মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নাশকতা ও জঙ্গীবাদ

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
  • গোলাম কুদ্দুছ

সমকালীন বাংলাদেশের যে চিত্র আমাদের কাছে দৃশ্যমান তা বোধসম্পন্ন যেকোন মানুষকেই শঙ্কিত করে তোলে। যূথবদ্ধভাবে মানুষ যখন বসবাস করতে শিখল মূলত তখন থেকেই নেতৃত্ব নির্বাচনের পালা শুরু। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরিয়ে যায়নি। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারে নেতৃত্বের প্রয়োজন মানুষের কল্যাণ আর সমাজকে সুশৃঙ্খল করার জন্য। মানুষের সামগ্রিক চিন্তার বিকাশে এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মহাসম্মিলনের মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে চলে। সভ্যতার এক একটি সিঁড়ি নির্মিত হয়। আর এই অগ্রগতির মূলে রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাজনৈতিক শক্তি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

বাঙালী জাতিসত্তা আর রাষ্ট্র ভাবনার পেছনে মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা এবং বৃহত্তর ঐক্য বড় ভূমিকা পালন করেছে। শত শত বছর ধরে জমিদার রাজা বাদশাদের মধ্যে কখনও কখনও এই চিন্তা থাকলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ন্যূনতম ঐক্যসূত্র না থাকায় কখনও তা শিকড় বিস্তার করতে পারেনি। স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলেও শুরুতেই মানুষের ভাবনায় এক বড় ঝাঁকুনি লাগে। পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়া হলে বাঙালী সর্বপ্রথম জাতিসত্তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা এবং জীবনবোধ বাঙালীকে তার আত্মপরিচয়ে গৌরবান্বিত করার স্বপ্ন দেখায়। আটচল্লিশ এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনে নেয় এবং জাতিসত্তার শক্তিতে শক্তিমান হয়।

বাঙালীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালী জাতিকে মুক্তির প্রকৃত পথটি দেখিয়ে পুরো জাতিকে একই ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং ঐতিহাসিক সাতই মার্চের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা সে ঐক্যবদ্ধতার প্রমাণ মাত্র।

স্বাধীনতার পর বাঙালী বেশ কয়েকবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং গণতন্ত্রের সংগ্রামে মানুষের ঐক্যবদ্ধ রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এ কথা সত্য যে, মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তখনই দাবি আদায় হয়েছে, সত্যের জয় হয়েছে, মানুষের রক্ত কখনোই বৃথা যায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষের প্রত্যাশা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঠিক বাস্তবায়ন। অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যে নাশকতা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য চলছে তার মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। প্রথম দিকে তাদের ধারণা ছিল, জামায়াতের বিদেশী কানেকশন, লবিস্ট নিয়োগ, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি এবং দেশী-বিদেশী নানা চাপে সরকার বিচার প্রক্রিয়া থেকে পিছু হটবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ কয়েকটি বড় শক্তির চাপের মধ্যেও সরকার যখন আদালতের রায় অনুযায়ী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করল তখনই বিএনপি-জামায়াতের ক্ষোভ ও অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও, সরকারী সম্পদ ধ্বংস, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলা ও জ্বালিয়ে দেয়া, থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে দেশব্যাপী এক নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি করা হয়। জামায়াত বুঝতে পারে দেশী-বিদেশী কোন চাপই সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে পিছু হটাতে পারবে না। বিএনপির মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয় তাদের শীর্ষ নেতাদের নামে একুশে আগস্টের বোমা হামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করা বিভিন্ন মামলা নিয়ে। সরকার যেভাবে এগুচ্ছে তাতে এই সকল মামলার বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলে বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতাই ফেঁসে যাবেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি-জামায়াত তাই নিজ দলের নেতাদের রক্ষার জন্য সরকারবিরোধী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। যে কোনভাবেই হোক শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোই তাদের মূল টার্গেট নির্ধারিত হয়। এই লক্ষ্যে যখন যাকে বা যে শক্তিকে উসকিয়ে মাঠে নামানো প্রয়োজন তখনই তারা তাই করেছে। হেফাজতের উত্থান এবং শাপলা চত্বরের তা-ব সেই প্রক্রিয়ারই অংশ। বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এবং তাদের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক মনে করে শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং দুর্নীতির মামলা বন্ধের কথা বললে দেশের জনগণ এবং বিদেশীদের সমর্থন পাওয়া যাবে না। আর সে কারণে প্রধান দাবি হিসেবে তারা মাঠে আনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের কথা। অথচ দেশবাসী জানে এক সময়ের এই জনপ্রিয় দাবিকে বিএনপি কিভাবে নিজেদের ক্ষমতা দখলের স্বার্থে অপব্যবহার করেছিল। দলীয় লোকদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ, সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার তালিকাভুক্তকরণ, উপজেলা নির্বাচন অফিসার পদে ছাত্রদল ও শিবিরের লোকদের নিয়োগ, প্রশাসনের সকল স্তরে দলীয় লোকদের পদায়ন, নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্য বিচারপতিদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে দেয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মদকে একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে বিএনপি যে নজির স্থাপন করল তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল তত্ত্বের মৃত্যু ঘটে। যে আকাক্সক্ষা নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছিল তা যে আর কার্যকর নয় তা মানুষ বুঝতে পেরেছে। মানুষ বুঝতে পেরেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন আর নিরপেক্ষ নির্বাচন, এমনকি গণতন্ত্র রক্ষার গ্যারান্টিও নয়। নব্বই দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করে রাখার ইতিহাস মানুষ কি ভুলে গেছে?

মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল নয়। অভাব-অনটনে থাকলেও বাঙালী সময়মতোই স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে নেয়। সে কারণেই মানুষ বিএনপি-জামায়াতের কথায় আর রাস্তায় নামতে রাজি নয়। তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি যে মানুষকে বোকা বানানোর কৌশল মানুষ তা বুঝে গেছে। মানুষই যদি না নামে তবে বিএনপি-জামায়াতের সামনে আর পথ কি? সে কারণেই জনগণকে বাদ দিয়ে যড়যন্ত্র আর নাশকতার পথ তারা বেছে নিয়েছে। হরতাল, অবরোধ ডেকে সরকারী সম্পদ ধ্বংস, শিক্ষাজীবন বিপন্ন, অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়া এবং পেট্রোলবোমা ও ককটেল ছুড়ে মানুষ হত্যা করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মিত্ররা। জনগণের সমর্থন না পাওয়ায় বিএনপির কর্মসূচী এখন শুধুমাত্র সন্ত্রাস, নাশকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তারা এখন ঝুঁকছে জঙ্গীবাদের দিকে। জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে একটি জঙ্গীবাদী, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করে প্রগতির চাকাকে রুদ্ধ করতে চায় তারা। নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা অস্বীকার করে তারা আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে চায়? অভিজিত, রাজীব, হুমায়ুন আজাদের নির্মম হত্যাকা- কি সেই অশুভ নীলনকশার অংশ নয়? আইএস, বোকো হারাম, তালেবানদের কর্মকা- থেকে আমরা কি শিক্ষা নেব না? সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িকÑগণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য কি কাক্সিক্ষত নয়? আমরা কি এখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বুলি আওড়িয়ে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা ও যড়যন্ত্রকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাব? প্রধান শত্রু নির্ধারণ এবং অস্তিত্বের সঙ্কট চিহ্নিত না করে শুধুমাত্র বাম বিকল্প খোঁজা কি সময়ের দাবি? সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তি যদি মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে তৃতীয় ধারার নামে ঐক্য গড়ায় সচেষ্ট হয় সেটা কি আদর্শহীন হয় না?

আজকের বাস্তবতা হলো দেশকে জঙ্গীবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। নাশকতা প্রতিরোধ করা না গেলে সামগ্রিকভাবে দেশ এক ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়াবে। এমনি পরিস্থিতিতে দলীয় স্বার্থের চুলচেরা বিশ্লেষণ আপাতত বন্ধ রেখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, পেশাজীবী সংগঠনসমূহ আলাদা আলাদা অবস্থান থেকে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করলেও পরিস্থিতির বিবেচনায় তা যথেষ্ট নয়। সময়ের দাবিকে উপেক্ষা করা হলে সবাইকে ইতিহাসের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা আমরা বলি বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মে তার প্রতিফলন নেই। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, লাভ-লোকসান এবং দল ও গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশ ও জনগণের এই সঙ্কটে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল ও মতের মানুষকে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। যে বা যারা কূটতর্ক ও যুক্তি হাজির করে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে ঐক্যের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের একদিন দাঁড়াতেই হবে।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: