মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বৈচিত্র্যময় নজরুল নাট্যোৎসব

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুন্ডু

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী যে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে কর্মবীর তার পুনর্নিদর্শন গত ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে কবি নজরুল ইসলামের রচিত নাটক এবং সাহিত্য আশ্রিত নাটক নিয়ে ‘১ম নজরুল নাট্যোৎসব ২০১৫’-এর সফল উৎযাপন। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং দুটি দলের প্রযোজিত মোট নাটক পাঁচটি। উৎসবের প্রথমদিন পরিবেশিত হয় নির্দেশক আরিফ হায়দার নির্দেশিত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ পরিবেশিত, নাট্যকার নজরুল ইসলাম রচিত নাটক ‘শিল্পী’। শিল্পীর মনোভূমে শিল্প উপকরণ এবং নির্মিত শিল্পের মধ্যকার টানাপোড়েন নিয়ে নাটকটি। দ্বিতীয় দিন মঞ্চায়ন হয় নিদের্শক আল জাবির নির্দেশিত কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের প্রযোজিত নাটক ‘সেতুবন্ধ’। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহমানতার পথে মানব সৃষ্টি বাঁধের কারণে বিপর্যস্ত জীবনযাত্রা নিয়ে নাটকটি। পর্দার ওপর ছায়া ফেলে, নেপথ্যে ওভার ভয়েজ এবং আবহ সৃজন করে এক সৃজনশীল প্রযোজনা উপহার হয়েছে এই নাট্যোৎসবে। দ্বিতীয় দিন অপর নাটকটি ছিল ফরহাদ জামান নির্দেশিত, লোক নাট্যদল (সিদ্বেশ্বরী) প্রযোজিত নাটক শিল্পী। উৎসবের শেষদিন প্রথমে রামিজ রাজু নির্দেশিত, প্রাঙ্গণেমোর প্রযোজিত, নজরুল ইসলামের নৃত্যনাট্য আলেয়া অবলম্বনে মঞ্চায়িত হয় নাটক ‘দ্রোহ প্রেম নারী’। জোর করে করায়ত্তর বিপরীতে সাবলীলভাবে কোন কিছু অর্জন করার মর্মার্থ নিয়ে নাটকটি। উৎসবের শেষদিনে সর্বশেষ প্রযোজনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রযোজিত, কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প ‘সাপুড়ে’ অবলম্বনে নাট্যরূপকার এবং নির্দেশক আনন জামান নির্দেশিত নাটক ‘রতি আরতির কাব্য’। অস্থির এ সময়ের চিত্তচঞ্চলতায় সব দেখা না হলেও রতি আরতির কাব্য দেখা হলো শুরু থেকে পুরোটাজুড়ে।

জীবনজুড়ে পরম সত্য শুভ কাজে দেরি করতে নেই আর অশুভ কাজে দ্রুত হতে নেই। রাজা রামচন্দ্র একটি পদ্মের অভাব পূরণ করতে নিজের নীল পদ্মের মতো চোখ উপড়াতে গেলেন, কারণ লঙ্কা থেকে সীতাকে উদ্ধারে বিলম্ব করবেন না বলে। অপর দিকে রাবন রাজা স্বর্গ-মর্তের সিঁড়ি নির্মাণ ফেলে ছুটলেন সীতাকে হরণ করতে যার পরিণাম লঙ্কার বিনাশ। অনেকটা সেভাবেই সাপুড়ে গল্পের জহর সাপের অবশিষ্ট একটি ছোবল খেলেই বিষ জয়ী হবে অর্থাৎ সাপের বিষ যেমনিভাবে সাপের ক্ষতি করে না ঠিক তেমনি কোন সাপের বিষই জহরের ক্ষতি করবে না। একশ’ ছোবলের লক্ষ্যমাত্রায় নিরানব্বই এর ঘরে যেয়ে জহর প্রেমে পরে চন্দনার। চন্দনা আবার প্রেমে পরে জহরের শিষ্য ঝুমরোর। কাম-প্রেম আর হিংসার দাবানলে দ্বগ্ধ জহর শেষ পর্যন্ত অভীষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছাতে পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয় আর সেখানেই শেষ হয় সাপুড়ে অবলম্বনে আনন জামানের নাট্যরূপে রতি আরতির কাব্য।

কাব্য করে না বললেও বেদের মেয়ে জোৎস্না চলচিত্রের পর এভারেই প্রথম সাপুড়ে জীবন মঞ্চে এলো আনন জামানের হাত ধরে। তাঁর চিরায়াত বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির আয়েশি কৌশল এবং মাটির রসাস্বাধনে নাট্য নির্মাণ প্রক্রিয়ায় মনোযোগ পুনঃ দৃষ্ট। তাল-লয়-সুরের একটা দোত্যনা, ভাসান যাত্রার ব্যঞ্জনা, শিশুতোষ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রাণান্তকর চেষ্টা, তুলনামূলক সস্তায় দামী পেশাকের ঝলক, সীমিত রিচুয়াল সরঞ্জাম নিয়ে আনন জামান মোটামুটি একটি লুপ্ত প্রায় যাপিত জীবনকে নগরের কেন্দ্রে তুলে ধরেছেন আন্তরিকভাবে। তবে দুটি বিষয় ভাববার। সাপুড়ে মানে যেমন রতি আরতির কাব্য না ঠিক তেমনি প্রেম মানে কাম না। হাজার বছরের বাংলা নাটকের শিকড়ের সন্ধান কথাটি বহুল উচ্চারণের কারণে যেমন এক দল নির্ধারিত বক্তার বক্তব্য একই রকম সবসময় ঠিক তেমনিভাবে রতি আরতির প্রাধন্য চলতে থাকলে অহম তমসার নাট্যকার তমসা ছড়িয়ে দিবেন চলমান থেকে ক্লাসিক সাহিত্যেও। দ্বিতীয়ত নয়টি আগুনের মশাল পর্দা ঘেরা মঞ্চে জ্বালানো কি খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল। একে জায়গা স্বল্প, তার ওপর বাচ্চা-বাচ্চা অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিধেয় সিল্কের পোশাক। প্রপসের অত্যাধিক বাড়াবাড়ির কারণে নিকট অতীতের সৃষ্ট ক্ষত মেলানোর প্রাক্কালে প্রপসের অত্যাধিক বাড়াবাড়ি কারোরই কাম্য নয়। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার যদি হয়ে থাকে নাটক তবে নাট্য নির্দেশকদের সমাজকে বুঝতে হবে। নির্দেশক আনন জামান নিঃসন্দেহে গ্রামীণজীবন, গ্রাম্যভাষা, লোকসংস্কৃতি পুনর্রুদ্ধারের একজন একনিষ্ট সেবক এবং সে কারণে সাপুড়ে গল্প নির্বাচন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে কিন্তু ঘর পোড়া গরু সিঁদুরের মেঘ দেখলেও যে ভয় পায় সে কথা ভাবলেন না কেন। এ রকম সীমিত কিন্তু প্রয়োজনীয় কিছু ভাবনা ভাবতে পারলেই যে প্রযোজনাটি আরও উৎকর্ষে পৌঁছায় তা কারও বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ জাতীয় খেলা ‘হাডুডু’র পাশাপাশি আমাদের জনজীবনে সাপ খেলা দেখাটাও কৌতূহলের এবং আনন্দে।

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: