কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

উৎপল দত্ত এক মহান অভিনয় শিল্পী

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

স্মরণ

নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোন আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়।’- সেই বিচিত্র নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত। পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ অবিভক্ত বাংলার বরিশালের কীর্তনখোলায়। বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা দত্ত। পড়াশোনা করেছেন শিলঙের এডমন্ডস স্কুল হয়ে কলকাতার সেন্ট লরেন্স, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৪৮-এ ইংরেজি অনার্স নিয়ে স্নাতক করেন তিনি। কলেজের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন উৎপল। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ইংরেজী অনার্সে তাঁর স্থান হয় পঞ্চম। স্কুল জীবনেই বাবা-মায়ের সঙ্গে পেশাদারী থিয়েটার দেখা শুরু এ মানুষটির। এবং প্রথম দর্শনেই প্রেম, যার উক্তি পাওয়া যায় পরবর্তীকালে তাঁর কথায়- ‘সেইসব মহৎ কারবার দেখে মনে হ’ল, আমার পক্ষে অভিনেতা ছাড়া আর কিছুই হবার নেই। আমার বয়স তখন তেরো।’

কলেজ জীবনেই অভিনয় শুরু করেন উৎপল দত্ত। ১৯৪৭ সালে নিকোলাই গোগোলের ‘ডায়মন্ড কাট্স্ ডায়মন্ড’ এবং মলিয়েরের ‘দ্য রোগারিজ অব স্ক্যাপাঁ’ দিয়েই তাঁর কলেজ জীবনের অভিনয় শুরু। নাটক দুটি প্রযোজনা করেছিল কলেজের ইংরেজী এ্যাকাডেমি এবং পরিচালনায় অধ্যাপক ফাদার উইভার। ক্রমশ উৎপল ও কলেজের কয়েকজন সহপাঠী মিলে গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল- ‘দি এ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ান্স্’। তাঁদের প্রথম উপস্থাপনা ‘রোমিও এ্যান্ড জুলিয়েট’ এবং ম্যাকবেথ নাটকের নির্বাচিত অংশ। সেই সময়েই, ১৯৪৭-এর অক্টোবরে, ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর ‘শেক্সপিয়ারিয়ানা’ নাট্যদল নিয়ে ভারত সফরে আসেন। কেন্ডালের আহ্বানে উৎপল যোগ দেন সফররত সেই নাট্যদলে। ১৯৪৭-এর অক্টোবর থেকে জানুয়ারি ১৯৪৮ পর্যন্ত শেক্সপিয়ারিয়ানা নাট্যদল কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে তাদের প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে। নাট্যমোদীরা অভিভূত হন। জেফ্রি কেন্ডালের দলে তখন নিয়মিত অভিনয় করেছেন তিনি। ইউরোপীয় থিয়েটার দলের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা উৎপলের নাট্যজীবনে ফেলেছিল বিশেষ প্রভাব। কেন্ডালের কাছেই শিখেছিলেন- There is no art without discipline and no discipline without sacrifice. তাঁর কাছেই উৎপল পেয়েছেন শেক্সপিয়ারের নাটক অভিনয় করার বিশেষ শিক্ষা। এ সময়েই কেন্ডাল-কন্যা জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের পরিচয়, অচিরেই যার উত্তরণ ঘটে প্রণয়ে। পরবর্তীকালে জেনিফারের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলে তীব্র কষ্ট উৎপলকে ঘিরে ধরে। সে দহনের রেশ ছিল আজীবন। জেনিফারের সম্পর্ক মনে রেখে একাধিক কবিতাও লিখেছেন এ নাট্যকার। সহধর্মিণী শোভা সেনের কথন অনুযায়ী, উৎপলের ছিল কবিতা, ছিল ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতি অথবা কোন তাৎক্ষণিক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম।

উৎপল দত্ত কেবল একজন অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখকই ছিলেন না, রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে তিনি ছিলেন বামপন্থী ও মার্কসবাদী। আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকার হিসেবে তাঁর স্থান সুনির্দিষ্ট। ১৯৪৭ সালে লিটল থিয়েটার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে শেক্সপিয়ার, বার্নাড শ, ক্লিফর্ড ওডেটস প্রমুখের নাটক ইংরেজীতে প্রযোজনা করতে করতেই সীমিত দর্শক সমাজের সীমাবদ্ধতায় বিব্র্রত হয়ে লিটল থিয়েটার গ্রুপকে (এলটিজি) বাংলা প্রযোজনার দিকে পরিচালিত করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই বৃহত্তর দর্শক সমাজের কাছে পৌঁছানোর আন্তরিক আগ্রহে গণনাট্য সংঘে ও রাজনৈতিক পথ-নাটিকার ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৫৯ সালে লিটল থিয়েটার গ্রুপ কর্তৃক মিনার্ভা থিয়েটার অধিগ্রহণ ও নিয়মিত নাট্যাভিনয়ের কর্মসূচী গ্রহণ এবং তাঁর পরিচালনায় তাঁরই লেখা ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘কল্লোল’ প্রভৃতি নাটকে রাজনৈতিক বোধ, আঙ্গিক প্রয়োগ নাটক ও নাট্যাভিনয়ের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গ্রুপ থিয়েটার অঙ্গনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয় এই শিল্পীকে। এছাড়া ১৯৭১ সালে পিপলস লিটল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করে ‘টিনের তলোয়ার’ নাটক তাঁর একটি বড় পদক্ষেপ। কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। কৌতুক চলচ্চিত্র গুড্ডি, গোলমাল ও শৌখিন-এ অভিনয় করেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় হীরক রাজার দেশে, জয় বাবা ফেলুনাথ এবং আগন্তুক সিনেমায় তাঁর অনন্য অভিনয়-প্রতিভা দেখেছেন বাংলার দর্শক। তাঁর বিখ্যাত নাটকের মধ্যে রয়েছে টিনের তলোয়ার, মানুষের অধিকার, মেঘ, রাইফেল, সীমান্ত, ঘুম নেই, মে দিবস, দ্বীপ, রাতের অতিথি, মধুচক্র, কল্লোল, সমাজতান্ত্রিক চাল, সমাধান ইত্যাদি। উৎপলের রাজনৈতিক নাটকগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় শ্রেণীচেতনা, ইতিহাস চেতনা ও মধ্যবিত্ত চেতনা। ‘টিনের তলোয়ার’, ‘রাতের অতিথি’, ‘ছায়ানট’, ‘সূর্যশিকার’, ‘মানুষের অধিকার’ প্রভৃতি নাটকে যেমন পাওয়া যায় শ্রেণী সচেতনতা, তেমনি ‘টোটা, ‘লাল দুর্গ’, ‘তিতুমীর’, ‘কল্লোল’, ‘দিল্লী চলো’, ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ প্রভৃতি নাটকের ইতিহাস চেতনা, ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারী ফৌজ’ প্রভৃতি নাটকের মধ্যবিত্ত চেতনা তাঁর নাটককে দেয় ভিন্নমাত্রা। নাটক, যাত্রাসহ বহু বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও ব্যাপক খ্যাতির অধিকারী হন উৎপল দত্ত। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে বিদ্যাসাগর (১৯৫০), মাইকেল মধুসূদন (১৯৫০), চৌরঙ্গী (১৯৬৮), ভুবন সোম (১৯৬৯), গুড্ডি (১৯৭১), ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭১), শ্রীমান পৃথ¦ীরাজ (১৯৭৩), ঠগিনী (১৯৭৪), যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪), কোরাস (১৯৭৪), পালংক (১৯৭৫), অমানুষ (১৯৭৫), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮), গোলমাল (১৯৭৯), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), আঙ্গুর (১৯৮২), পার (১৯৮৪), পথভোলা (১৯৮৬), আজ কা রবিনহুড (১৯৮৭), আগন্তুক (১৯৯১), পদ্মানদীর মাঝি (১৯৯৩) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেছেন তিনি। তাঁর পরিচালিত ছবি : মেঘ, ঘুম ভাঙার গান, ঝড়, বৈশাখী মেঘ, মা ইত্যাদি। তিনি নাট্যবিষয়ক বহু প্রবন্ধ ও একাধিক গ্রন্থের রচয়িতাও। বাংলায় অনুবাদ করেছেন বেশ কিছু বিদেশী ভাষার নাটক। ‘শেক্স্পিয়ারের সমাজ চেতনা’ তাঁর লেখা গুরুত্বপূর্ণ এক গ্রন্থ। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এপিক থিয়েটার নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন এবং দেশ-বিদেশের নাট্যবিষয়ক বহু সভা-সেমিনারেও অংশগ্রহণ করেছেন। নাট্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন দীনবন্ধু পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার। তবে পদ্মভূষণ উপাধি ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট কলকাতায় প্রয়াত হন এ মহান শিল্পী।

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: