কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবিতার দিবস-ভাবনা

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • সাযযাদ কাদির

২১ মার্চের সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক জানি না, তবে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) গ্রেগরিয়ান অব্দের এ দিনটিকেই বেছে নেয় বিশ্ব কবিতা দিবস (ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ডে) হিসেবে, তারপর ২০০০ সাল থেকে তা পালন করে আসছে যথারীতি। কৌতূহলীরা কারণ জানতে খোঁজখবর নিতে পারেন বিভিন্ন মাধ্যমে, এমনিতে আঁতিপাঁতি করে খুঁজলে দেখব এ দিনে জন্মেছেন ১৬৭২ সালে ইতালিয়ান কবি ও অনুবাদক স্তেফানো বেনেদেতো পালাভিচিনো, ১৯০৫ সালে আমেরিকান কবি ফিলিস ম্যাকগিনলি, ১৯২৩ সালে সিরিয়ান কবি নিজার কাব্বানি প্রমুখ; কিন্তু এঁদের কারও স্মরণে এ তারিখটি জাতিসংঘ বেছে নিয়েছে বলে মনে হয় না। এর আগে ইউরোপে এবং ওই মহাদেশের বাইরে কোন কোন দেশে দিনটি পালিত হতো অক্টোবর-নবেম্বর মাসের কোন এক তারিখেÑ বিশেষ করে ৫ অক্টোবর বা এর আগে-পরে কোন একটি দিনে। গত শতকের শেষ পাদে দিবসটি পালিত হয়েছে ১৫ অক্টোবর। তারিখটি রোমান মহাকবি ভারজিলের (৭০-১৯ পূর্বাব্দ) জন্মদিন। তিনি ছিলেন সম্রাট অগস্টাসের (শাসনকাল ২৭-১৪ পূর্বাব্দ) সভাকবি। এ ঐতিহ্য বজায় আছে এখনও। ইংল্যান্ডে দিবসটি বরাবরের মতো পালিত হয় ৫ অক্টোবর। তাহলেও ২১ মার্চের উদযাপন গত ১৫ বছরে অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে কবি ও কবিতা-অনুরাগীদের নানা উদযোগ-আয়োজনের মাধ্যমে। এ বছর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পশ্তুভাষী কবিরা উৎসবে মেতেছিলেন প্রথমবারের মতো। সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানী পশ্তু কবিরা গিয়েছিলেন আফগানিস্তানের মোহমন্দ এজেন্সির গাললানাইয়ের জিরগা হলে। সেখানে দু’দেশের কবিরা সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে কবিতার ভূমিকাকে শাণিত করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দৃঢ়স্বরে। ওদিকে এবার কবিতা দিবস উপলক্ষে ৭০টির বেশি দেশের ১১০০টি কাফে, বার ও রেস্তরাঁয় কবিতার বিনিময়ে পাওয়া গেছে এক মগ ধূমায়িত কফি। এ আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে ভিয়েনাভিত্তিক কফি-রোস্টিং কোম্পানি ‘জুলিয়াস মেইনি’। তবে আমেরিকার একমাত্র শিকাগো শহরেই আছে ওই কোম্পানি পরিচালিত কফি শপ। ইংল্যান্ডে আবার কফি মেলেনি সব শপে। মধ্য লন্ডন থেকে মেঘা হরিশ নামে এক কবি টুইটারে জানিয়েছেন, কবিতার বিনিময়ে কফির বদলে তিনি পেয়েছেন পুদিনা চা।

আমাদের এখানে ‘আন্তর্জাতিক কবিতা দিবস’ নামে দিবসটি পালন করেছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য-কবিদের সংগঠন ‘কবিতাপত্র পরিষদ’। বলতেই হয় এ আয়োজন ব্যতিক্রম। কারণ কবিতা ম্যাজিক হলে সাংবাদিকতা লজিক- এ অভিমত সত্য বলে ধরে নিলে চিন্তা ও আবেগের দিক দিয়ে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা হওয়ার কথা কবি ও সাংবাদিকদের। কিন্তু একই অঙ্গে দুই রূপ নিয়ে বহু কবি ও সাংবাদিক সক্রিয় রয়েছেন পৃথিবীর সব দেশেই; আমাদের এখানে তো তাঁরা সংখ্যায় অনেক। সাংবাদিক হিসেবে কর্মসূত্রে বহু কবি-লেখককে পেয়েছি সহকর্মী হিসেবে। দৈনিক পাকিস্তান পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলায় আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্, জামালউদ্দিন মোল্লা ছিলেন সুপরিচিত কবি। জেনারেল ম্যানেজার আহসান আহমদ আশক ছিলেন খ্যাতনামা উর্দু কবি। আহমেদ হুমায়ুন ছড়া লিখতেন চমৎকার। দৈনিক সংবাদে পেয়েছি মাহমুদ আল জামান থেকে আহসান হামিদ পর্যন্ত অনেক কবিকে। চপল বাশার তখন লিখতেন কিনা জানি না, এখন তো ব্যস্ত কবিদের একজন। শ্রদ্ধেয় সন্তোষ গুপ্তকে আমি কবি ও সাংবাদিকই বলতাম। শেক্সপিয়ারের সনেট অনুবাদ করেছিলেন তিনি, এছাড়া তাঁর এক কবিতার দুটি পঙ্ক্তি আমাদের মুখে-মুখে ছিল ষাটের দশকের আন্দোলনের দিনগুলোয়-

‘মৃত্যুর জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ -

কবরের ঘুম ভাঙে জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিতাপত্র পরিষদের প্রাণপুরুষ দু’জন- সম্পাদক কে জি মোস্তফা এবং প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক ও প্রধান নির্বাহী এরশাদ মজুমদার। প্রথমোক্ত জন মূলত গীতিকবি হিসেবে সুখ্যাত হলেও কবিতার সকল শাখায় তাঁর সৃষ্টিশীল বিচরণ স্বাচ্ছন্দ্য ও সার্থক। সরকারি কর্মজীবনে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, হাতযশ আছে হোমিওপ্যাথিতে। এরশাদ মজুমদার সম্পাদক-সাংবাদিক হিসেবেই খ্যাতিমান। পাকিস্তান অবজারভার থেকে দৈনিক ফসল পর্যন্ত সুদীর্ঘ কর্মজীবন তাঁর। কবিতায় তিনি যেমন মরমী চেতনায় ঋদ্ধ, তেমনি তীব্র ও শাণিত রাজনৈতিক ঋজুতায়। এই দু’জনের অক্লান্ত প্রয়াসে কয়েক বছর ধরে পরিষদের আয়োজনে নিয়মিত চলছে মাসিক কবিতা পাঠের আসর ও কবিতাপত্রের প্রকাশনা। তাঁদের আহ্বানে আসরে যোগ দিতে সচেষ্ট থাকি বটে কিন্তু শেষ মুহূর্তে যাতায়াতের বিভ্রাটে পড়ে যাই, গত ২১ মার্চেই প্রথম যোগ দিলাম আসরে। সদস্য কবিদের পাশাপাশি অতিথি কবিরা প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন আসরকে। কবিতাপত্রে অবশ্য লেখার চেষ্টা করি সবসময়। একবার ই-মেলে আমার প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থের পুরো পা-ুলিপি পাঠিয়েছিলাম সম্পাদকের কাছে, তাতে কবিতার সূচীও ছিল। একবার দেখি সেই সূচী ছাপা হয়েছে কবিতা হিসেবে। দেখে নির্বাক নিশ্চুপ হয়ে যাই একেবারে। কিন্তু কোথাও প্রতিক্রিয়া নেই কিছু। শেষে সম্পাদককে ব্যাপারটা বলার পর তিনি বললেন, ঠিকই আছে। সূচীর ওই নামগুলো- শব্দগুলো তো কবিতাই। পড়ুন নিজে, পড়লে কবিতাই মনে হবে। আসলে কবিতা তো এমনই ছড়ানো ছিটানো। ড্যামেজ্ড। ড্যামেজ্ড থট (বিধ্বস্ত ভাবনা)! সংজ্ঞাটি চমকে দেয় আমাকে। পরে প্রাণ খুলে ধন্যবাদ জানাই সম্পাদককে।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: