আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কৃষ্ণা কাবেরীর ঘাতক জহিরকে ধরতে পুলিশী অভিযান

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫
  • স্বামী সীতাংশু ও মেয়ে অদ্বিতীয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক

আজাদ সুলায়মান ॥ ঘাতক পেশাদার খুনী নয়। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় ঘাতক যে কায়দায় কৃষ্ণা কাবেরীকে হত্যা, তার স্বামী ও দু’কন্যাকে জখমের পর আগুনের নাটক সাজিয়ে, নির্বিঘেœ হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে, সেটা পেশাদার খুনীদেরও হার মানিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের মোটিভও মোটামুটি পরিষ্কার। এখন পর্যন্ত ব্যবসায়িক লেনদেনের জের ধরেই এ নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের ধারণা। এদিকে, বুধবার এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাতে আসামি করা হয়েছে জহির আহমদকেই। পুলিশ ঘাতক জহিরকে গ্রেফতার করতে পারেনি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সীতাংশুর কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড। এর বাইরে আরও কোন কারণ আছে কি-না সেগুলো খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এ বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার জনকণ্ঠকে বলেন, টাকা-পয়সার বিরোধকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকা-। তবে আরও কোন কারণ আছে কি-না সেটা জানা যাবে আহতদের সঙ্গে কথা বলার পর। কিন্তু চিকিৎসকদের বিধি-নিষেধের কারণে আহতদের এ মুহূর্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না। তবে খুনী গৃহকর্তা সীতাংশুর ঘনিষ্ঠ। আর হত্যাকা-ও পরিকল্পিত।

মঙ্গলবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিজ বাসায় খুন হন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) উপপরিচালক সীতাংশু শেখর বিশ্বাসের স্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা কৃষ্ণা কাবেরী। তার স্বামীর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর অছিলায় ফুল, কেক ও মিষ্টি নিয়ে বাসায় ঢুকে ঘাতক জহির ফিল্মি কায়দায় হত্যা করে কাবেরীকে। মারাত্মক আঘাত করা হয় সীতাংশু শেখর বিশ্বাস, বড় মেয়ে শ্রাবণী বিশ্বাস শ্রুতি (১৪) ও ছোট মেয়ে অয়ত্রী বিশ্বাসকে (৮)।

একজন মাত্র ব্যক্তি কিভাবে একটি পরিবারের একজনকে হত্যার পর বাকিদেরও জখম করে চলে গেল, তা বিশ্বাস করতে পারছেন না ওই ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা। এ সম্পর্কে পাশের বাসিন্দা মাহবুব জনকণ্ঠকে জানান, ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে পরিবারসহ ভাড়া থাকেন সীতাংশু বিশ্বাস। ঘটনার সময় একজন গার্ড কর্তব্যরত ছিলেন। তবে রাত সাড়ে আটটার দিকে এসে জহিরুল ইসলাম পরিচয়দানকারী একজন দ্বিতীয় তলায় সীতাংশুর ফ্ল্যাটে যেতে চান। এ সময় ইন্টারকমে ফারুক সীতাংশুর সঙ্গে কথা বলেন। এরপরই তাকে ওপরে যেতে দেয়া হয়। তার আধঘণ্টা পর হঠাৎ ওই ব্যক্তিই আগুন আগুন বলে চিৎকার করতে করতে বের হয়ে যান। নিরাপত্তাকর্মীরা তখন মনে করে, হয়তো দমকল বাহিনীকে খবর দিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরই ফের চিৎকার ও কান্নার শব্দ। তখন উপরে ওঠার পর দেখা যায়, কাবেরীর লাশ। তার স্বামী সীতাংশুর মাথায় আঘাত আর দু’মেয়েও আহত। ঘরে আগুনে পোড়া সববস্তু।

এ বিষয়ে সীতাংশুর এক ঘনিষ্টজন বুধবার মহাখালী মেট্রোপলিটন হাসপাতালে এ নারকীয় হামলার বর্ণনা দিয়ে জানান, রাত তখন পৌনে নয়টা। ঘাতক শেয়ার ব্যবসায়ী জহির আহমেদ বাসায় আসেন। হাতে কেক, ফুল ও জুস। এগুলো আনার ব্যাখ্যাও দেন। বলেন জহির, স্যার কিছু দিন আগে আপনার জন্মদিন গেছে। আসতে পারিনি। তাই বিলম্বে হলেও আজ আসলাম। এ কথা বলেই তিনি সীতাংশু তার স্ত্রী কাবেরী ও দুই মেয়েকে ডেকে নিয়ে কেক খাওয়ান। আর শুধু জুস খাওয়ান সীতাংশুকে। কিছুক্ষণ পর কাবেরী দুই কন্যাকে নিয়ে বেডরুমে চলে আসেন। উনারা দুজন গল্প করতে থাকেন। তার কিছুক্ষণ পরই জহির সীতাংশুর বেডরুমে গিয়ে বলেন, স্যার পড়ে গেছেন।

এ কথা শুনে কাবেরী দ্রুত ড্রয়িং রুমের দিকে রওনা দিলে জহির হাতুড়ি দিয়ে তাকে পেছন থেকে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। জহির সাদা পাউডার ছিটিয়ে দেশলাই জ্বালিয়ে কাবেরীর পরনের শাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় বড় মেয়ে এগিয়ে গেলে জহির তাকেও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে গেলে সে হাত দিয়ে ঠেকায়। এতে তার বাঁ হাতের একটি আঙুল ভেঙে যায়। পরে জহির তার বোনকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। এ সময় সে বোনকে নিয়ে পাশের শোয়ার ঘরে ঢুকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। বিষয়টি সে ফোনে স্বজনদের জানায় এবং চিৎকার শুরু করে। এ সময় জহির বাসার মেন সুইচ বন্ধ করে পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য মতে, জহির চলে যাওয়ার পর বড় মেয়ের চিৎকারে বাড়ির বিভিন্ন তলার লোকজন ছুটে আসেন। কাবেরীসহ সবাইকে আসাদগেট সংলগ্ন কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে সীতাংশু ও দুই মেয়েকে নিয়ে যায় মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। আর রাত সোয়া দুটার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কৃষ্ণা কাবেরী মারা যান। চিকিৎসকেরা জানান, আগুনে কৃষ্ণার শরীরের ১৬ শতাংশ পুড়ে যায়।

পুলিশ জানায়, বাসার মেঝেতে সাদা পাউডার পড়ে ছিল। আগুনে বাসার সোফাসেট, টিভি, ফ্রিজ, আসবাবসহ বিভিন্ন মাল পুড়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে কোন দাহ্য পদার্থ ব্যবহৃত হয়েছে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই মোহাম্মদপুর থানায় সীতাংশু শেখর বিশ্বাসের ভাই সুধাংশু শেখর বিশ্বাস বাদী হয়ে থানায় এ মামলা দায়ের করেন। মামলায় সীতাংশু বিশ্বাসের ব্যবসায়িক পার্টনার জহিরুল ইসলাম পলাশকে আসামি করা হয়েছে। জহিরুলকে ধরতে রাতেই রাজধানী ও আশপাশের বেশকিছু এলাকায় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ অভিযানে নামে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুল ইসলাম বলেন, নৃশংস এ হত্যাকা-ের ঘটনার কারণ এখন পর্যন্ত ব্যবসায়িক বিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যবসায়িক অংশীদার জহিরুল ইসলামকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তাকে গ্রেফতারে রাজধানীর কয়েকটি এলাকা কেরানীগঞ্জ, সাভার, ও গাজীপুরের আশুলিয়ায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও অভিযানে নেমেছে। জহিরুলকে গ্রেফতার করতে পারলেই হত্যার মোটিভ বের হয়ে আসবে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, জুসের মধ্যে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ায় জহিরুল। পরে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এক পর্যায়ে সে মারা গেছে মনে করে কৌশলে সীতাংশু শেখরের স্ত্রী কাবেরীকে ডাকে। এ সময় তাকেও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। জহিরুলের হাত থেকে বাঁচতে চিৎকার করলে এগিয়ে আসে তার দুই মেয়ে শ্রুতি ও অয়ত্রী বিশ্বাস (অদ্বিতীয়া)। তাদেরও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে জহিরুল। পরে কাবেরীর গায়ের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দিলে তিনি মারাত্মক দগ্ধ হন। সে সময় ওই বাসার দারোয়ান দোতলায় গেলে কৌশলে জহিরুল বেরিয়ে যায়।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, আইসিইউতে থাকা সীতাংশু ও অদ্বিতীয়ার অবস্থা গুরুতর। কৃষ্ণা কাবেরী আদাবরে মিশন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। শ্রুতি মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ও অদ্বিতীয়া স্থানীয় গ্রীন হেরাল্ড স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কৃষ্ণার মৃত্যুর খবর তাঁর স্বামী ও সন্তানরা জানেন না।

সীতাংশুর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, জহির তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ। সেই এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে। জহির গুলশানের একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপক। সীতাংশু তাঁর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। ওই টাকা আত্মসাত করতেই জহির পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সপরিবারে সীতাংশুকে হত্যার জন্য হামলা ও গানপাউডার ছিটিয়ে বাসায় আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে সে পালিয়ে যায়। এখন কত টাকা আত্মসাত করেছে সেটা খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ দুটো ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর পুলিশ বাসাটিতে তালা দিয়েছে। ওই ফ্ল্যাটের এক মালিক জানান, আগতদের নাম-ঠিাকানা খাতায় নিবন্ধন করার নির্দেশ থাকলেও কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীরা তা মানে না। অনেক সময় যোগাযোগ না করে কেউ এলে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিরাপত্তা নিয়ে ফ্ল্যাট মালিক সমিতি বৈঠকে বসবে। জানতে চাইলে বাড়িটির তত্ত্বাবধানকারী আবদুর রহিম জানান, অতিথি এলে ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভেতরে পাঠানো হয়। আগুন লাগার খবরে নিরাপত্তাকর্মীরা ওপরে যাওয়ার সুযোগে খুনী পালিয়েছে। সীতাংশুর বাসায় কে এসেছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোমবার রাতে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী আতিক এ বিষয়ে বলতে পারবেন।

আগুনের বিষয়ে পুলিশের ধারণা, হয়তো হামলার সময় কেকের ওপর জ্বলতে থাকা মোমবাতির ওপর পড়ে যান নিহত কৃষ্ণা। এরপর তিনি আগুন থেকে বাঁচতে পুরো ঘরে ছোটাছুটি করতে থাকেন। এক সময় সোফায় বসার চেষ্টা করলে তাতেও আগুন ধরে পুরো ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে, কাবেরীকে কেন হত্যা করা হলো জানতে চাইলে ডিসি বিপ্লব সরকার জনকণ্ঠকে বলেনÑ মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেনের বিরোধ থেকেই এ ঘটনা। হতে পারে সীতাংশুকে মারতে গিয়ে বাকিদেরকেও আঘাত করা হয়েছে। এতে সীতাংশু সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পেলেও কাবেরী মারা যান। আর বাকিরা আহত হয়। হতে পারে এক এক করে সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা সময় ও পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে ঘাতক জহির আটক হলেই সব জানা যাবে। দ্রুতই সে আটক হয়ে যেতে পারে।

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: