মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আশা-নিরাশার বিশ্বকাপে গর্বিত বাংলাদেশও

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
আশা-নিরাশার বিশ্বকাপে গর্বিত বাংলাদেশও
  • জাহিদুল আলম জয়

স্বপ্নপূরণ-স্বপ্নভঙ্গ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আশা-নিরাশার দোলাচলে শেষ হয়েছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ যজ্ঞ বিশ্বকাপ। আবারও বিশ্বসেরার মসনদ ফিরে পেয়েছে অদম্য, অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে হারলেও নিউজিল্যান্ড পেয়েছে তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সাফল্য। রান বন্যার বিশ্বকাপে হয়েছে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাফল্যও কোন অংশে কম নয়। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। যে কারণে গর্বিত লাল-সবুজের দেশের ১৬ কোটি মানুষও।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ দল গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বপ্ন নিয়ে। সেই দুরূহ স্বপ্নপূরণের পথে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালি দলকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে টাইগাররা। শেষ আটে ভারতের কাছে হারলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটবিশ্বকে আরেকবার দেখিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য। এবারের বিশ্বকাপে শুরুটা বেশ ভাল হয় বাংলাদেশ দলের। আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে হারিয়ে মিশন শুরু করে বাংলাদেশ। এ ম্যাচে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ৬৩ রানের ইনিংস খেলে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে চার হাজার রান করার গর্বিত মালিক বনে যান। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বৃষ্টির জন্য পরিত্যক্ত ম্যাচের সুবাদে ১ পয়েন্ট পেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায় টাইগাররা। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গেলেও এরপর স্কটল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ ৩১৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বাধিক রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড গড়ে মাশরাফির দল। বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহও এটি।

এরপর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ১৫ রানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ম্যাচে পেসার রুবেল হোসেনের দুর্দান্ত এক স্পেলে মুখ থুবড়ে পড়ে ইংলিশরা। ম্যাচের শুরুতেই নতুন দিগন্তের নিশানা দেখান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করার গৌরব দেখান। ১০৩ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩ উইকেটে হারলেও টাইগারদের পারফর্মেন্স প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। এ ম্যাচেও শতক হাঁকান মাহমুদুল্লাহ। বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় শতক তিনি ছাড়া করেছেন আর মাত্র ৮ ব্যাটসম্যান। ১২৮ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন তিনি। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে কী হয়েছে তা তো গোটাবিশ্বই দেখেছে। ভারতকে একপ্রকার ‘উপহার জয়’ দিয়েছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি!

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ স্কোর হয়েছে এবার। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪ উইকেটে ৩২২ রান বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ৯ উইকেটে ২৮৩ রান। ভারতের বিরুদ্ধে ২০১১ বিশ্বকাপে মিরপুরে এ রান করেছিল টাইগাররা। স্কটিশদের ৩১৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে যেয়ে রেকর্ড গড়েই জয় পায় বাংলাদেশ। এটি নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ড। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ পেয়েছে বেশ কয়েকজন তরুণের দুর্দান্ত পারফর্মেন্স। বিশ্বকাপের আগে সাব্বির রহমানের মাত্র পাঁচ ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। তাসকিন আহমেদের সেখানে তিন ওয়ানডে আর সৌম্য সরকারের মাত্র একটি। এই তিন তরুণ তুর্কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের চিনিয়েছেন বিশ্বকাপের মধ্য দিয়েই। সাব্বির ছয় ম্যাচে করেছেন ১৮২ রান। সৌম্য সমানসংখ্যক ম্যাচে ১৭৫ রান। অবশ্য এ পরিসংখ্যান থেকে তাদের প্রতিভার স্পষ্ট ধারণা মেলেন না। হয়ত তাঁদের ইনিংসগুলো বড় হয়নি, তবে ব্যতিক্রম আর সাহসী ব্যাটিংয়ে ছিল পরিণতের ছাপ, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বার্তা। ছয় ম্যাচে ৯ উইকেট নেয়া তাসকিন স্বভাবসূলভ আক্রমণাত্মক বোলিংয়ে কাঁপিয়েছেন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের।

চিত্রনায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপীর মামলায় বিশ্বকাপের ঠিক আগেই কারাগারে যেতে হয় বাংলাদেশের পেসার রুবেল হোসেনকে। কিন্তু বিশ্বকাপে খেলার জন্য জামিনে মুক্তি পান তিনি। আর বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চেই জ্বলে উঠেন রুবেল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৫৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখেন রুবেল হোসেন। যে কারণে দেশের মানুষের কাছে এখন ‘হিরো’ রুবেল। সবমিলিয়ে গর্ব করার মতো বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশেরও।

এবারের বিশ্বকাপে রাজত্ব ছিল ব্যাটসম্যানদের। রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছে। রানবন্যার বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির রেকর্ড হয়েছে। হয়েছে ব্যক্তিগত অসংখ্য রেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিগত ডাবল সেঞ্চুরির দেখা মিলেছে। ক্রিস গেইল ২১৫ রান করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে দ্বিশতক করার কৃতিত্ব দেখান। কিন্তু তার রেকর্ড দিনকয়েক পরেই ভেঙে দেন নিউজিল্যান্ডের ওপেনার মার্টিন গাপটিল। তিনি খেলেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। ২৩৭ রানে অপরাজিত থেকেছেন। শুধু তাই নয়, চারশ’কে ছাড়িয়ে যাওয়া দলীয় স্কোরেরও দেখা পেয়েছে একাদশতম আসর। এবারই প্রথম আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ৪১৭ রানের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়া। বাকি দুই সর্বোচ্চ স্কোর দক্ষিণ আফ্রিকার। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪১১/৪ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৪০৮/৫।

টেস্ট খেলারও অধিকার নেই। আইসিসির সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে হয়ত পরের বিশ্বকাপেও খেলতে পারবেন না। তবে নিজের প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন ঠিকই। ‘মিনোজ’দের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়ে সবাইকেই চমকে দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের জশ ডেভি। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়া অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক নিয়েছেন সর্বোচ্চ ২২ উইকেট। স্টিভেন স্মিথকে মানুষ চিনত ঠিকই, তবে এবারের বিশ্বকাপ তাঁকে নতুন করে পরিচিতি দিয়ে গেল। অস্ট্রেলিয়াকে পঞ্চমবার বিশ্বকাপ জেতানোর অন্যতম কারিগর এই স্মিথই। মোহাম্মদ সামিও ভারতীয় ক্রিকেটের তারকার আসন তৈরি করে নিলেন বিশ্বকাপের বাইশ গজেই। অসাধারণ পারফর্মেন্স উপহার দিয়ে জেমস ফকনার হয়ে গেলেন ফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ। এভাবেই বিশবকাপের মঞ্চে সরফরাজ আহম্মেদ, ওহাব রিয়াজ, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, রুবেল হোসেন, কেন উইলিয়ামসনের মতো তারকার জন্ম দেখা গেছে। এবারের বিশ্বকাপই ছিল অনেকের শেষ। শেষটাও রাজকীয়ভাবে করেছেন অনেকে। এক্ষেত্রে সবার আগে আসে ড্যানিয়েল ভেট্টরির নাম। দেড় বছর পর একদিনের ক্রিকেটে ফিরেই ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে ওঠেন ৩৬ বছর বয়সী এই নিউজিল্যান্ডের তারকা ক্রিকেটার। কম যাননি কুমার সাঙ্গাকারাও। ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে করেছেন বিশ্বকাপে টানা ৪ সেঞ্চুরির অবিস্বরণীয় কীর্তি। জয়াবর্ধনে-আফ্রিদিরা অবশ্য তেমন কিছু করতে পারেননি। কিন্তু বুড়ো মিসবাহ-উল-হক ঠিকই চমক উপহার দিয়েছেন ব্যাট হাতে। তবে বিদায়ী বিশ্বকাপ ও একদিনের ম্যাচে সেরা প্রাপ্তি বোধহয় মাইকেল ক্লার্কেরই! নেতা হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে অবসর নিয়েছেন তারকা এই ব্যাটসম্যান।

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: