আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কল্লোল যুগ ও প্রেমেন্দ্র মিত্র

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • সরকার মাসুদ

তিরিশের কল্লোল যুগ যে কয়টি উজ্জ্বল ডিঙ্গা ভাসিয়ে ছিল উজানে, তার মধ্যে একটি অবশ্যই প্রেমেন্দ্র মিত্রের। ওই বিদ্রোহী কালের সর্বশ্রেষ্ট সব্যসাচী বুদ্ধদেব বসু। তারপরই আসে প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এই নামগুলো। এরা সকলেই শিল্পী হৃদয়ের আপন ঐশ্বর্যে কমবেশি ঋদ্ধ করেছেন তাদের দ্রোহচিহ্নিত রচনাবলী।

কল্লোলীয় বিদ্রোহের একটা শক্ত সমর্থ শৈল্পিক প্ল্যাটফর্ম ছিল। সুতরাং বিরুদ্ধাচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত সেই চিরসজীব রোমান্টিক স্বপ্নের উদ্ভাস এক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। এ স্বপ্নের রহস্য মধুর পথ ধরে অগ্রসর হয়েই রবীন্দ্রোত্তর যুগের কল্লোল ডিঙ্গা ভরে নিয়ে এসেছিল অদৃষ্টপূর্ব সহিত্যসম্ভার; স্বাদে ও গন্ধে আনকোরা, তরতাজা। সহযাত্রী অন্যান্য লেখকের মতো প্রেমেন্দ্র মিত্রও ওই আচ্ছেদ্য রোমান্টিকতার অংশীদার।

বিচিত্র সৃষ্টিশীল রচনার উদ্দাম স্রোতে নেমেছিলেন বিশেষভাবে দুজনÑ বুদ্ধদেব আর প্রেমেন্দ্র। মনের তেজ, সাহস এবং সুরুচি এদের রচনাকে দিয়েছে গভীর ঐশ্বর্য ও দীপ্তি। তবে খানিকটা লাজুক আর উদাসীন স্বভাবের মানুষ প্রেমেন্দ্র মিত্র কাজ করে গেছেন খুব নিঃশব্দে, অনেকটা জীবনানন্দের মতোই। শিল্পীর নিবৃত অহঙ্কারকে রেখেছেন নিভৃতেই। প্রকাশিত হতে দেননি। কল্লোল পর্যায়ে শুধু যে কবিতার জন্মান্তর ঘটে, তা নয়। কথাসাহিত্যেসমেত সাহিত্যের অন্যসব শাখাতেও সংঘটিত হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বাস্তব গোটা বাংলাসাহিত্যই তখন নবীনতার জোয়ারে স্নান করে উঠেছিল। উত্তররৈখিক ওই সাহিত্য আন্দোলনে মনীষা মিছিলকে একটি নতুন তাৎপর্য দেয়ার লক্ষ্যে সামনের সারির বুদ্ধদেব বসু কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যে রকম প্রকাশ্য ভাবচঞ্চল উন্মাদনায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র ঠিক সেভাবে প্ল্যাটফর্মে আসেননি। তবে ভেতরে ভেতরে তিনি যে তাদের কারও চাইতেই কম আক্রান্ত ও উদ্দীপিত ছিলেন না, তার সাহিত্যকর্মের বিচিত্র বিপুল সমাবেশই তা প্রমাণ করে। শুধু কাব্যকৃতির কথা বিবেচনা করলে তিরিশের সুবিদিত পঞ্চ নক্ষত্রের পাশেই প্রেমেন্দ্রের স্থান। কিন্তু আমার মনে হয়েছে সব্যসাচী প্রতিভা হওয়ার কারণেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবি ইমেজকে কিছুটা খাটো করে দেখা হয়। অবশ্য প্রেমেন্দ্র মিত্র একটা সময় কথাসাহিত্যে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। কবিতায় তার অপ্রতিরোধ্য লিরিক মেজাজ এবং হৃদয়গ্রহীতা; বলা চলে, বহুজনাদৃত হয়ে উঠতে পেরেছিল। পাশাপাশি কথাসহিত্যে তার যে অসামান্য সিদ্ধি তাতে কবি প্রেমেন্দ্র এবং গল্পকার প্রেমেন্দ্রের মধ্যে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণÑ এই তর্ক উঠতেও খুব বেশি দেরি হয়নি। প্রসঙ্গত, তার ‘পাঁক’, ‘মিছিল’ প্রভৃতি উপন্যাস এবং ‘সাপ’, ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’, ‘শুধু কেরানী’, ‘ভবিষ্যতের ভার’ প্রভৃতি গল্পের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সমকালীন অবক্ষয়, হতাশা ও বেদনার শিল্পশোভন অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায় তার সাহিত্যে। বিশেষ করে উপন্যাসে ও ছোটগল্পে। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরীÑ প্রেমেন্দ্র মিত্র যখন ২৬-২৭ বছরের টগবগে যুবক, তখন (১৯২৮-২৯) মহাযুদ্ধ পরবর্তী সময়কার অর্থনৈতিক ধাক্কা মার্কিনমুলুক ও ইংল্যান্ড ঘুরে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকেও আঘাত করেছিল প্রচ-ভাবে। বিকাশশীল ধনতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য শনিপ্রভাবে ভারতবর্ষে তখন চলছে মর্মান্তিক সঙ্কট। বেকার সমস্যা এবং অকল্পনীয় দ্রব্যমূল্য বিপর্যয় দেখা দেয় চারদিকে; এরপর যে ধাক্কাটি আরও তীব্রভাবে আঘাত করে তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ যখন শেষ হলো, প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন চল্লিশ পেরিয়েছেন। একজন লেখকের জন্য যৌবন ও মধ্য বয়সের এ সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময়েই সাধারণত তার সম্ভাবনার সব দরজা ধীরে ধীরে খুলে যায়। দেশকালের ওই অস্থির ঘটনাবহুল স্রোতে স্নাত প্রেমেন্দ্র মিত্র। অতএব জীবনকে সমগ্রতার জালে ধরতে চেয়েছিলেন। ফলে একসঙ্গে সাহিত্যের একাধিক মাধ্যমে কাজ করতে পেরেছেন সাধ্য অনুযায়ী।

জীবনের গম্ভীর, বিষন্ন চেহারা প্রেমেন্দ্রের গল্পে এমনভাবে ও ভঙ্গিতে উপস্থাপিত যে, পাঠক তাতে সাড়া না দিয়ে পারে না। তার পাত্রপাত্রীরা সময়ের কুটিলতা দ্বারা লাঞ্ছিত। তাদের অসহায়তা দেখে পাঠকের মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু পরাজয়ের গ্লানি বা অপরাধবোধ দ্বারা প্রেমেন্দ্রের চরিত্ররা তাড়িত নয়। ধরা যাক, শুধু ‘কেরানী’ গল্পের টাকা-পয়সাকেন্দ্রিক ট্রাজিক পরিণতির কিংবা ‘ভবিষ্যতের ভার’ গল্পে হেডমাস্টার সাহেবের অভাবনীয় দারিদ্র্য সঙ্কটের কথা। এসব রচনা লেখকের অনুভূতির প্রাজ্ঞ-প্রকাশ ঘটিয়েছে উজ্জ্বলভাবে। একটি বিশেষ প্রতীতিতে নিজস্ব ভাবনা ও দর্শন যোগ করে। তাকে তাৎপর্যময় করে তোলা, আধুনিক গল্পকারদের জন্য এ এক বড় দায়িত্ব। গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্র দায়িত্বটি পালন করেছেন সামর্থ্যমতো এবং বহুলাংশে সফলও হয়েছেন।

কাব্যসাহিত্যে হৃদয়বৃত্তি ও কল্পনার স্থানই যে সবচেয়ে বড়, জীবনানন্দ দাশই তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। কবিস্বভাবের দিক থেকে প্রেমেন্দ্র জীবনানন্দ ঘরানার। কবিতায় বুদ্ধির স্থানকে বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ ও অমিয় চক্রবর্তী খুব পাত্তা দিয়েছিলেন। অমিয়র আধ্যাত্মিকতাময়, স্বাধীন শব্দশৈলীর আপাত ঔদাসীন্যে দে’র কবিতায় ভাব-সঙ্গতির কঠিন নিগড়ে তা ঠিকই উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত। মূলত হৃদয়বাদী প্রেমেন্দ্র মিত্র; অতএব, যুক্তিনিষ্ট শব্দের ধ্বনি মাধুর্যে মুগ্ধ না হয়ে নিজেকে প্রধানত কল্পনাভাবনার সৌন্দর্যে সমর্পিত করেছেন। এজন্য দেখা যায়, স্বরবৃত্ত ঢঙ্গে লেখা তার কবিতাগুলো একই ছন্দে রচিত অমিয় চক্রবর্তীর অনেক কবিতার চেয়ে বেশি মর্মস্পর্শী।

Ñ‘হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে/হৃদয়ে কি জং ধরে/পুরনো খাপে!’ (জং, কাব্যগ্রন্থ, ‘সাগর থেকে ফেরা’)

প্রচলিত নৈতিকতাকে আঘাত করতে হবে কিংবা যা কিছু পুরনো তাকেই আক্রমণ করতে হবে। এরকম চরমপন্থীসুলভ বিশ্বাসে আস্থা ছিল না প্রেমেন্দ্র মিত্রের। মুক্ত মানসতার অধিকারী এই সহজ সরল মানুষটি জীবনের কাছ থেকে উপার্জন করেছেন অসম্ভব সহিষ্ণুতা এবং ঔদার্য। ফলে তার কবিকল্পনা শুধুই সহিত্যনির্ভর বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি, তা পরিব্যাপ্ত হয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র শাখা প্রশাখায়ও। তবে ওই সব ক্ষেত্রেও সৃষ্টিশীল কল্পনা ভাবনাকে ছাপিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। তিনি গল্পে যেমন বর্ণনার অনাবশ্যক দীর্ঘায়তনের বিরোধী ছিলেন, তেমনি কবিতায়ও মিতকথনের পক্ষপাতী ছিলেন। তার কাব্যে বাকরীতির আশ্চর্য সুন্দর প্রয়োগ অবশ্যই লক্ষ্য করার মতো। Ñ‘নীল! নীল!/সবুজের ছোঁয়া কিনা, তা বুঝি না,/ফিকে, গাঢ়, হরেকরকম কমবেশি নীল।’ (সাগর থেকে ফেরা/ঐ)

একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গীতিকার ও সম্পাদক এই ব্যক্তিটি প্রাণের বিপুল ক্ষুধা মেটাতে গিয়েই এতগুলো সৃজনপ্রবাহের বহু বিপ্রতীপ পাঁকে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। ফলে পরিণত বয়সে একটি বা দুটি সাহিত্য মাধ্যমে প্রবলভাবে নিজেকে লিপ্ত করা তার পক্ষে আর হয়ে উঠেনি। তাছাড়া এতসব শিল্পবীজ একত্রে ধারণ করে সেগুলোকে সতেজ স্বাস্থ্যবান বৃক্ষে রূপান্তরিত করার মতো পরাক্রান্ত প্রতিভা ছিল না প্রেমেন্দ্র মিত্রের। তা সত্ত্বেও কবিতা, ছোটগল্প আর কিশোর সাহিত্যে তার অবদান কম নয়।

তিরিশের বুদ্ধিজীবী চার কবির (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী) শিল্পাদর্শ থেকে অনেকখানি সরে এলেও প্রেমেন্দ্র তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথমা’তেই উল্লেখযোগ্য নিজত্বের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন। বইটি কল্লোল যুগের সব লক্ষণই ধারণ করে আছে।

কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাব্যিক পরিণতিÑ তার কল্পনা-মনীষার সমূহ উৎকর্ষ ফুটে উঠেছে ‘সাগর থেকে ফেরা’ গ্রন্থে। আমার বিবেচনায় এটাই তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতার বই। কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করছিÑ ‘হে পৃথিবী, কোথায় যাবো? ক্লান্ত/আকাশে চা’ই সেখানে উদভ্রান্ত/আমার মন, গহন বন, ফুরায় না।’

এমন চেতনাগভীর, রহস্যাক্রান্ত অথচ অনাড়ম্বর উচ্চারণ আজকের ক’টি কবিতায় পাওয়া যাবে? যারা কবিতা বানায় প্রেমেন্দ্র তাদের দলে নেই; ছিলেন না কখনও। ললিত ছন্দে হৃদয়ের একান্ত গোপন কথাটি তিনি খুব আন্তরিক অথচ উদাসীন ভঙ্গিতে বলে গেছেন। তার কাব্যে এমন এক দূরস্পর্শী সারল্য আছে যে, পড়তে পড়তে আমরাও যেন নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যাই বৃষ্টিধোয়া দিগন্তের বিস্তীর্ণ নীলে নীলে। সমুদ্রের গভীর কল্লোল নয়, তার কবিতা মনে করিয়ে দেয় হ্রদের শান্ত ঝিলমিল বৈকালিক নীরবতা। জীবন রহস্যের এই সাতিশয় অন্তর্মুখী, অবাক প্রকাশের কারণেই প্রেমেন্দ্র মিত্র বেঁচে আছেন পাঠকের হৃদয়ে। বেঁচে থাকবেন আরও অনেক অনেক দিন।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: