মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অস্ট্রেলীয় বিজয় উপাখ্যান

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
অস্ট্রেলীয় বিজয় উপাখ্যান
  • সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ১১তম আসর শেষ হয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়া পঞ্চমবারের মতো কাপ জিতেছে এ খবরটা এখন আর নিশ্চয় তরতাজা নেই। এতক্ষণে খবরটা সবার জানা। অস্ট্রেলিয়া পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতে যে নতুন রেকর্ড গড়ল তা নয়। এর আগেই তারা সর্বাধিকবারের রেকর্ড (৪ বার), হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নের রেকর্ডসহ অনেক রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। এ জয় তাদের সে রেকর্ডের ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে বলা যায়। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের যে ১১টি আসর বসেছে তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সাত-সাতবার ফাইনাল খেলেছে এবং তার মধ্যে পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। তার মানে বলা যায়, অস্ট্রেলিয়ানদের বিশ্বকাপ জেতা ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এই জয় নিয়ে (যদিও জয়টা নিরঙ্কুশ নয়) কারও কোন আক্ষেপ নেই। থাকার কথাও নয়। কেননা অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে কাপ জয়ের স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়া ভারত বা নিউজিল্যান্ডই তারস্বরে গলা ফাটিয়ে বলছে, অস্ট্রেলিয়া যোগ্য দল হিসেবে কাপ জিতেছে সেখানে অন্যদের তো কিছুই বলার নেই। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। অস্ট্রেলিয়া কি একাই যোগ্য দল ছিল? নিশ্চয় সেটাও নয়। অস্ট্রেলিয়া শিরোপা জিতেছে ঠিক আছে। তবে ‘ক্রিকেট যে এক মহান অনিশ্চয়তার খেলা’ সে কথাটাই এবারও প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে বা পরে অস্ট্রেলিয়া একাই ফেবারিট ছিল না। নিউজিল্যান্ড, ভারত ও দ. আফ্রিকাও ফেবারিটের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার ওপরেই অবস্থান করছিল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই দর্শকের প্রত্যাশানুযায়ী এই চার দলই সেমিতে উঠলেও শেষ হাসিটা হাসে অস্ট্রেলিয়াই। বিশেষ করে দ. আফ্রিকানরা ভারত ও পাকিস্তানের কাছে হারলেও তাদের দিকেই অনেকের চোখ ছিল। এবারের বিশ্বকাপে তাদেরই সেরা বলে মানবেন অনেকে। শিরোপার অন্যতম দাবিদার ছিল স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড এবং চ্যাম্পিয়ন ভারতও। বিশেষ করে এই দুই দল গ্রুপ পর্বে কোন ম্যাচ না হারায় তাদের প্রতি দর্শকের প্রত্যাশাও বেড়ে যায় অনেক। কিন্তু গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকেও শেষটা ভাল হয়নি দু’দলেই।

এবারের বিশ্বকাপের শুরুটা ভালই করেছিল অসিরা। মেলবোর্নে ইংল্যান্ডকে ১১১ রানের ব্যবধানে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু অসিদের। এই জয়ে নিজেদের শেষ আটে ওঠার পথকে সহজ করে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ানরা। তবে নিজেদের পথ সহজ করলেও ইংরেজদের পথকে কঠিনতর করে দিয়েছিল। এই পরাজয়ের ধকল আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি মরগানের দল। ফলে গ্রুপ পর্বেই থমকে যায় ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ মিশন। বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচটা বৃষ্টির কারণে বাতিল হয়ে যায়। খেলা হলে ফল কী হতো সেটা অন্য বিষয়। গ্রুপ পর্বে আরেক স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের কাছে মাত্র ১ উইকেটে হারলেও তাতে করে কোয়ার্টারে উঠতে মোটেও অসুবিধে হয়নি। কেবলমাত্র গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন তকমাটা লাগাতে পারেনি। নিউজিল্যান্ডের কাছে হারাটাই অস্ট্রেলিয়ার কাপ জেতার নেপথ্যে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। ওদের জন্যে এটা হয়েছে ‘শাপে বর’। আবার স্বরূপে ফিরে আসে মাইকেল ক্লার্কের দল। এরপর একে একে তাদের জিঘাংসার শিকার হয় ’৯৬-এর চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৭৬ রানের, নবাগত আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ (৪১৭/৬) রানের ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে হারায় ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে। কোয়ার্টার ফাইনালেও অস্ট্রেলিয়ার জয়ের চালচিত্রটা সেই একই রকম থাকে। এবারের শিকার সাবেক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান। তাদেরও অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। ফলাফল পাকিস্তানের ৬ উইকেটে পরাজয়। আর সেমি-ফাইনালে ভারতবধের কথা তো সবার জানা। বাংলাদেশের সঙ্গে ছলচাতুরী করে জিতলেও অস্ট্রেলিয়ার সামনে দাঁড়াতেই পারেনি ধোনির দল। হারতে হয়েছে ৯৫ রানে। মেলবোর্নে শুরু মেলবোর্নেই শেষ। এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার রোড টু ফাইনালের রোড ম্যাপ।

মেলবোর্নের ফাইনালের চিত্রটা আরও একটু অন্যরকম। সবাই ভেবেছিল ফাইনালে বাঘে-সিংহে লড়াই হবে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের পেছনের চিত্রটা সে কথাই বলছিল। কিন্তু ভাবনা আর বাস্তব যে এক নয় সে কথাটা আরও একবার প্রমাণিত হলো। ফাইনালে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব দেখল এক অন্য নিউজিল্যান্ডকে। পুরো রিভার্স। গোটা টুর্নামেন্টে যে দলকে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়েছে, সমীহ করেছে ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ভয়ে তারাই যেন কুপোকাৎ। যদিও ম্যাচের আগেই অনেকেই বলছিলেন, মেলবোর্নে কিউইরা কাপ জিততে পারবে না। যাঁরা এটা বলছিলেন তাঁদের পক্ষে যুক্তিও ছিল। ’৯২ বিশ্বকাপের মতো এবারও তারা একটানা ৮টি ম্যাচ জিতে মেলবোর্নের ফাইনালে এসেছে ঠিকই তবে সেই ৮টি ম্যাচ তারা খেলেছে নিজেদের দেশে, চেনা মাঠে, পরিচিত দর্শকের সামনে। তাই তাদের বড় কোন পরীক্ষা দিতে হয়নি। হোম এ্যাডভান্টেজে অনেক কিছুই করা যায় যেটা আরেক দেশে সহজ হয় না। অন্য দেশে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে। যেমন ওয়েলিংটন বা অকল্যান্ডের চেয়ে মেলবোর্নের মাঠ অনেক বড়। মেলবোর্নের মাঠ কিউইদের অপরিচিত না হলেও এ মাঠে তারা দিশা হারিয়ে ফেলবে। প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল বলে কথা। যদিও টসে হেরে অস্ট্রেলিয়া খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিল বলে ধরা হলেও সেটা ছিল সাময়িক। নিউজিল্যান্ড টস জয়ের কোন সুবিধে নেয়ার আগেই তছনছ হয়ে যায়। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার স্টাইকিং বোলার মিচেল স্টার্কের প্রথম ওভারেই কিউই স্কিপার ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এরপর আর নিউজিল্যান্ড সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দাঁড়াতে দেয়নি স্টার্ক, জনসন, ফকনাররা। কিউই ব্যাটসম্যান এলিয়ট-টেলররা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও পারেননি। তাদের পক্ষেও ইনিংসের অংকটা ২শ’র কোটা পার করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষ হয় ১৮৩ রানে। সেটাও আবার ৫ ওভার বাকি থাকতেই। এই ১৮৩ রানটা আরেকটি বিশ্বকাপকে মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮৩ সালে তৃতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত ১৮৩ রানে অলআউট হয়েছিল। ভাবা হচ্ছিল প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের এ রান টপকে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতা বুঝি সময়ের ব্যাপার। কিন্তু কাজটা যে অত সহজ ছিল না সেটা বুঝিয়ে দেয় ভারতের বোলাররা। মহিন্দর অমরনাথ, রজার বিনি, মদনলালের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি ক্যারিবিয়রা। বিশেষ করে অমরনাথ ভেলকিতে সেবার ভারত জেতে ৪৩ রানে। এবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সে রকম একটি ঘটনার ভাবনা যে কারও মাথায় ছিল না তা নয়। কিন্তু ৩২ বছর আগে অমরনাথ, বিনি, মদনলালরা যেটা করতে পেরেছিলেন ৩২ বছর পর তার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারলেন না বোল্ট, সাউদি, ভেট্টোরিরা। অস্ট্রেলিয় কৌশলের কাছে পরাভূত হলো কিউইরা। কেবলমাত্র যে ৭ উইকেটের বড় রানে হেরেছে তাই নয়, অস্ট্রেলিয়াকে জয় পেতে খেলতে হয়েছে মাত্র ৩৩.১ ওভার। তার মানে যে পিচে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানেরা দাঁড়াতেই পারেনি সে পিচে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক খেললেন ৭২ বলে ৭৪ রানের এক অনুপম ইনিংস, স্বাচ্ছন্দ্যে খেললেন স্মিথ-ওয়ার্নাররা। আর এ মাঠেই নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানেরা পারল না। এটাকে নার্ভাসনেস ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে!

ম্যাাচ শেষে যথারীতি পুরস্কার দেয়ার বা নেয়ার পালা। এখানে ঘটল আরেক ঘটনা। বদলে গেল আইসিসির এতকালের নিয়ম। প্রথা ভেঙে আইসিসির সভাপতির বদলে চেয়ারম্যান বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দিলেন। ভারতের কাছে চক্রান্তের ম্যাচে হারার পর আরেকবার টেবিলে হারতে হলো বাংলাদেশকে। এমনিতেই এর আগে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোন আম্পায়ার বা ধারাভাষ্যকার না রেখে দেশটির প্রতি অবিচার করেছে আইসিসি। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটির ব্যাপারে পজেটিভ কোন ডিসিশন তো দেয়ইনি পক্ষান্তরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিকে উপেক্ষা করে আরও একটি গর্হিত কাজ করেছে আইসিসি। আইসিসির চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন ছাড়াও ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচিন টেন্ডুলকরকেও মঞ্চে উপস্থিত করা হয়েছে ম্যান অব দ্য ফাইনাল ও ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার দেয়ার জন্যে। অস্ট্রেলিয়ার বোলার জেমস ফকনার ‘ম্যান অব দ্য ফাইনাল’ হলেন। তবে স্কিপার মাইকেল ক্লার্ক কেন ম্যাচসেরা হলেন না সে অঙ্ক অনেকের মেলেনি। অপর বোলার মিচেল স্টার্ক ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হলেন। মার্টিন গাপটিল কেন হলেন না সেটাও অনেকের বোধগম্য হলো না। তবে নিউজিল্যান্ড জিতলে দৃশ্যপট বদলে যেত। ম্যান অব দ্য ফাইনাল ও ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট সবই হতো নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা। নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিল সর্বোচ্চ ৫৪৭ রান ও শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৪১ রান করেন। অস্ট্রেলিয়ার বোলার মিচেল স্টার্ক ১০.১৮ গড়ে ২২টি এবং নিউজিল্যান্ডের বোলার ট্রেন্ট বোল্ট ১৮.৬৭ ২২টি উইকেট নিয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হন। অস্ট্রেলিয়া দল তাদের শিরোপা উৎসর্গ করে চার মাস আগে প্রয়াত দলের প্রতিশ্রুতিশীল তারকা ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজকে। বেঁচে থাকলে এবারের বিশ্বকাপ নেয়ার কাজটি হয়ত তাঁরই করতে হতো। মাথায় বল লেগে হিউজ ৪ মাস আগে মারা যান। তার প্রতি শোক জানাতেই অস্ট্রেলিয়া দল এবারে কালো আর্মব্যান্ড বেঁধে খেলেছে।

এবারের বিশ্বকাপের পর অনেক খ্যাতিমান ক্রিকেটারকে আর হয়ত রঙিন পেশাকে মাঠে দেখা যাবে না। অস্ট্রেলিয় দলের অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক, নিউজিল্যান্ডের আগের বিশ্বকাপের অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, শ্রীলঙ্কার আগের দুই বিশ্বকাপের দুই অধিনায়ক মাহেলা জয়বর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারা, পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদিসহ অনেকেই বিশ্বকাপের পর সরে দাঁড়াবেন দল থেকে।

একটা অসাধারণ বিশ্বকাপের শেষটাই একটা অসাধারণ ফাইনাল দেখার ইচ্ছে ছিল সবার। সেটা হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার জয়টা যে স্বপ্নের মতো হয়েছে সেটাও নয়। এলাম, খেললাম, জয় করলাম, তেমনটা নয়Ñ শিরোপা জিততে তাদেরও অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তাদের জয়ে যে কেউ অখুশি হয়েছে তা নয়। তবে নিউজিল্যান্ডের জয়ও অনেকেই চাইছিলেন। কনগ্র্যাচুলেশন অস্ট্রেলিয়া শিরোপা জেতার জন্যে, কনগ্র্যাচুলেশন নিউজিল্যান্ড স্বপ্নপূরণের এ কাছে আসার জন্যে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: