আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সৌন্দর্য হারিয়েছে ক্রিকেট!

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
  • খন্দকার জামিল উদ্দিন

কখনও ভাবিনি বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে এমন শিরোনামের কোন লেখা লিখতে হবে। ফাইনাল শেষে সাধারণত আমরা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাই। মুগ্ধতার গল্প বলি। কিন্তু এবারের আসরে আমার যা কিছু ভাল লাগা ছিল তার সবকিছুই উড়ে গেছে ২৯ মার্চ মেলবোর্নের পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে। সোনা রঙের ট্রফিটা ক্লার্কের হাতে ওঠার আগে এক দুর্নীতিবাজের স্পর্শ পেয়েছে। সত্যি বলতে ওই দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপ নিয়ে আমার সব আনন্দই মাটি হয়ে যায়। কারণ ফাইনালটা নিয়ে মনে বাড়তি আকর্ষণ ছিল। আমার দেশের একজন ব্যক্তিত্বকে বিশ্বকাপের পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে উঠতে দেখব বলে অধির আগ্রহে ছিলাম। নিজ দেশের মানুষ বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠবেন, সত্যি বলতে এরচেয়ে গর্বের আর কিছু ছিল না। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের জন্যই বিষয়টা স্মরণীয় হয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু দিনটা স্মরণীয় না হয়ে ওল্টো যেন কালো দিন হয়ে থাকল। আমি নিশ্চিত এই আশা ভঙ্গে বেদনা কেবল আমার একার নয়, সারা বাঙালী জাতির। আর পুরো বিশ্বক্রিকেটের জন্যই বিষয়টি কলঙ্কের।

কথা ছিল বিশ্বকাপ শেষে নিজের মুগ্ধতা নিয়ে আজকের লেখাটা লিখব। কিন্তু এমন একটা নেক্কারজনক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কোন মুগ্ধতাই আর মনে দাগকাটা নেই। নিমিষেই যেন সব মুছে গেছে। তারপরও অল্প অল্প যা মনে আসছে সেখান থেকে বলি, সব মিলিয়ে এবারের টুর্নামেন্টটা উপভোগ্যই হয়েছে। যদিও কিছু ম্যাচ একপেশে ছিল। কোন কোন দলকে এবার চার শ’র উপরেও রান করতে দেখেছি। সাড়ে তিন শ’ রান চেজ করে কাউকে কাউকে জিততে দেখা গেছে। গাপটিল, গেইল, ডি ভিলিয়ার্স, সাঙ্গাকারাদের দুর্দান্ত সব ইনিংস খেলতে দেখেছি। বাংলাদেশের মাহমুদুল্লাহকেও পর পর দুটি সেঞ্চুরি দেখেছি। বোলারদেরও আলো ছড়াতে দেখা গেছে। সবমিলিয়ে একটি সফল বিশ্বকাপ এবং এই আয়োজনটা ওয়ানডে ক্রিকেটকে যে আরও জনপ্রিয়তার দিকে নিয়ে যাবে এটা বলাই বাহুল্য। তবে ফাইনাল ম্যাচটা আরও আকর্ষণীয় হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে একপেশে হয়ে যাওয়ার মূলে আমি নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ম্যাককুলামের সিদ্ধান্তটাকেই বড় করে দেখব। ফাইনালের আগ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড টুর্নামেন্টে অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে থাকলেও মেলবোর্নে খেলাটা তাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। কারণ আগের সব ম্যাচই তারা নিজেদের হোমে খেলে জিতেছে। তার উপর এমসিজিতে তারা সর্বশেষ খেলেছিল নয় বছর আগে। সেখানে নিউজিল্যান্ডের আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্তটাকেই আমি তাদের অমন পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখছি। যেহেতু তারা টসে জিতেছে তাই তাদের উচিত ছিল অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট করতে পাঠানো। এতে বড় যে লাভটি হতো সেটি হলো তারা নিজেরা মাঠটার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারত। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা কিভাবে রান করছে এটা দেখে অনেক কিছুই ধাতস্থ করা যেত। এমন হলেও ম্যাচটা হয়তবা অস্ট্রেলিয়াই জিতত কিন্তু খেলাটা আরও আকর্ষণীয় হতে পারত, দর্শকদের মনেও দাগ কাটতে পারত।

দাগ কাটতে পারত পুরস্কার বিতরণী মঞ্চটাও। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে ট্রফি তুলে দেয়ার দৃশ্যের মতো সুন্দর কিছু আর হয় না। কিন্তু সুন্দর তো দূরের কথা পবিত্র কাপটার গায়ে এখন লেগে গেছে কলঙ্কের দাগ। গঠনতন্ত্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শ্রীনিবাসন ট্রফি হস্তান্তর করেছেন। অথচ যেটি করার কথা ছিল আইসিসির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের। কিন্তু খুবই অপমানের এবং বেদনাদায়ক যে সেদিন সভাপতিকে সেই দায়িত্ব বা সম্মান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ক্রিকেট ইতিহাসে কোন দিন এমন ঘটনা কেউ ঘটতে দেখেনি। ফাইনালের মঞ্চে বিজয়ী দলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি আইসিসির সভাপতি তুলে না দিয়ে তুলে দেবেন চেয়ারম্যান নামক এক ব্যক্তি, এটা গঠনতদন্ত্রের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে যে মন গড়া সিদ্ধান্ত শ্রীনিবাসন নিয়েছেন তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচ নিয়ে মুস্তফা কামাল যে মন্তব্য করে ছিল সেই মন্তব্যের প্রতিশোধই এর মধ্য দিয়ে তিনি নিয়েছেন। খুবই দুঃখজনক প্রেসিন্ডেটবক্সে বসেও খেলা দেখার সুযোগ পর্যন্ত দেয়া হয়নি আইসিসির সভাপতিকে। অথচ যেখানে কিনা সিইও পর্যন্ত বসেছিলেন।

তাই বলতে দ্বিধা নেই এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিমাতা স্বরূপ আচরণ করা হয়েছে, পুরো জাতিকে অপমান করা হয়েছে এবং সর্বোপরি ক্রিকেটকে কুলষিত করা হয়েছে। একটা বিষয়ে আমি খুব অবাক হই। যে লোকটি নিজ দেশের সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক মহাঅপরাধী হিসেবে বিবেচিত এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণিত, যে লোকটিকে বিসিসিআই সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করেছে, যার বিরুদ্ধে কিনা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ পর্যন্ত আছে সেই লোকটিই যখন আইসিসির চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকেন তখন কেন কোন জায়গা থেকে রব ওঠে না! তখন আর কেউ কোন সমালোচনা করে না। এ রকম লোক যখন আইসিসির চেয়ারম্যানের পদে বসে থাকেন তখন তার কাছ থেকে এর বেশি কিছু কী আশা করা যায়? শ্রীনিবাসন যে কাজটি করেছেন তার চরিত্রের মধ্যেই আসলে এই বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে। তবে বাঙালী জাতি কোনভাবেই এটা মেনে নিতে পারি না। এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে হেয় করা হয়েছে। এ জন্য আমি এই লেখার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন ক্রীড়ামোদি ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি অন্তপ্রাণ। আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব যেন তিনি একটা তীব্র নিন্দা প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যেহেতু মুস্তফা কামাল শুধু একজন ব্যক্তি নন, ওনি বাংলাদেশের প্রভাবশালী মন্ত্রীও। এ রকম ব্যক্তিকে যখন এমন হেনস্তা করা হলো তখন জাতি চুপ করে বসে থাকতে পারে না। সারা বিশ্বকে প্রতিবাদের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দেয়া উচিত বাংলাদেশ বীরের জাতি, বাংলাদেশ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতি। এই দেশ কখনও কোন অপমান মাথা পেতে নেয়নি এবং নিতে পারে না। প্রতিবাদ করলে হয়ত আমাদের বিরুদ্ধে অনেক চক্রান্ত হবে, আমাদের ম্যাচ কমিয়ে দেয়া হবে কিন্তু সর্বোপরি লাভবান আমরাই হব। বিশ্ব দেখবে আমরা মাথা উঁচু করে আছি এবং পৃথিবী যতদিন থাকবে আমারা মাথা উঁচু করেই বসবাস করব।

ইদানিং আইসিসির সব সিদ্ধান্তই নেয়া হয়ে থাকে আমাদের মতো দলগুলোকে হেনস্তা করার জন্য। এই যেমন দশবারের বিশ্বকাপ আয়োজন। এতসব দেখে আমার মনে তো এখন শঙ্কা কাজ করছে, আইসিসি না আবার কোন দিন বিভক্ত হয়ে যায়! এত এত ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে আইসিসি ভাগ হয়ে গেছে। কারণ এখন আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, আফগানিস্তান, আরব আমিরাত, স্কটল্যান্ডের মতো দলগুলো ওঠে আসছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেটি নিয়ে বিসিসিআই খুব বেশি অহংবোধ করে সেটি হলো ‘অর্থ’। আমি তো দেখতে পাচ্ছি আগামী পাঁচ বছরে চীন ওঠে আসবে ক্রিকেটে। তখন আর অর্থের জন্য আইসিসিকে বিসিসিআইয়ের উপর নির্ভর থাকতে হবে না।

কেন জানি মনে হয় ক্রিকেট এখন তার আসল সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়ে ফেলছে। ক্রিকেটের বিশ্বায়ন বলে যে কথাটা ছিল সেই জায়গা থেকে বর্তমান আইসিসি একবারেই সরে গেছে। তাই বলতেই বাধ্য হচ্ছি ক্রিকেট আর এখন ক্রিকেট নেই।

লেখক: বিসিবি ডেভলপমেন্ট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: