কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চন্দ্রজয় স্রেফ গালগল্প

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • অনুবাদ : এনামুল হক

মানুষ কোনদিন চাঁদে যায়নি এবং এ সংক্রান্ত যেসব কাহিনী আছে সবই ভুয়া, বানোয়াট। বিগ ব্যাং-এর ঘটনা ঠিক নয়। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে না। বিবর্তন বলে কোনকিছু কস্মিনকালেও হয়নি। ভ্যাকসিনেশনের কারণে অটিজম হতে পারে। জিএমও খাদ্য বিপজ্জনক। এমনি কথার শেষ নেই।

বিজ্ঞান প্রযুক্তির দিক দিয়ে শীর্ষস্থানে থাকা আমেরিকার মতো দেশেও এমন মানুষের সংখ্যা বিপুল। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার।

বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য সম্পর্কে সংশয়-সন্দেহ নতুন কিছু নয়। সেই গ্যালিলিওর যুগ, কী তারও অনেক আগে থেকে এটা চলে আসছে। সমস্যা হলো, যে যুগে বিজ্ঞানের জয়জয়কার চলছে সে যুগেও বিজ্ঞান নিয়ে মানুষের সংশয়-অবিশ্বাস বাড়ছে। বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বেশকিছু মানুষ যেন কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। প্রতিষেধক টিকা শরীরে সুরক্ষা যোগায়Ñ এ তথ্য থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্যটি পর্যন্ত যাবতীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত এবং কখনও কখনও বা ক্ষিপ্ত বিরোধিতা গড়ে উঠছে। নিজস্ব সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং নিজস্ব গবেষণায় সমৃদ্ধ হয়ে এই সন্দেহবাদীরা বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। ফলে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে দেখা দিয়েছে সুতীব্র বিতর্ক। হালে এই বিতর্ক নিয়ে এত বেশি কথা হচ্ছে। বই-পুস্তক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও একাডেমিক সম্মেলনে এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে, ব্যাপারটা পপসঙ্গীতের জোয়ারের মতো রূপ ধারণ করেছে। স্কুলগুলোর পাঠ্যবইতে বলা হয়েছে যে, চাঁদে এ্যাপোলো মিশন ও মানুষ অবতরণের কাহিনীগুলো বানোয়াট ছাড়া আর কিছু নয়।

জিনেটিক খাদ্য (জিনেটিক্যালি মোডিফাইড অর্গানিজম বা জিএমও) সম্পর্কেও এমন এক বিরূপ ধারণা বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞদের জোর দাবিÑ এমন খাদ্য নিরাপদ। এটা নিরাপদ না হওয়ার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই। অথচ বহু আমেরিকান জিনেটিক খাদ্য সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে চলেছে এবং ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো ফ্রাঙ্কেনফুডের কথা প্রচার করছে। ৬৭ শতাংশ আমেরিকানের মতে এমন খাদ্য মানবদেহের জন্য বিপর্যয়কর।

১৩৮০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছিল বলে বিজ্ঞানের যে বহুল স্বীকৃত ব্যাখ্যা আছে সে ব্যাপারে বেশির ভাগ আমেরিকান (৫১ শতাংশ) সংশয় প্রকাশ করে। পৃথিবীর বয়স ৪৫০ কোটি বছরÑ বিজ্ঞানের এ হিসাব নিয়েও তারা যথেষ্ট সন্দিহান। আর এক-তৃতীয়াংশ আমেরিকান যারা সৃষ্টি রহস্যের ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী, তাদের মতে কালের শুরু থেকে বর্তমান রূপেই মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে। এদের বিশ্বাস পুরোদস্তুর ক্রিয়াশীল মানুষসহ এই গ্রহটা অনুর্ধ ১০ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল। কেনটাকির পিটার্সবার্গে এই মতের বিশ্বাসীদের একটি জাদুঘর আছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে, স্বর্গের উদ্যানে আদম ও হাওয়ার পাশাপাশি ডাইনোসরও বিচরণরত। অন্যদিকে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যানুযায়ী প্রাণের উৎপত্তি মাইক্রোব থেকে এবং কালক্রমে ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষসহ বিভিন্ন প্রজাতির আবির্ভাব। এ হিসেবে আধুনিক মানুষের প্রথম অভ্যুদয় ঘটে ২ লাখ বছর আগে অর্থাৎ ডাইনোসররা বিলুপ্ত হওয়ার সাড়ে ছয় কোটি বছর পরে।

ইবোলা ভাইরাস রোগীর শরীরের জলীয় অংশ যথাÑ রক্ত, ঘাম, মলমূত্র ও বমির সরাসরি সংস্পর্শেই কেবল ছড়িয়ে থাকে। এটা কোনক্রমেই বায়ুবাহিত নয় এবং ভবিষ্যতেও বায়ুবাহিত অতি ভয়ঙ্কর ধরনের প্লেগের রূপ ধারণ করার কোন সম্ভাবনাই নেই। ইন্টারনেট সার্চ করলে এমন অভিমত ভূরিভূরি মিলবে যে, ইবোলা ভাইরাস বায়ুবাহিত এবং আমাদের সবাইকে মেরে ফেলার ক্ষমতাসহ এই ভাইরাস অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী।

বিশ্বের শত শত বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্যানেল রিপোর্টেও আগের চেয়ে আরও জোরাল ও সুস্পষ্ট ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গত ১৩০ বছরে প্রায় দেড় ডিগ্রী বেড়েছে। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। অথচ সংশয়বাদীরা তা মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য এই যে, মুক্তবাজার ও শিল্পসমাজকে আক্রমণের জন্যই বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওকলাহোমার সিনেটর জেমস ইনহোফ তো আগেই বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একটা ভুয়া কথাÑ স্রেফ ভাঁওতা।

ফ্লুরাইড মেশানো পানি স্বাস্থ্যের জন্য যে উপকারী সেটা ষাটের দশকের প্রথমদিকেই পরিপূর্ণরূপে প্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্লুরাইড এক প্রকৃতিজাত খনিজ উপাদান, যা হাল্কামাত্রায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা হলে ব্যবহারকারীদের দাঁতের এনামেল মজবুত হয় এবং দাঁতের ক্ষয়রোধ করা যায়।

প্রথমদিকে মানুষ ফ্লুরাইড মেশানো পানি খেতে ভয় পেত। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে বলে ভাবত। কোন কোন মহল আবার ষড়যন্ত্র তত্ত্বও আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু আজ এতদিন পরেও যদি শোনা যায় যে, বিশ্বের অনেক মানুষই ফ্লুরাইড দেয়া পানি ভীতির চোখে দেখে এবং এর সুফলে অবিশ্বাস করে, তাহলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। আমেরিকার অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ওকলাহোমার পোর্টল্যান্ডের জনগণ খাবার পানিতে ফ্লুরাইড মিশাতে দেয় না। ২০১৩ সালে স্থানীয় কর্মকর্তারা ফ্লুরাইড মেশানোর উদ্যোগ নিলে জনগণের বাধার মুখে তা ভেস্তে যায়।

প্রতিষেধক টিকার ব্যাপারে আমেরিকানদের অনীহা ও সংশয় বাড়ছে। ৪৬টি অঙ্গরাজ্য ধর্মীয় কারণে এবং ১৯টি অঙ্গরাজ্য দার্শনিক কারণে টিকা থেকে অব্যাহতি নেয়ার সুযোগ দিয়ে থাকে। অনেকে বিশ্বাস করে টিকা দিলে অটিজম হতে পারে। সেটাও ঠিক নয়। এমন ভ্রান্ত ধারণা ও তা থেকে টিকাবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত এক সমীক্ষা রিপোর্টে সেখানে অতি প্রচলিত একটি টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক দেখানো হয়েছিল। সমীক্ষা রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছিল এবং ল্যানসেটও নিজেকে এর সংশ্রব থেকে সরিয়ে নেয়। সুতরাং বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলো সত্যই থেকে আছে। কোন ভ্রান্ত ধারণা বা অবিশ্বাস সেগুলোকে খ-াতে পারে না। লোকে মানুক আর না মানুক বিবর্তন প্রকৃতই ঘটেছে এবং এখনও ঘটে চলেছে। বিবর্তনকে বাদ দিয়ে জীববিজ্ঞানকে কল্পনা করা যায় না। তেমনিভাবে জলবায়ুরও পরিবর্তন ঘটছে। প্রতিষেধক টিকা মানবদেহের ক্ষতি করে না বরং জীবন বাঁচায়। এমনি বৈজ্ঞানিক সত্যের শেষ নেই।

কিন্তু তারপরও কেন এমন হচ্ছে? বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করার ঘটনা কেন বাড়ছে? আমাদের জীবনের সর্বত্র আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত বিস্তার হওয়ার পরও এটা ঘটতে পারছে কেন? এর একটা সম্ভাব্য জবাব হলো আমাদের জগতটা বাস্তব ও কাল্পনিক সব সমস্যায় এত বেশি পরিপূর্ণ যে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য টানা চাট্টিখানি কথা নয়।

তাছাড়া বিজ্ঞান আমাদের এমন সব সত্যের দিকে নিয়ে যায়, যা মাঝে-মধ্যে গলাধকরণ করা কঠিন। সপ্তদশ শতকের গোড়ারদিকে গ্যালিলিও বলেছিলেন যে, পৃথিবী স্থির না বরং নিজের অক্ষের উপর দাঁড়িয়ে সূর্যের চতুর্দিকে পাক খেয়ে চলেছে। বরং সূর্য যে উঠছে আর অস্ত যাচ্ছে তা তো দেখাই যায়। গ্যালিলিওর কী পরিণতি হয়েছিল সবাই জানেন।

দুই শতাব্দী পর চার্লস ডারউইন গ্যালিলিওর পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন, সমস্ত প্রাণের উৎপত্তি আদিমতম পূর্বপুরুষ এ্যামিবা থেকে। তাছাড়া আমরা মানুষরা বানর, তিমি, এমনকি গভীর সাগরের শামুক, অক্টোপাসদের নিকটাত্মীয়। সবকিছু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই চেহারা ধারণ করেছে। ডারউইনের এই বিবর্তনবাদ নিয়ে আজও অনেক লোক দারুণ সন্দেহ পোষণ করে। তেমনি সংশয় প্রকাশ করা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর এই ধারণা সম্পর্কে যে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নামে যে গ্যাসটি আমরা সর্বক্ষণ প্রশ্বাসের সঙ্গে বের করে দিচ্ছি এবং যে গ্যাস কিনা বায়ুম-লের ১ শতাংশের দশভাগের একভাগেরও কম, সেই গ্যাসের দ্বারা পৃথিবীর জলবায়ু প্রভাবিত হতে পারে। বিজ্ঞানের এসব ধারণাকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিগতভাবে মানলেও আমাদের অবচেতন মন স্বতলব্ধ ধারণাগুলোকেই আঁকড়ে থাকেÑ যেটাকে গবেষকরা বলেন সরল বিশ্বাস। আমরা যতই বিজ্ঞানের দিক দিয়ে শিক্ষিত হচ্ছি ততই আমরা এই সরল বিশ্বাসগুলোকে দমিয়ে রাখছি। কিন্তু সেগুলোকে কখনই সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করতে পারছি না। এ বিশ্বাসগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর লুকিয়ে থেকে অনবরত তাদের উপস্থিতি জানাতে থাকে। তাছাড়া বিজ্ঞানের আবেদন থাকে আমাদের যুক্তিবাদী মস্তিষ্কের প্রতি। অন্যদিকে আমাদের বিশ্বাসগুলো বহুলাংশে চালিত হয় আবেগ দিয়ে এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলো পুরনো বা পরিচিত ধ্যানধারণাকে আঁকড়ে ধরে থাকা। উপরন্তু স্থানীয় মূল্যবোধ ও স্থানীয় মত ও ধারণাগুলোর পিছুটানও বিজ্ঞানকে সর্বদা ভ-ুল করতে চায়। যতক্ষণ অবধি বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা আর সম্ভব হয় না ততক্ষণ এ চেষ্টা চলতেই থাকে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, এগুলোকে বাদ দিয়ে চলা কোনক্রমেই সম্ভব না। তারপরও বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার প্রবণতা বাড়ছে। বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে সত্যকে বের করে আনা, সেটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে যখন কোন সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেটাকে অস্বীকার বা অবিশ্বাস করা মূর্খতার পরিচায়ক। বিজ্ঞানে অবিশ্বাসীরা নিজেদের মূর্খ হিসেবেই বার বার প্রমাণিত করে চলেছে। সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: