কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাটের জিও-টেক্সটাইল ব্যবহার বাধ্যতামূলক হচ্ছে

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫
  • অবকাঠামো নির্মাণে

বিশেষ প্রতিনিধ্বি ॥ গ্রামীণ রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণ, নদীর পাড় সংরক্ষণ ও পাহাড় ধ্বংস রোধসহ সরকারি দফতরের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে পাটের জিও-টেক্সটাইলস ব্যবহার বাধ্যতামূলক হচ্ছে। আগামী অর্থবছর থেকে এই জিও টেক্সটাইল ব্যবহার শুরুর জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয় ও সড়ক ও জনপথের প্রতি এখনই প্রক্রিয়া শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।

বর্তমানে দেশের আভ্যন্তরীন বাজারে ১২ কোটি ৬৯ লাখ বর্গমিটার জুট জিও টেক্সটাইলের চাহিদা রয়েছে। যার আনুমানিক মুল্য প্রায় ৬৬৫ কোটি টাকা। বর্তমানে এই চাহিদা সিনথেটিক জিও টেক্সটাইলের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। সিনথেটিকের পরিবর্তে জুট জিও-টেক্সটাইলের ব্যবহার শুরু হলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জুট মিলগুলোর উৎপাদনেও কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পাবে।

পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণ করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা বুধবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মিজা আজম। তিনি বলেন, পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে আগামী জুলাই থেকে অবকাঠামো নির্মাণে পাটের জিও-টেক্সটাইল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

মির্জা আজম বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু বিভাগ, রেলওয়ে এবং সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন নির্মিত গ্রামীণ রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণ, নদীর পাড় সংরক্ষণ ও পাহাড় ধ্বংসরোধসহ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে পাটের জিও-টেক্সটাইলসের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে সুপারিশ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারিভাবে যাতে এই জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করা যায় সেজন্য দরপত্রের সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করতে এখনই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর এবং জেলা পর্যায়ে অনুরোধ করছি’।

পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল সংস্থা ও সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমানে নদীর পাড় রক্ষা, পাহাড় ধস বন্ধ ও সড়ক নির্মানে সিনথেটিক জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত জিও টেক্সটাইলের মান ভাল হলে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন করলে আমরা এই জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করতে পারব। তবে চাহিদা মতো জুট জিও টেক্সটাইল পাওয়া যাবে কিনা সে বিষয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন।

এ সময় জুট মিল মালিকরা বলেন, বর্তমানে বিজেএমসির লতিফ বাওয়ানি জুট মিল, করিম জুট মিল, ইউএমসি জুট মিল এবং বেসরকারি খাতের জনতা জুট মিল পাটের জিও টেক্সটাইল উৎপাদন করে দেশের চাহিদা পূরণ ও বিদেশে রফতানি করছে। দেশে এর চাহিদা বাড়লে মিলগুলোর তা সরবরাহ করতে সক্ষম। বিদ্যমান জুট মিলগুলোর সে ক্ষমতা আছে।

দেশে উৎপাদিত জুট জিও টেক্সটাইলের মান সম্পর্কে বুয়েটের গবেষকরা জানান, কমন ফান্ড ফর কমোডিটিজের অর্থায়নে পরিচালিত এক মাল্টি-কান্ট্রি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে মোট ১৪টি ফিল্ড ট্রায়াল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এগুলোর ফল ভাল। এতে বুঝা যায়, দেশে উৎপাদিত জিও-টেক্সটাইলের মান ভাল। ইতোমধ্যে মান নির্ধারনের জন্য বিএসটিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশে জুট জিও-টেক্সটাইলের মান নির্ধারণ হয়ে যাবে।

সভায় বুয়েটের গবেষকরা পাটের জিও টেক্সটাইল ব্যবহার বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের জিও টেক্সটাইল উন্নত মানের। অথচ প্রতি বর্গমিটার জিও টেক্সটাইলের দাম পড়ে ৫৬ থেকে ৫৮ টাকা এবং ৭০ থেকে ৮০ টাকা। অথচ এক বর্গমিটার সিনথেটিক জিও-টেক্সটাইলের দাম পড়ে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। সিনথেটিকের সমস্যা হলো এটি পরিবেশ বান্ধব নয় এবং একশ বছরেও এটি মাটির সঙ্গে মিশে না। অথচ জুট জিও-টেক্সটাইল খুব দ্রুত পাচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। যা পরিবেশ বান্ধবন। এটি ব্যবহার করলে পাঁচ বছরের মধ্যেই তা মাটির স্তর তৈরি করে ফেলে। সিনথেটিরেক চেয়ে এর দক্ষতা কোন অংশে কম নয়।

তারা বিভিন্ন ফিল্ডে জুট জিও টেক্সটাইল ব্যবহারে সফলতা তুলে ধরেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হাতির ঝিল প্রকল্প। এ প্রকল্পের পুরোটাতেই জুট জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়েছে।

বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার টন জুট জিও টেক্সটাইল বিদেশে রফতানি হচ্ছে। অথচ দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে এর ব্যবহার চালু হলে বিদেশে আরও রফতানি বাড়বে। আমরা নিজেরা ব্যবহার করলে তখন আমরা বিদেশীদের বলতে পারব তোমরাও ব্যবহার করো।’

এ সময় বস্ত্র ও পাট সচিব ফরিদ উদ্দীন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, দেশে ব্যবহার শুরু করতে হলে এটিকে সিডিউলভূক্ত আইটেম হিসাবে অনুমোদন করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। শিপার্স কাউন্সিল অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, দেশে ব্যবহার বাড়লে বিদেশীরাও তখন পরিবেশ বান্ধব পাটের জিও টেক্সটাইল ব্যবহারে এগিয়ে আসবে। তবে দেশে উৎপাদন বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সমস্যা দূর করতে হবে। কমাতে হবে সুদের হার। পাটকে কৃষি পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সভায় দেশে উৎপাদিত বহুমুখী পাট পণ্যগুলো প্রদর্শনের জন্য একটি বড় ধরণের প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ব্যাপারে পাট প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাটপণ্যের প্রদর্শনীর জন্য বিজেএমসির উদ্যোগে একটি নিজস্ব প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া পাটজাত পণ্য যেন ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা যায় সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের য্গ্মু সচিব নাসিমা বেগম আলোচনার সূত্রপাত করে বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। পাট ও পাটজাত পণ্য পরিবেশ বান্ধব। বিশ্বের অনেক দেশ সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বহুমুখী পাট পণ্যের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে।

জুট-জিও-টেক্সটাইল পণ্যটি সম্পূর্ণ পাট দ্বারা তৈরি এক ধরনের কাপড়। পরিবেশবান্ধব এই কাপড় রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড় ভাঙ্গন এবং পাহাড় ধস রোধে ব্যবহার করা হয়।

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: