মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘ক্ষমতায়ন কোন মানবিক দর্শন নয়’

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • ...সেলিনা হোসেন

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে? ক্ষমতায়নের দিক থেকে নারীদের এ অগ্রযাত্রাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন আপনি?

সেলিনা হোসেন : বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তো আছেই, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ক্ষমতায় নারীরা অগ্রগামী ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের সরকার প্রধান নারী, বিরোধী দলের নেতা নারী, একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী, স্পীকার নারী এবং সম্প্রতি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন নারী। এর বাইরেও আমি সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের অবস্থান দেখতে পাই। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি পেশাতেও নারীরা অনেক এগিয়ে এসেছেন। তার চেয়েও বড় কথা, গার্মেন্টস শ্রমিকের মধ্যে নারীদের যে অবস্থান, দেশের অর্থনীতিতে তারা যে প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, এটাও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, নারীদের এ অর্জনের পাশাপাশি নারীর প্রতি নির্যাতন-সহিংসতা, সমতার জায়গা তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের অবরোধ করে রাখার পুরুষদের যে আচরণ প্রবল হয়ে আছে, তা বলতেই হবে।

তারপরেও তো আগের তুলনায় অনেকখানি বদলেছে বলা যায়...

সেলিনা হোসেন : আমরা পাঁচজন, দশজন, একশ জন, পাঁচশ জন দিয়ে তো বিচার করতে পারি না যে, নারীর অবস্থান অনেক বড়ভাবে বদলে গেছে। ষোলো কোটি মানুষের যদি অর্ধেকও নারী হয়, নারীর অবস্থান এখনও সেভাবে আসেনি। এখন পারিবারিক নির্যাতন একটা বড় পর্যায়ে আছে। যৌতুকের নামে এখনও বাল্যবিয়ে হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যে তারা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেÑ তা বলা যাবে না।

শিক্ষার ক্ষেত্রে?

সেলিনা হোসেন : নারীদের শিক্ষার যে হার তাও সন্তোষজনক নয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেরা ৫০ শতাংশ, মেয়েরা ৫০ শতাংশ নয়।

কেন এমনটা হচ্ছে বলে মনে হয়?

সেলিনা হোসেন : সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, স্বাধীনতার ৪৩ পরেও বেশ কয়েকটি মৌলবাদী-রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল আছে, যারা নারীদের পিছিয়ে দিতে চায়। তারা নারী-নীতির কেবল বিরোধিতাই করে ক্ষান্ত হয় না, বরং নারী-বিরোধী ফতোয়া জারি করে নারীদের পেছনে ঠেলে দিতে সবসময় সচেষ্ট থাকে। তারা এখনও নারীদের আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছে। সেসময় নারীদের জ্যান্ত কবর দেয়া হতো। এখন শারীরিকভাবে না হোক, মানসিকভাবে নারীদের স্বাধীনতাকে কবর দিতে চায় মৌলবাদীচক্র।

তা কি সম্ভব, কী বলেন?

সেলিনা হোসেন : না, তা আর সম্ভব নয়। আমাদের নারীরা যে পর্যায়ে উঠে এসেছে, সেখান থেকে তাদের আর পিছিয়ে ফেলা সম্ভব হবে না। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়েই নারীরা এগিয়ে যাবে। নারীরাই তাদের নিজের অবস্থান নিজেরা গড়ে তুলবে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নারীর ক্ষমতায়ন, মানবতার উন্নয়ন’। এ সম্পর্কে কিছু বলুন ...

সেলিনা হোসেন : এটি একটি দিবস মাত্র নয়। একটি দিন উদ্যাপন শেষে ঘরে ফেরার বিষয়ও নয়। নারী দিবস পালনের ঘোষণা যখন হয়েছে, তার থেকে একশ’ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখনও এ দিবস পালনের অর্থ, যে লক্ষ্য সামনে রেখে দিবসটি উদযাপন শুরু হয়েছিল, সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বিশ্বজুড়ে প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে এটি একটি কঠিন সত্য। বাংলাদেশে এ বছরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল : নারীর ক্ষমতায়ন মানবতার উন্নয়ন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে ক্ষমতায়ন কী? ক্ষমতায়ন নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনমান অর্জনের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ ব্যক্তির নিজ জীবন ব্যক্তি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, তা ঠিক করা। পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা। ক্ষমতায়ন ব্যক্তির ভেতরে আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করে, যার দ্বারা সে সমস্যা সমাধান করতে শেখে। পরমুখাপেক্ষী না হয়ে হয় স্বনির্ভর। এভাবে একজন নারী বা পুরুষ যখন জীবন জিজ্ঞাসায় মতামত গ্রহণে ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন মনে করা হয় তার ক্ষমতায়ন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতায়ন কার্যকর করার জন্য তিনটি পর্যায়কে বিবেচনা করা হয়। যেমন ব্যক্তিগত। এ পর্যায়ে বিবেচিত হয় ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্যরে ধারণা। অন্যটি সম্পর্ক। এ পর্যায়ে দেখা হয়, ব্যক্তির সম্পর্কযুক্ত ক্ষমতার সামর্থ্য। অর্থাৎ ব্যক্তি কতটা মধ্যস্থতাকারী ও অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারে কতটা সমর্থ। তৃতীয়টি সামষ্টিক। এ পর্যায়ে বিবেচিত হয় একসঙ্গে কাজ করার দক্ষতা। অর্থাৎ বড় আকারে প্রভাব বিস্তার ও তার ফল লাভের জন্য একসঙ্গে সক্রিয় থাকার সামর্থ্য। এ ক্ষেত্রগুলো বিবেচনা করে নির্ধারিত করা যায় ক্ষমতায়নের মাত্রা। এ ক্ষমতা অর্জন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে বেঁচে থাকার নানা ব্যবস্থা গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে কি-না, তা বুঝতে হলে দেখতে হয় সম্পদের ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি-না। সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নারী সক্ষম কিনা অর্থাৎ নারী নিজে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাে র ফল নারী ভোগ করতে পারছে কিনা। অর্থাৎ নারী সরাসরিভাবে উন্নয়নের সুফলভোগী কিনা।

নারীর ক্ষমতায়নকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমনÑ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক কর্মকাে র মূল ধারায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। এর পূর্ণ ব্যাখ্যায় বলা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন, অভিগম্যতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সামাজিক ক্ষমতায়ন বলতে নারীর অধিকার ভোগের বিষয়টি প্রথমে আসে। সমাজে নারী কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সে ভূমিকা পালনে তার ক্ষমতার চর্চা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়টি বোঝায়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো রাজনীতি চর্চায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সমতার জায়গা অর্জন কতটুকু নিশ্চিত, তা বোঝায়। এসব জায়গায় নারী বৈষম্যের শিকার বলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন একই অর্থে ব্যাখ্যা করা যায় না। সেজন্য ক্ষমতায়নের ধারণা পুরুষের জন্য এক রকম, নারীর জন্য অন্য রকম। নারীর ক্ষমতায়ন সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রধান দিক। একথা সবাই জানেন যে, ক্ষমতায়ন কোন মানবিক দর্শন নয়। নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি না হলে ক্ষমতায়নের অপব্যবহার ঘটে। সেটি যথেচ্ছাচারেও চলে যায়। তাই বলতে হয়, নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি বিকাশ ঘটুক নারীর শুভ চেতনার দীপ্তির। শুধু সেøাগানসর্বস্ব দিবস পালন যেন নারীকে নতুনভাবে পিছু ঠেলে না দেয়।

নারীর অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

সেলিনা হোসেন : মানুষের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে শিক্ষা। শিক্ষা ক্ষেত্রকেই আমি বেশি জোর দেব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত অগ্রগতি কখনই সম্ভব নয়।

নারী-পুরুষের সমতা কিভাবে আসতে পারে?

সেলিনা হোসেন : সমতার জায়গা? সেক্ষেত্রে পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শ্রদ্ধার সঙ্গে, ভালবাসার সঙ্গে, নারীদের মূল্যায়ন করার পরিসর বাড়াতে হবে। পুরুষরা যদি দমনপীড়নের মানসিকতা থেকে না বেরিয়ে আসে, তাহলে নারী-পুরুষের সমতা সম্ভব নয়। আমি মনে করি, নারীদের নিজের উন্নতির জন্য তো বটেই, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প নেই।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী ‘জেন্ডার, ডাইভার্সিটি এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এ বিষয়ে জানতে চাই।

সেলিনা হোসেন : এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বিশ্বের উন্নত দেশের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে; নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা গবেষকরা। এ ছাড়া এ দেশের গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, নারী আন্দোলনকর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবীসহ পাঁচ শতাধিক মানুষ অংশ নেন। এর ফলে পারস্পরিক জেন্ডার-বিষয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি তৃণমূল মানুষের মাঝে পৌঁছাতে হবে। যারা এতে অংশগ্রহণ করেছেন, তারা কীভাবে সেটি তুলে ধরবেন তার দেশের কাছে, মানুষের কাছেÑ তাই বিবেচ্য বিষয়। জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি বেশি হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: