আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এশিয়ায় কেন স্মরণীয় লী কুয়ান

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
  • এনামুল হক

আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লী কুয়ান ইউ একদা মন্তব্য করেছিলেন, কেউ যদি তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক বলে মনে করে তাহলে তার মানসিক চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত। অথচ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাঁর মতো আর কোন ব্যক্তিত্ব বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে ‘রাষ্ট্রনায়ক’ বলে সম্মানসূচক সম্বোধন লাভ করেননি। কূটনীতির মঞ্চে তাঁর অসাধারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিচরণ, তাঁর প্রতিভাদীপ্ত বুদ্ধিমত্তা, তাঁর নির্মম বাস্তবতাবোধের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল। গত ২৩ মার্চ ৯১ বছর বয়সে প্রয়াত এই মানুষটি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকাকালে একটি দেশকে এক প্রজন্মের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের অবস্থান থেকে প্রথম বিশ্বের মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে সপ্রশংস উক্তি বর্ষিত হয়েছিল লী কুয়ান ইউ’র উপর। কিন্তু এশীয়রা বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা তাঁকে কি চোখে দেখেছে? বলাবাহুল্য তাদের কাছে লী কুয়ান ইউ’র ভাবমূর্তি অধিকতর জটিল।

১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেয়া হলে দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে প্রথমে খুব হতাশ ছিলেন লী। চীনা অধ্যুষিত এই দ্বীপ দেশটি তার তুলনায় ঢের বড় দুই মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে পড়ে গিয়েছিল। ভিয়েতনামে আমেরিকার অবস্থান উল্টে গেলে তার পরিণতি কি দাঁড়াবে, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

ম্যাকিয়াভেলীয় চিন্তার অনুসারী লী বিশ্বাস করতেন, নির্ভেজাল শক্তিই একটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু সেই শক্তি সিঙ্গাপুরের তেমন কিছুই ছিল না। তিনি আমেরিকাকে তাঁর দেশে ঘাঁটি গাড়তে দিয়েছিলেন। আবার এও আশা করেছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এটাকে চ্যালেঞ্জ করুক। ওদিকে তিনি আগে থেকে অনুমান করেছিলেন যে, চীনের উত্থান ঘটবে এবং দেশটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে তার পশ্চাদভূমি মনে করবে। তাই ১৯৬৭ সালে এশিয়ান গঠনকে প্রথমে খানিকটা সংশয়ের চোখে দেখেছিলেন লী। তবে এও বুঝেছিলেন যে, এতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করা তাঁর দেশের জন্য অপরিহার্য।

সমুদ্র এলাকা ও বিদেশী ঘাঁটি নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের কারণে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বিরোধ চলতেই থাকে। তবে ১৯৭৩ সালে প্রথম ইন্দোনেশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে লী দেশটার সঙ্গে এতই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন যে, তা ২০০৮ সালে সুহার্তোর মৃত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহম্মদের সঙ্গেও তিনি উষ্ণ ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

লীর স্বচ্ছ স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিভঙ্গি একের পর এক মার্কিন প্রশাসনকে বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধের যুগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার ও শুলজকে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৭৬ সালে তিনি চীন সফরে গিয়ে ব্যাপক সাড়া জাগান এবং এর দু’বছর পর সিঙ্গাপুরে স্বাগত জানান চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংকে। এসব ঘটেছিল এমন এক সময়ে যখন এশিয়ার বাকি দেশগুলো চীনের ভূমিকা নিয়ে নিদারুণ সন্দিগ্ধ ছিল। চীনকে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতি আরও সমঝোতা ও আপসমূলক মনোভাব নিতে রাজি করান। বৃহৎ শক্তিবর্গের কাছে আশিয়ান দেশগুলোর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লী যতটা তুলে ধরেছিলেন, ততটা আর কেউ পারেননি। এই অঞ্চলের ভবিষ্যত স্ট্র্যাটেজিক উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর স্থান কেউ কখনও নিতে পারবেন না বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আশিয়ান ছিল এশিয়ার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন ও আস্থা গড়ে তোলার জন্য আলোচনার ফোরামমাত্র। তা থেকে আশিয়ানকে আরও বলিষ্ঠ একটি সংস্থায় উন্নীত করতে লী কুয়ান ইউ মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। আশিয়ানের মধ্যে বাণিজ্য প্রসারের প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুক্তবাণিজ্য এলাকার ধারণাকে আরও এগিয়ে নেন। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সংশয় সন্দেহ ও কায়েমি স্বার্থ কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে, যার জন্য আশিয়ান মুক্তবাণিজ্য এলাকা কার্যকর হতে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত লেগে যায়।

লীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাইরের সাহায্য সহায়তা ছাড়া আশিয়ান তার নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য কখনই সামরিক দিক দিয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী বা সুসংহত হতে পারবে না। তাই তিনি পরাশক্তিদের এ অঞ্চলের সঙ্গে আলোচনায় নিয়োজিত রাখতে একটি কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৯০-এর দশকে আশিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের অভ্যুদয় ঘটে। তিনি বলেছিলেন, স্রেফ আলাপ-আলোচনার দ্বারা শক্তি বা ক্ষমতার বাস্তবতাকে পাল্টানো সম্ভব নয়। তবে এর দ্বারা সন্দেহ ও ভয়ভীতি লাঘব করা যেতে পারে এবং সেটাও এক বিশাল অর্জন। সোজা কথায়, এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি গড়ে তুলতে সুবিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন লী কুয়ান ইউ এবং সেজন্যই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দীর্ঘকাল ।

সূত্র : বিবিসি

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: