মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সৌজন্যবোধ পাল্টে দিতে পারে প্রেক্ষাপট

প্রকাশিত : ৩০ মার্চ ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

মানুষের কথা বলার ধরন বা একটু হাসি পাল্টে দিতে পারে মানুষের প্রতি মানুষের অনুভূতি। আন্তরিকতা, আগ্রহ ও আকর্ষণ তৈরির পেছনে কাজ করে সৌজন্যবোধ। প্রতিটি মানুষ কোন না কোনভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। পিতা-মাতার স্নেহ, বন্ধুর সহযোগিতা, ডাক্তার ও শিক্ষকের সেবা, স্বামী-স্ত্রীর সহমর্মিতা, সৈনিকদের দেশপ্রেম, সমাজে একে-অপরের প্রতি আন্তরিকতা সব কিছুই সৌজন্যবোধের অংশ। কিছু সৌজন্যবোধ গড়ে ওঠে আপনা থেকে। কিছু সৌজন্যবোধ তৈরি করে নিতে হয়।

ইদানীং বেশকিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমরা সৌজন্যবোধের ধার ধারি না। ধরুন, একটি ১২তলা অফিস ভবনের দুটি লিফট। লিফট দুটি সবসময় ব্যস্ত থাকে। কেননা অফিসে বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। এ ক্ষেত্রে লিফটে লাইন দিয়ে ওঠাটাই বাঞ্ছনীয়। আপনিও লাইনে দাঁড়িয়েছেন হয়ত দেখবেন একজন লাইনের তোয়াক্কা না করে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লিফটে বা ব্যস্ত মেট্রোবাসে ওঠার সময় আমরা যদি নিয়ম মেনে চলি, কর্মক্ষেত্রে বা চলার পথে আমরা একে-অন্যের প্রতি সৌজন্যবোধ দেখাই, তাহলে আমাদের জীবনে চলার পথ অনেকটা সহজ হবে।

বাসে নিজের আসনটি যদি একজন বয়স্ক পুরুষ কিংবা একজন মহিলাকে ছেড়ে দেন, তাহলে সেটা হবে আপনার জন্য একটা দায়িত্ব পালন। এভাবে আপনাকে দেখে অনেকে অনুসরণ করে সমাজের জন্য সুখকর বিষয়টিকেই প্রতিষ্ঠিত করবে। সমাজে একে-অপরের প্রতি যদি সৌজন্যবোধ দেখাতে পারে, তাহলে কোন সমস্যাই আর জটিল রূপ নেবে না।

আজকাল ঢাকার প্রতিটি রাস্তায় জ্যাম হয়। প্রতিটি রাস্তায় রয়েছে ট্রাফিক সিগনাল। লাল, হলুদ, নীল বাতি আমরা সচরাচর দেখি। এই বাতির অর্থ কি আমরা যারা বাসে চড়ি বা নিজেরা গাড়ি চালাই তারা সবাই জানি। কিন্তু লালবাতি জ্বলার পর আমরা কি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামাতে দেখি? লালবাতি জ্বলার পরও প্রয়োজন হয় ট্রাফিক হস্তক্ষেপের। বিষয়টি কোন শুভ বার্তা বহন করে না। আবার পথচারীরা আইন মেনে রাস্তা পার হলে দূর্ঘনার হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। আইন মানলে আমাদের কোন ক্ষতি হয় না। বরং লাভ বেশি। আইন মানা শুধু সৌজন্যবোধ নয়, একটি সামাজিক শিষ্টাচার।

রাস্তার পাশে একটা ইটের টুকরা পড়ে থাকলে যে কেউ সেটাতে আঘাত পেতে পারে। তাই ইটের টুকরাটি সরিয়ে এমন স্থানে রাখতে হবে, যা পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এভাবে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে থুথু ফেলা ও ময়লা ফেলার মতো গুরুতর ভুল কাজটি আমরা অহরহ করে থাকি। এটা কোন সৌজন্যবোধের মধ্যে পড়ে না। এই বিষয়গুলোতে আমাদের সচেতন হতে হবে। তাহলে অন্যেরাও অভ্যস্থ হয়ে পড়বে নিজ নিজ কর্তব্য পালনে।

বর্তমান সমাজ পাল্টে যেতে পারে শুধু ব্যক্তির সৌজন্যবোধের কারণে। আর এই সৌজন্যবোধ শিক্ষার প্রধান পাঠশালা হলো পরিবার। বাড়ির প্রতিটি সদস্যেরই একজন আর একজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও স্নেহশীল হওয়া উচিত। পারিবারিক সদস্য হওয়ার পরও প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব চিন্তা ও আলাদা ভূবন। প্রথাগতভাবে আমরা পরিচিত হলেই সালাম দিয়ে বা কখনও কখনও হাত মেলাই। তারপর মানুষের অনুভূতিকে কিভাবে বুঝতে হবে, তার শিক্ষাও গ্রহণ করতে হবে পরিবার থেকে। এর জন্য চাই বিবেচনাবোধ। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও এই বোধ তৈরি হয়। বাড়ির অভিভাবককে পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিরক্ত না হয়ে, ধৈর্য নিয়ে মতামত শুনতে হবে। ছোটরা যেন বুঝতে পারে তার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং যুক্তিযুক্ত মতামত প্রয়োগ করলে তা বড়রাও মেনে নেয়। মনে রাখতে হবে, মার্জিত পোশাক ব্যক্তিকে স্মার্ট করে। স্মার্ট হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনাকে চলতি সময়ের পোশাক পরতেই হবে। পোশাক হতে হবে মার্জিত ও রুচিসম্মত। কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে যা আপনার সঙ্গে মানানসই নয়, তা করা উচিত নয়। মার্জিত ও রুচিসম্মত কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। কোথাও গিয়ে যদি মুরুব্বি বা শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাহলে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করতে হবে। তাদের শারীরিক কুশলাদি জানতে হবে। কর্মস্থলে সব সময় ফোন ব্যস্ত রাখা, উচ্চস্বরে কথা বলা, সামনে অতিথিকে বসিয়ে রেখে মোবাইলে অন্যের সঙ্গে কথা বলা বা ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা একটি বিড়ম্বনাপূর্ণ বিষয়। রেলে, লঞ্চে বা বিমানে ভ্রমণ করার সময় এমন কিছু করবেন না যাতে অন্যদের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।

সব সময় মনে রাখতে হবে, নিজের মতটি শ্রেষ্ঠ নয়। অন্যের যুক্তির মূল্যায়ন করে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে হবে। এমন কিছু বিষয়ে কথা হচ্ছে, যা আপনার শুনতে ইচ্ছা করছে না, তারপরও তা এমনভাবে শুনতে হবে যেন কেউ না বুঝতে পারে, আপনি অন্যের মতামতের মূল্যায়ন করছেন না। কয়েকজন মিলে যখন কথা বলছে তখন হুট করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়াটা ঠিক নয়। কেননা তারা কি বিষয় নিয়ে কথা বলছে, সেটা আগে জানা উচিত। হতে পারে তারা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে কথা বলছে। আর একান্তই যদি তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ইচ্ছা করে, তাহলে তাদের অনুমতি নিয়ে বলুন, ‘আমি কি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি’ বা ‘আমি কি অসময়ে এসে পড়েছি, ‘বলেই একটু স্মিত হাসুন’। সৌজন্যবোধ জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। আজকের দিনে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য রয়েছে বিভিন্ন মাধ্যম। ইন্টারনেট, ফেসবুক, মোবাইলের মাধ্যমে আমরা ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি। ছোট ছোট শুভেচ্ছা বার্তায় মানুষের মনে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আজকাল অনেক টিভি চ্যানেল বিভিন্ন ধরনের লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার করে মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে এবং সচেতন করছে। কোন পাবলিক পরিবেশে মোবাইলে নিচু কণ্ঠে এবং সংক্ষিপ্ত কথা বলা উচিত। যাতে অন্যরা বিরক্ত না হয়। যে সব পরিবেশ ব্যক্তিকে মাদকাসক্ত করে, সে রকম পরিবেশে আপনার পরিচিতজনরা যেন না যেতে পারে, সেদিকে সব সময় সজাগ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কেউ কেউ মনে করে, ধুমপান করাটা একটা স্টাইলিষ্ট ব্যাপার। কিন্তু তারা জানে না, ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তি সমাজের আবর্জনা। তাই সমাজে আবর্জনা না হয়ে সার্থক জীবনের পথ বেছে নেয়া কি সবার উচিত নয়? নিজেকে সমাজের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের অংশীদার করতে হবে। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, নিজস্ব বিবেক সচেতন হয়। সাংস্কৃতিকশিল্পী হিসেবে যদি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও অবদান রাখা একটি মহৎ সৌজন্যবোধ। কাউকে তিরস্কার না করে প্রয়োজনে সৌজন্যবোধ দিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে হবে।

বাড়িতে যেমন পিতা-মাতাকে সচেতন হতে হবে, স্কুল-কলেজে শিক্ষককেও সেভাবেই সচেতন হওয়া খুব জরুরী। সন্তানদের সামনে, পিতা-মাতা ও শিক্ষার্থীদের সামনে এমন কিছু আদর্শ স্থাপন করতে হবে যার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যত জীবন গড়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে। আর বর্তমান যুগে লিডারদের হতে হবে যুক্তিবাদী, আন্তরিক, আদর্শবান ও সত্য ইতিহাস লালনে একনিষ্ঠ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও সার্থক ও যথার্থ হয়ে উঠতে পারে ডাক্তারের সৌজন্যবোধের কারণে। একজন ব্যাঙ্কার ও ব্যবসায়ীরা সুন্দর সৌজন্যবোধের কারণে প্রতিষ্ঠা পায় সেই প্রতিষ্ঠানটি। দেখা যাচ্ছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গেই যুক্ত আছে ব্যক্তির সৌজন্যবোধের বিষয়টি।

সৌজন্যবোধ জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। শিক্ষিত সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি একে-অপরের প্রতি সঠিক সৌজন্যবোধ দেখাতে পারে, তাহলে সমাজের চেহারাই পাল্টে যাবে। শিক্ষাবঞ্চিত মানুষ, পিছিয়েপড়া কিশোর ও তরুণগোষ্ঠী সচেতন ব্যক্তির সৌজন্যবোধ দেখতে দেখতে তারা নিজেদের তৈরি করার সুযোগ পাবে। তাই প্রতিটি ব্যক্তির নিজের সৌজন্যবোধ আগে জাগিয়ে তুলতে হবে।

ছবি: রথি

মডেল: সনি ও শানু

প্রকাশিত : ৩০ মার্চ ২০১৫

৩০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: