রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীর ক্ষমতায়নে পুরুষের সহযোগ

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

জেন্ডার সমতা হলো নারী-পুরুষের সমতা, সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মানিত সম্পর্ক। পরিবার ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রের উন্নয়নে নারী পুরুষের পারস্পরিক এই সম্পর্ক বিশেষ প্রয়োজন। সমাজের নারী পুরুষ, ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পারিবারিক সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে যে সমস্যা দেখা দেয় তা সমদৃষ্টিতে মূল্যায়নের প্রবণতাকে জেন্ডার সমতা বলা যেতে পারে। এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় বন্ধুতা, পেশাদারিত্বে ও যৌথ দায়িত্ববোধের সুসমন্বয়ে। জেন্ডার সমতার স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমেই পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যে কোন কঠিন সমস্যা ‘একের বোঝা, দশের লাঠি’ বাস্তবধর্মী এই রূপকের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশের বিরাজমান দারিদ্র্য বিমোচন ও সার্বিক উন্নয়নে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী। এমন নয় যে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে না। ফসলের ক্ষেত থেকে ইট ভাঙ্গা, মাটি কাটা, মাটি বহনের মতো কঠিন কাজগুলোও নারীরা সমানে করে যাচ্ছে। ক্রমশ তৃণমূল পর্যায় থেকে উচ্চপর্যায়ের সকল ক্ষেত্রে আজকাল নারীরা পুরুষের সহকর্মী থেকে সহমর্মী সহযোগী হিসেবে পাশাপাশি কাজ করছে। ঘরে বাইরে, শিক্ষা, সামরিক, নৌ, বিমান, সরকারি, বেসরকারী থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে নারীর কাজের প্রচুর প্রশংসা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও বাংলাদেশের নারীদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নারী কি সত্যিকারভাবে পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে? পারলে তা দেশের মোট নারীদের কত শতাংশ পারছে?

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার ইতোমধ্যে সামাজিক চাপের কারণে নারীদের বিয়ের বয়েস ১৮ থেকে ১৬ করতে বাধ্য হয়েছে। নারী নির্যাতন বন্ধে ক্ষীণ সাফল্য এলেও তা ব্যাপকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হচ্ছে সেই ধরনের একটি রাষ্ট্র যেখানে নারীদের ওপর সর্বাধিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়। এই দেশে চরম দারিদ্র্যের কারণে মেয়ে শিশুদের পাচার অবিরাম চলছেই। গৃহশ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য কোন আইন নেই। গৃহকর্মীদের এখনও মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারটি আগের মতই ঝুলে রয়েছে। পোশাকশিল্পে দুর্ঘটনায় নিহত কর্মীর বেশিরভাগই নারী। নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে দেশ বিদেশের আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক চলছেই। কিন্তু সুরাহা হচ্ছে না তেমন কিছুরই। এইরকম নানা অসুবিধার মোকাবেলা করেও বাংলাদেশের নারীরা জাতিসংঘের সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, শ্রমের মূল্যায়ন, কাজের প্রতি সম্মান স্বীকৃতি এখনও দেওয়া হচ্ছে না। এখনও বেশিরভাগ মানুষ মনে করে নারীরা কি এমন কাজ করছে যে তাদের গণ্য করতে হবে? বরং সংসার, স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা না করে চাকরি করে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে। বাংলাদেশে এই রকম ধারণার ধারক নারী পুরুষের অভাব নেই। গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় নিহত কর্মীর বেশিরভাগই নারী। এই দুর্ঘটনাগুলো নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে দুনিয়াব্যাপী আলোচনা ও বিতর্কের ঝড় তুলেছে। কম নেই। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের কাজের স্বীকৃতি আদায় করা। ২০০০ সালে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের গৃহীত এমডিজির ৮টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে একটি অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন। নারীর ক্ষমতায়নে ও নারী শ্রমের মর্যাদা দিয়ে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিলে রাষ্ট্রীয় উন্নতিতে নারীর কর্মদক্ষতা প্রতিষ্ঠা পাবে। ঘরে বাইরে কর্মী নারীরা সমীহ পাবে। তাই নারীর কর্মের স্বীকৃতি অর্জনের অধিকার আদায়ের জন্য নারীকে আরও অগ্রগামী ও কৌশল পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

জাতিসংঘ জেন্ডার সমতা অর্জনের জন্য মানবাধিকারের ভিত্তিকে মূল শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। যুগ যুগ ধরে নারীর ওপর চলে আসা অমানবিক, একপেশে পারিবারিক ও সামাজিক নিয়মের দম্ভকে নির্মূল করে নারীর অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বের সঙ্গে কয়েকটি ক্ষেত্রকে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে স্থির করেছে।

প্রথমত, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা মারাত্মক আকারের। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে গ্রামগঞ্জ শহরে নারীর প্রতি করা নির্যাতনের খবর থাকে। আমাদের নিজেদের এবং পুরুষদেরও বুঝতে হবে নারীরা মানুষ। তারা কেবল ভোগ, জোর, উর্বর শস্যক্ষেত, সন্তান জন্মের আধার নয়। নারীরাও বুদ্ধি দীপ্ত কর্মপটু মানুষ। সুতরাং তাদের প্রতি বন্ধুর মতো সমর্থনের হাত প্রসারিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান সুযোগ, সম্পদ ও দায়িত্ব থাকা প্রয়োজন যাতে করে সমতার নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। সে ক্ষেত্রে নতুন করে জরুরী পদক্ষেপ নিয়ে এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ, জমি এবং ঋণ সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যৌন ও প্রজন্ম স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ ও মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং সমমজুরি নারী ও পুরুষ উভয়েই কর্মক্ষেত্র ও বাড়িতে যাতে সমান অধিকার ভোগ করতে পারে। এছাড়া সন্তানের দেখাশোনার জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

অত্যন্ত সময়োপযোগী ‘জেন্ডার, ডাইভারসিটি এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ। এতে সহায়তা করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ, ইউএসএআইডি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, কেয়ারসহ বিভিন্ন সংস্থা। গেল রোববার ছিল জেন্ডার ও উন্নয়নবিষয়ক ‘জেন্ডার, ডাইভারসিটি এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষ দিন। সমাপ্তি দিনের আলোচনায় আলোচকরা পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে স্বীকার করে পুরুষের পাশাপাশি নারীর শারীরিক ও মানসিক শ্রমদানের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। আলোচনায় নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাদের পাশে পুরুষকেও শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, নারীর অধিকার আদায়ে শুধু নারীকে একা সংগ্রাম করলেই হবে না, এ ক্ষেত্রে পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আ ই ম গোলাম কিবরিয়া স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘আমি পুরুষ। তবে আমি পুরুষের পক্ষে নই। আমি নারীর পক্ষে’।

এই আয়োজনের শেষ পর্বে সভাপতিত্ব করেন উইমেন এ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান তানিয়া হক। সমাপনী অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো রওনক জাহান বলেন, কয়েক দিন আগেই জাতীয় সংসদের একজন পুরুষ সাংসদ পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে একটি আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। এর মানে কি নারীদের জাগরণে পুরুষরা পরশ্রীকাতর হয়ে পড়েছেন? সে ক্ষেত্রে নারীকে তার অধিকার আদায়ে সংগ্রামী ও সুসংগঠিত হতে হবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর শ্রমের কোন মূল্য দেয়া হয় না। নারীর কাজের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন নেই। আর এর ফলেই নারীর ওপর নির্যাতন কমছে না। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, নারীর ক্ষমতায়নে এবং সমতা সৃষ্টিতে নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরও সহযোগী সমর্থক ও বন্ধু হিসেবে নিয়ে আগামীর পথ চলতে হবে।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: