল মানুষটাকে। হারানের তখনও মাথায় টুপি আছে। পরনে আধময়লা লুঙ্গি। ধরা পড়ার ভয়ে মানুষের বুদ্ধিতে হারান পড়ত একটা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর টুপি। কসাইগুলো হারানকে মারার পর তাকে নেংটো করে দেখল সে মুসলমান কিনা। এরপর তো হারান মাঝির আর বেঁচে থাকা চলে না। তবে শেষমেশ তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তার শেষ ইচ্ছা কী? হারান তার শেষ ইচ্ছা বলল।

আমার মাটি, আমার জমিগুলান যারা কোনদিন আমারে বিমুখ করে নাই, সেই মাটির কাছে একবার যাইতে চাই।

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। কয় কী হারামজাদা! সবাই দেখা করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আর সে নাকি দেখা করবে মাটির সঙ্গে। হো হো হো। হাসির বন্যা বয়ে গেল। তোমার পোলাপান থাকলে কও।

না, তার ছেলে পেলেরা ওপাড়ে চলে গেছে। এ মাটিকে ছেড়ে ওরা সীমানা পাড় হয়ে গেছে। ওরা মায়ের সঙ্গে বেঈমানি করেছে। হারানমাঝি বেঈমান না।

মাটিই আমার আত্মীয়। মাটিই আমার মা। একটু ধুলা যদি লাগাইতে পারি।

হ, হ লাগাইতে পারবি কি, এক্কেবারে মাডির লগে হুইত্তা থাকতে পারবি।

সবার রসিকতায় হারান বুড়োর চোখ গলে জল গড়িয়ে নেমে আসে।

সবাই বলল, ঠিক আছে বুইড়া যহন মাডির লগে দেহা করবার চায়, করুক।

হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হারানকে নিয়ে যাওয়া হলো জমিতে। জমির কাছে গিয়ে হারান মা, মা, মা বলে চিৎকার করে উঠল। উপর হয়ে জমিতে পড়ে মাটিকে দু’হাতে খাবলে আদর করতে চাইল হারান। জমিতে দু’হাতে টান টান করে ছড়িয়ে দিল। আর নির্দয় পশুগুলো হারানকে সেই আলিঙ্গন থেকে আর মাটিতে দাঁড়াতে দিল না। হারান রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিকে জড়িয়ে পড়ে রইল। মনে হলো আর কেউ হারানকে তার মায়ের বুক থেকে আলাদা করতে পারবে না। বুকের সবটুকু তাজা উত্তপ্ত রক্ত ঢেলে দিতে লাগল সে তার মায়ের বুকে।

তরপ আলি নিঃশ্বাস লুকিয়ে নিল। আর আনোয়ার বাবুর চোখ ছল ছল করতে লাগল। মাটির প্রতি অদৃশ্য টান আর মাথা নোয়নোর জন্য বুকটা আঁকুপাঁকু করতে লাগল। তরপ আলি অদ্ভুত একটা কাণ্ড করল। মাটিতে উপর হয়ে পড়ে নাক ঘষতে লাগল। আর বুক ভরে যেন মাটির ঘ্রাণ টানতে লাগল।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: