মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মনোজগতে মুক্তিযুদ্ধের আধিপত্য না থাকলে দেশবোধের সৃষ্টি হবে কিভাবে?

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫
  • ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন
  • মুনতাসীর মামুন

গত দু’বছর নির্দিষ্ট দিনে টেলিভিশনে দেখা যায় ক্ষুদে ছাত্রছাত্রীরা বিপুলভাবে আনন্দ করছে। তিনটি দিন এ দৃশ্য দেখি। পঞ্চম, অষ্টম শ্রেণী ও এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। এবার যুক্ত হলো ১ জানুয়ারি, যেদিন সারাদেশে ছাত্রছাত্রীরা পেল নতুন বই। গত সপ্তাহে দেখলাম, বয়সী মহিলারা সব ভুলে নাচছেন প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ করায়। এগুলো অতীব মনোহর দৃশ্য। এ সবকিছুই অভিনন্দনযোগ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাফল্য। এ সাফল্যের ভিত্তি কিছু উদ্ভাবনী শক্তির পরিচায়ক। কিছু রুটিন কাজ দক্ষতার সঙ্গে করা।

গত চার বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর একটি কারণ, মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তিনি যা করতে চেয়েছেন তা পেরেছেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোন সাফল্য নেই। ভিসিদের অপকর্মের খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। এর দশ ভাগ সত্য হলে লজ্জাকর। কারণ, ভিসির আগে তার পরিচয় একজন শিক্ষক। প্রায় যতজন ভিসি এ সরকার নিয়োগ করেছে, তাদের কেউ-ই ঔজ্জ্বল্য দেখাতে পারেননি, উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেননি; রুটিন কাজ করেছেন এবং সে কাজ করতে গিয়ে অপকর্ম করেছেন। ভিসি নিয়োগ খুব সম্ভব প্রধানমন্ত্রীই করেন, মাঝে অনেকে হস্তক্ষেপ করেন, এসব ক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে তাদের সুনাম থাকলেও তদবির হয় প্রচুর। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তারা মোটামুটি অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

পাঠ্যবই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া এই সরকারের বড় কৃতিত্ব। আগেও পাঠ্যবই পৌঁছাবার রীতি ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট দিন কেউ তা পারেননি। নাহিদ পেরেছেন এবং পরিধিও বাড়িয়েছেন। মাধ্যমিক, প্রাথমিক ও মাদ্রাসার সব ছাত্রছাত্রীকে বিনে পয়সায় পাঠ্যবই দেয়া হচ্ছে। একটি গরিব দেশে এটি অনেক বড় ব্যাপার। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই নির্দিষ্ট দিনে বই পেয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে। এ বছর ৩ কোটি ৬৮ লাখ ছাত্রছাত্রীর মাঝে ২৬ কোটি ১৭ লাখ বই পৌঁছে দেয়া হয়েছে। বই পৌঁছে দেয়া মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এ কাজটি এতদিন সুষ্ঠুভাবে করা যায়নি। এবার মন্ত্রণালয় পেরেছে, দক্ষতা দেখিয়েছে, নিজের কাজ সুষ্ঠুভাবে সমাপন করেছে। একজন মন্ত্রী যথাযথভাবে তা করেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্ভাবনী কাজের মধ্যে দুটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ- একটি পঞ্চম শ্রেণী ও অন্যটি অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা। ফলে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছার আগে দুটি সার্টিফিকেট পাচ্ছে এবং ঝরে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমেছে এবং কতভাগ হ্রাস পাচ্ছে তারও একটি হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে মাধ্যমিকে পাসের হার বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল ৬৭.৪১, এ বছর তা দাঁড়িয়েছে ৮৬.৩২ ভাগে [ডেইলি স্টার ৭.১.১২]। গত ছয় বছরে ১৬১২টি স্কুলকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।

সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব রেজিস্ট্রিকৃত প্রাইমারি স্কুলের জাতীয়করণ। প্রায় ৪০ বছর পর ২৬,২৮৪টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এসব স্কুলের শিক্ষকরা এখন নির্দিষ্ট দিনে বেতন পাবেন, ক্লাসের শিক্ষকতায় আরও মনোযোগী হবেন। সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে প্রায় কয়েক লাখ প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হবেন।

এতসব সাফল্য সত্ত্বেও একটি প্রশ্ন শুধু আমার নয়, অনেকের মনেই জাগছেÑ শিক্ষাক্ষেত্রে এ বিনিয়োগ কি দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা মানবিক বা সমাজবিজ্ঞান অনুষদে যেসব ছাত্রছাত্রী পাই, তারা এত দুর্বল কেন? বিজ্ঞান বা বাণিজ্য অনুষদে আমি পড়াই না, ফলে সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারব না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা ছাত্ররা পড়তে আসে। তারা যদি দুর্বল হয়, তা হলে অন্য বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে কী অবস্থা? শুধু তাই নয়, তাদের জগত দেশ সম্পর্কে কৌতূহল কম, মনোজগতে প্রগতির আধিপত্য কম। প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে যদি ছাত্রের ভিত্তি শক্ত হয়, তা হলে উচ্চপর্যায়ে অবস্থা কেন এমন?

গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুব ভাল নয়। অবকাঠামো দুর্বল, শিক্ষকদের মান সবক্ষেত্রে যথাযথ এমন বলা যাবে না। প্রাথমিক শিক্ষকরা সবাই কি যথাযথ প্রশিক্ষণ পান? প্রাথমিক স্কুলগুলো মনিটরিং ঠিকমতো করা হয় বলে মনে হয় না। আমি অনেক এলাকায় স্কুল দেখেছি, ছাত্র বা শিক্ষকের উপস্থিতি তেমন নজরে পড়েনি। উপজেলা শিক্ষা অফিসার সব জায়গায় আছেন। তিনি তার কাজ নিয়মিত করেন কিনা সন্দেহ। উপজেলা পর্যায়ে সবকিছুর ওপর কেন্দ্রের প্রতিনিধির যথাযথ কর্তৃত্ব নেই।

মাধ্যমিক স্কুলগুলোর অবস্থা ভাল, কিন্তু কলেজগুলোর অবস্থা, বিশেষ করে বেসরকারী কলেজের অবস্থা শোচনীয়। আমি আমার উপজেলার সবচেয়ে বড় কলেজের গবর্নিং বডির দায়িত্ব পেয়ে দেখি, কলেজের অবকাঠামো বলতে কিছু নেই। ক্লাসরুমের দরজা-জানালা নেই। শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। ছাত্রছাত্রীদের অবস্থাও তথৈবচ। সরকার শিক্ষকদের প্রতি মাসের বেতন দেয়। ছাত্র বেতন থেকে পুরনো বেতন শোধ করতে হয়। এ শোধ কতদিনে শেষ হবে বলা যায় না। এসব দেখার দায়িত্ব অবশ্য গবর্নিং বডির। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই নজরদারি আছে। সরকারী কলেজের অবকাঠামো ভাল। কিন্তু শিক্ষক স্বল্পতা চোখে পড়ার মতো। যেসব কলেজে স্নাতক সম্মান কোর্স আছে সেগুলোতে পড়াবার মতো পর্যন্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষকদের একটা বড় অংশ প্রেষণে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত। এ বিষয়টি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। যারা শিক্ষা প্রশাসনে যাবেন তাদের জন্য আলাদা ক্যাডার হবে কিনা, সেটাও ভাবা দরকার। কলেজ শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন জরুরী হয়ে পড়েছে। আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু মনে হয়েছে কলেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

পাসের হার বাড়ছে দেখে তাই খুশি হওয়ার কিছু নেই। পাসের হার বাড়ানো যেতে পারে, কমানোও যেতে পারে। আমি সে বিতর্কে যাব না। কিন্তু এত জিপিএ-৫ ছাত্রছাত্রীরা কেন ওপরে উঠার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে?

এবার নিজেদের অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে হয়। আমরা স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করে প্রায় এক নৈরাজ্যমূলক অবস্থার সৃষ্টি করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় আইনগুলো নিয়ে আবার ভাববার সময় এসেছে। ছাত্র ভর্তির যে পদ্ধতি আমরা এখন ব্যবহার করছি তাতেও বোধ হয় ভুল আছে। যে ছাত্র যে বিষয় পড়তে চায় খুব কম ক্ষেত্রেই সে তা পড়তে পারছে। ফলে ক্লাসে আমরা অনিচ্ছুক ছাত্র পাচ্ছি। তার ওপর এখন কলা ও মানবিকে মাদ্রাসা পাস করে আসা ছাত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে সেক্যুলার কলেজ থেকে পাস করা ছাত্ররা মার খাচ্ছে। মাদ্রাসা থেকে সরাসরি যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে তারা এক নতুন জগতে প্রবেশ করে, যেখানে তার খাপ খাওয়ানো কঠিন। এ অবস্থা কেন হচ্ছে? কারণ, মাদ্রাসায় প্রতিটি পর্যায়ে ছাত্রদের অধিক নম্বর দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে প্রাপ্ত নম্বরের গড় করা হয়। তাতে মাদ্রাসা জিতে যায়। অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের মাদ্রাসায় পরিণত হয়ে যাবে।

॥ ২ ॥

কী অবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রের তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা প্রদান করলাম মাত্র। মাদ্রাসার কথা আর তুললাম না। আরও অনেক ‘ব্যবস্থা’র কথা অনুক্ত থেকে গেল। যে দেশে প্রায় একডজন শিক্ষাধারা প্রচলিত সে দেশে শিক্ষানীতি বা ধারা নিয়ে আলোচনা খুব একটা এগোবে না।

মূল কথা যা বলতে চেয়েছিলাম তা হলো, সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত ফল আসছে না। আমি বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অধিকাংশের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা নিতান্ত কম। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রদের অনার্স মৌখিক পরীক্ষার সময় দেখেছি বাংলাদেশ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞানও তার নেই। অনেক ছাত্রকে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। ধারণা নিতান্ত ক্ষীণ। খবরের কাগজের সঙ্গে অধিকাংশের যোগাযোগ নেই। সরকার প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে বটে, কিন্তু জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য কত শতাংশ তা ব্যবহার করছে?

আমরাও ছাত্র ছিলাম এবং ঔপনিবেশিক যুগে। আমাদের বাবা-চাচাদের অনেকে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান দুই আমলেই পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু নিজেদের দেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা সমৃদ্ধ ছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গেও যোগ ছিল। আমরা পাকিস্তান আমলে বড় হয়েছি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পাকিস্তানী তমদ্দুন সম্পর্কে আমরা পাঠ্যবইয়ে ভাল ধারণা পেয়েছি। কিন্তু আবার পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে ধারণা ছিল না। এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। ব্যবহারিক জীবনে বৈষম্যের ব্যাপারটি ছিল স্পষ্ট। ভাষা আন্দোলন সাংস্কৃতিক যে উজ্জীবনের সৃষ্টি করেছিল তার ধারাবাহিকতা ছিল ১৯৭১ পর্যন্ত।

সব আমলেই পাঠ্যবইয়ের মারফতই মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। ভারতবর্ষে, আগেই লিখেছি, সিভিলিয়ানরা ভারতবর্ষ সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করেছেন। লিখেছেন, কিন্তু মূল লক্ষ্য ছিল সমাজে বিভক্তিকরণ, ব্রিটিশদের আলোর দূত হিসেবে প্রতিভাত করা। ঔপনিবেশিক শাসকদের মনোভঙ্গি সঞ্চারিত করা হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও। কালীপ্রসন্নের ভারতবর্ষের ইতিহাসের কথা ধরা যায়। ১৯০৯ সালে ৩৮৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল ম্যাকমিলান এ্যান্ড কোম্পানি।

বইটিকে কালীপ্রসন্ন ভাগ করেছিলেন তিন ভাগে। হিন্দু ও মুসলমান রাজত্ব, ইংরেজ রাজত্ব ও আসাম বিভাগ। পূর্ববঙ্গ ও আসাম বিভাগ আলাদা প্রদেশ বিধায় শেষোক্তটির সংযোজন।

এ বইয়ে তার ভাষা সহজ-সরল। সুখপাঠ্য। গুরুত্বারোপ করেছিলেন তিনি বেশি হিন্দু আমলের ওপর, যার শুরু ‘আর্য্য জাতি’ দিয়ে এবং হিন্দুরা যে আর্যদেরই বংশধর তাও তিনি প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। হিন্দু আমলের প্রতিটি যুগকে বর্ণনা করেছেন তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। এমনকি বাদ দেননি রাজনীতি বা পঞ্চপাণ্ডবের উপাখ্যানও। জাতিভেদ কিভাবে প্রচলিত ছিল হিন্দুদের মধ্যে তা উল্লেখ করে জাতিভেদকে উল্লেখ করেছেন ‘মহতী জাতিভেদ পদ্ধতি’ বলে [পৃ. : ৩১]

পুরো ‘মুসলমান যুগটি’ সত্যদিকে বর্ণিত হয়েছে, কমবেশি বিশৃঙ্খল ও যুদ্ধপূর্ণ অশান্তিময় যুগ হিসেবে। ভারতবর্ষের মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধুতে অবতরণ দিয়ে শুরু হয়নি, বরং শুরু হয়েছে ‘দেব বিগ্রহ ভঞ্জক গজনীর মহাম্মদ’-কে দিয়ে [পৃ. ৯৩]। ঐ আমলে দেশের অবস্থা কী ছিল তার একটি বর্ণনা-

“...এই হেতু যাহার ঘরে টাকাকৌড়ি অথবা মণিরতœ সঞ্চিত ছিল সেই পাছে কোনো সৈন্য সামন্ত সন্ধান পাইয়া বলপূর্বক উহা কাড়িয়া লইয়া যায়। এই মাটির নীচে গর্ত করিয়া ওই সকল ধনরতœ লুকাইয়া রাখিত। আমাদিগকে এই বর্তমান যুগে চারিদিকে সর্বপ্রকারে শান্তি বিরাজমান। পাঠান রাজদিগের সময়ে হিন্দুস্থানের যে কি ভয়ঙ্কর অবস্থা ঘটিয়াছিল, আমরা তাহা কল্পনা করিতেও সমর্থ নহি, পুরাতন হিন্দুদের মন্দিরের অধিকাংশ বিশ্বস্ত ও উন্মিলিত হইয়াছিল। পাঠানদিগের মধ্যে যাহারা সুলোক বলিয়া প্রসিদ্ধ তাঁহারাও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর ছিলেন এবং হিন্দুকে বলপূর্বক মুসলমান করা ও যাহারা কিছুতেই মুসলমান হইতে সম্মত নহে তাহাদিগকে হত্যা করা, আপনাদিগের অবশ্য করণীয় কর্তব্যের এক অঙ্গ বলিয়া জানিতেন। গরীব দুঃখী লোকেরা প্রাণ রক্ষার জন্য বনে জঙ্গলে পালাইয়া যাইত; সুতরাং বহু উর্ব্বর ক্ষেত্র বিনা চাষে পতিত পড়িয়া থাকিল। বহু সংখ্যক হিন্দু মুসলমান হইয়াছিল। কতেকে প্রাণ বাঁচাইবার জন্য মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল; অনেকে বিজেত্বদিগের শাসন কার্যালয়ে ও সৈন্যদলে স্থান পাইবার প্রলোভনে পড়িয়া মুসলমান হইয়াছিল। পাঠানদিগের কতিপয় প্রসিদ্ধ সেনাপতি মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হিন্দু।” [পৃ. ১০২-১০৩]

এর বিপরীতে দেখানো হয়েছিল ইংরেজ শাসনকে শৃঙ্খলাপূর্ণ হিসেবে। যেখানে সকলেই এক মহান নৃপতির আশ্রয়ে অবস্থিত এবং “একই মহতী ভারতীয় জাতির অন্তর্নিবিষ্ট।” [পৃ. ৩০৫] রানী ভিক্টোরিয়া সম্পর্কে লিখেছিলেন কালীপ্রসন্ন- “কোনো কালে কোনো রাজ্যে এমন লোক বৎসলা দয়াবতী রাণী কর্তৃক শাসিত হয় নাই। পৃথিবীর রাজ্যেশ্বরী রাণীকূলে মহারাণী ভিক্টোরিয়া শীর্ষস্থানীয়।” [পৃ. ৩৪৭]

এখনও আমরা ইতিহাসকে এই তিনপর্বে ভাগ করি। ব্রিটিশ যুগকে কিন্তু খ্রীস্টান যুগ বলি না। এ বৈপরিত্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঔপনিবেশিক কাঠামোয় প্রাধান্য বিস্তারকারী শ্রেণী, ঔপনিবেশিক শাসকের সমর্থনে চিন্তার ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারিত করেছিল সূক্ষ্মভাবে। ঔপনিবেশিক শাসকদের পক্ষে এ কাজটি করে দিতেন ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধিজীবীরা। ফলে শাসকদের আর বেগ পেতে হতো না ঔপনিবেশিক কাঠামো ঠিক রাখতে।

(পরবর্তী অংশ আগামী বৃহস্পতিবার)

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: