মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শের-শায়েরী

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

শের-শায়েরীর (উর্দু কবিতা) সঙ্গে উপমহাদেশের মানুষ বিশেষ করে কাব্যানুরাগীদের পরিচয় বহুকাল ধরে। উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় পাঠক-নন্দিত এসব শের-শায়েরীর অনুবাদ হয়েছে বহু। বাংলা ভাষার বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকরা এইসব মনগ্রাহী শের-শায়েরীর অনুবাদও কম করেননি। তারপরেও উর্দু সাহিত্যের এই কাব্যধারাটি সম্পর্কে কাব্য-প্রেমিকদের আগ্রহের যেন শেষ নেই। আগ্রহের যে শেষ নেই তার দৃষ্টান্ত আমরা সব সময়ই পাচ্ছি। একেকজনের পরিবেশনা যেন একেক ধরনের। এ এম শারাফাত আলী অনূদিত ও সম্প্রতি প্রকাশিত ‘শের-শায়েরী’ শিরোনামের কাব্য সংকলনটি পড়লে মনে হতে পারে উর্দু কবিতার (শের-শায়েরী) রস অফুরন্ত। অনূদিত কাব্য সংকলনটি প্রকাশ করেছে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মল্লিক ব্রাদার্স। বইটির বাংলাদেশে পরিবেশক গুলশান-২ এর ল্যান্ডমার্ক টাওয়ারস্থ বিশ্ববিচিত্রা এবং মল্লিক ব্রাদার্স, নিউমার্কেট ঢাকা।

শের-শায়েরী কাব্যগ্রন্থটিতে অনুবাদক উর্দু ভাষার বরেণ্য কবিদের মধ্যে আল্লামা ইকবাল, ওমর খৈয়াম, মীর্জা গালীব, জালালউদ্দিন রুমি, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মীর তকী মীর, হাফেজ জলান্ধরী, ইসমাইল মেরঠী প্রমুখের শের-শায়েরী সংকলিত করেছেন। কবিতাগুলো প্রেম, বিরহ-বেদনা, প্রকৃতি ও সৌন্দর্য, মরমীয়া ও বিবিধÑ এই পাঁচ শ্রেণীতে সংকলিত করেছেন। গ্রন্থটির সংগ্রাহক, অনুবাদক ও সংকলক এ এম শারাফাত আলীর কবিতা বাছাই ও শ্রেণী বিন্যাসের মধ্যে তার প্রজ্ঞার পরিচয় পাই। প্রেম পর্বে অনেকগুলো শের অনুবাদ করে সংকলিত করেছেন। তার মধ্যে কিছু শের উল্লেখ করা যায়। যেমন- শের : ১ ‘ইয়ে আরজু হ্যায়, ওয়াফা বানকে তেরে সাথ রাহু, ধারাক্তে দিলকি সাদা বানকে তেরে সাথ রাহু। মিলু বাহারকি মানিন্দ হার জমিপে তুঝে, হার আসমাঁ পে ঘাটা বানকে তেরে সাথ রাহু।’ (এটাই আমার আশা, যাতে বিশ্বাসী হয়ে তোমার সঙ্গে থাকি, হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে সব সময় তোমার সঙ্গে থাকি। বসন্তের মতো সৌন্দর্যের মাঝে তোমার সাথি হয়ে রই, পৃথিবীর যেখানেই তুমি থাকো, মেঘ হয়ে তোমার সঙ্গী হই)। প্রেমিকার প্রতি একজন প্রকৃত প্রেমিকের কী সুগভীর ভালোবাসা ও তৃষ্ণা বাক্সময়! শের ২২ : ‘বান্দ থি আঁখে কিসিকি ইয়াদমে, মৌত আয়ি অউর ধোঁকা খা গায়ি।’ (প্রেমিকার ভাবনায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল প্রেমিক, ঠিক তখনই মৃত্যু এসেছিল ওকে নিয়ে যেতে, কিন্তু ওকে মৃত ভেবে ধোঁকা খেয়ে গেল)। কী অতুলনীয় এই নিমগ্নতা। অনেকটা সুফিবাদের মোরাকাবার মতো। এ পর্বে সংকলিত সবগুলো শেরেই প্রেমের স্তুতি ও প্রেমময় জীবনের প্রশান্তি রূপায়িত হয়েছে।

প্রেম-প্রশান্তির অন্যপিঠ বিরহ-ব্যথা। প্রেমের ক্ষেত্রে যেমন বিরহ-বেদনার ক্ষেত্রেও উর্দু ভাষার স্বনামখ্যাত কবিরা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। যেমন ‘অ্যায় শাম্মা তুঝপার এক রাত ভারী হ্যায় জিস তারহ, ম্যায়নে তামাম উমরো গুজারি হ্যায় ইস তারাহ।’ (হে প্রদীপ একটি রাত জ্বলতে তোমার যেমন কত কঠিন মনে হয়, আমি তো সারাজীবন ধরে এভাবেই জীবনটা কাটাচ্ছি)। বিরহের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি রাতের কষ্ট কী তার তুলনাহীন তুলনা। এ গ্রন্থে বিরহ-ব্যথার কবিতাই বেশি সংকলিত হয়েছে।

এবার ‘প্রকৃতি ও সৌন্দর্য’ পর্বে যাওয়া যাক। শের : ৬ ‘চামান হাস পাড়ে, গুল মুসকুরায়ে, বাড়া শুকরিয়া আপ তাশরিফ তো লায়ে।’ (সারা বাগান হেসে উঠেছে, ফুলেরাও মুচকি হাসছে, অনেক ধন্যবাদ, এখানে তোমার আগমন যে হয়েছে)। সৌন্দর্যের অপার জগৎ বাগানও নারী সৌন্দর্যে প্রেমিকের মতোই মুগ্ধ হয়। এখানে প্রকৃতি আর নারী সৌন্দর্যের দিক থেকে একাকার। ফুলের মতো সুবাস ও সৌন্দর্য কাঁটায় না থাকলেও প্রকৃতিতে তার অবস্থান ফুলের মতো আদরণীয় না হলেও ফেলনা নয়।

‘মরমীয়া’ পর্বটি হৃদয়গ্রাহী। এখানে জীবনের অমোঘ নিয়তি ও জীবন জিজ্ঞাসার বহুমাত্রিক উচ্চারণ আছে। যেমন- শের : ১ ‘ল্যাহেদমে রৌশিনীকে ওয়াস্তে সামান লায়াহু, আন্ধেরা ঘার সুনাথা, শাম্মায়ে ঈমান লায়াহু। গার পুছেগা খোদা মুঝসে তু কিয়া লায়া হ্যায় দুনিয়াসে? তো ক্যাহদুঙ্গা তেরে দিদার কা আরমান লায়াহু।’ (কবরে আলোর জন্য কিছু সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে এসেছি, অন্ধকার ঘর হবে তা আগেই শুনেছিলাম, তাই ঈমানের আলো জ্বালিয়ে নিয়ে এসেছি। যদি খোদা জানতে চান, পৃথিবী থেকে তুমি কী এনেছ? তবে বলে দেব, আমি তোমার দর্শনের আশা নিয়ে এসেছি)। পরকালের কঠিন সময়ে যেখানে সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত, তখনও প্রকৃত ঈমানদাররা যে সাহসে বলীয়ান থাকবেন সে সত্যেরই উচ্চারণ।

‘বিবিধ’ পর্বে এ এম শারাফাত আলী ভিন্ন স্বাদের কবিতার বিন্যাস ঘটিয়েছেন। শের-শায়েরী গ্রন্থটির প্রায় সবগুলো কবিতাই উদ্ধৃতিযোগ্য। অনুবাদককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এমন হৃদয়ছোঁয়া কবিতা অনুবাদ ও সংকলনের জন্য। বইটির অলংকরণ দৃষ্টিনন্দন হলেও কে করেছেন উল্লেখ নেই। দামী আর্ট পেপারে, সম্পূর্ণ চাররঙে ছাপা, আকর্ষণীয় বাঁধাই সব মিলিয়ে বইটির মূল্য ৪০০ টাকা বেশি নয়, তবে সকল শ্রেণীর পাঠকের কথা বিবেচনা করে বইটির দাম আরেকটু কম হলে ভালো হতো। বইটি পাঠক নন্দিত হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

জহিরুল হক মাখন

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: