কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

লি কুয়ান ইউ’র সিঙ্গাপুর মডেল

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

লি কুয়ান ইউ। চিরস্মরণীয় এক নাম। তা কেবল সিঙ্গাপুরের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই। কিভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশকে প্রথম বিশ্বের কাতারে তিনি নিয়ে এসেছেন, তা সত্যি বিস্ময়কর। তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত সকল কর্মসূচীর মাঝেই ছিল অভিনবত্ব। সেই কর্মসূচীগুলো সারা বিশ্বের কাছে সিঙ্গাপুরিয়ান মডেল নামে খ্যাত। কী এমন মডেল সৃষ্টি করলেন তিনি যে, দারিদ্রপীড়িত ২৭৭ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট দেশটি আজ ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। সে ইতিহাস তুলে ধরেন তিনি ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট : দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি’ বইটিতে।

মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ছেলেদের নিয়ে ১৯৫৪ সালে আইনজীবী লি কুয়ান ইউ সমাজতন্ত্রী ভাবধারায় পরিচালিত ‘পিপলস এ্যাকশন পার্টি’ গঠন করেছিলেন। এই পার্টি ১৯৫৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হলে লি কুয়ান ইউ স্বায়ত্তশাসিত সিঙ্গাপুর শহরের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন এটি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত। প্রধানমন্ত্রিত্বের চার বছরের মাথায় এই অঞ্চলটি মালয়েশিয়ান ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু জাতিগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এমন প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে ১৯৬৫ সালেই সিঙ্গাপুর ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং পৃথিবীর বুকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ছোট্ট এই দেশটিকে নিয়ে তখন লি কুয়ান ইউ অথৈ সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলেন।

দেশটিতে কোন প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী। অধিকাংশ মানুষকেই বাস করতে হচ্ছিল শহরের প্রান্তের নোংরা বস্তিতে। শিক্ষার আলো তো ছিলই না, বরং মালয়, সিঙ্গাপুরিয়ান, চাইনিজ ইত্যাদি জাতির সম্মিলনে জাতিগত বিদ্বেষ অস্থিতিকর অবস্থায় ছিল। সেই সঙ্গে দুর্নীতি ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। এমন পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর অন্যসব দরিদ্র দেশের মতোই অদ্যাবধি অতল অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকার কথা ছিল। এ বিষয়ে লি কুয়ান বলেছেন, ‘জাতি হয়ে ওঠার আবশ্যক উপাদান যেমন সমধর্মী জনগণ, একই ভাষা, একই সংস্কৃতি এবং একই নিয়তি সিঙ্গাপুরে নেই। নেই প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই সিঙ্গাপুরের টিকে থাকার কথাও নয়, তবু টিকে গেছে।’ এই টিকে যাওয়ার পেছনে তাঁর কর্তৃত্ববাদী আচরণই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। লি কুয়ান ইউ বুঝেছিলেন, কঠোর আইনের প্রয়োগ না করা গেলে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পাস করা লি কুয়ান তাই দেশে সর্বাগ্রে আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন শুরু করেন।

লি কুয়ান ইউ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। সমাজতন্ত্রকে অনুসরণ করেই তিনি রাষ্ট্রের জনগণের কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন। এমনকি গণমাধ্যমের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তি ছিল, ‘কোন বিষয়টাকে আমরা প্রাধান্য দেব? প্রথমেই জনকল্যাণ, তারপর গণতন্ত্র, যা থেকে আমরা সময় সময় সরে এসেছি।’ জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে তিনি গণতন্ত্রকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে সমাজতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করছিলেন। তবে তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজতন্ত্রের সব নীতি মানতে গেলে তার দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হবে না। খাদের কিনারেই পড়ে থাকতে হবে। তাই সমাজতন্ত্রের নীতি ত্যাগ করে তিনি ঝুঁকে পড়েছিলেন মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে। তাঁর এই নীতি সিঙ্গাপুরকে আজকের অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আজকের মহাপরাক্রমশালী চীন লি কুয়ানের নীতি অনুসরণ করেই কিন্তু এখন বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ।

লি কুয়ান অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি জানতেন, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ভিত্তিতে বর্ধিত জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় রেখে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে দেশের সকল ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটান। নিশ্চিত করেন বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ। বিনিয়োগের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য তিনি বুঝেছিলেন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে সিঙ্গাপুর থেকে দূর করতে হবে। তাই বিরোধী রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন বেশ শক্ত হাতেই। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশের কারণে আমেরিকা, চীন, মালয়শিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখানে বিনিয়োগ করা শুরু করে। ফলে দেশটির উৎপাদন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটা শুরু করে।

লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য পররাষ্ট্র নীতিতে নিয়ে আসেন অভিনবত্ব। আমেরিকা ও চীন এই দুটি দেশের মাঝে অনেকটা দা-কুমড়ো সম্পর্ক থাকলেও, লি কুয়ান এই দুটি দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করলে আখেরে লাভ নেই। আবার প্রতিবেশী চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। প্রতিবেশীদেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যের চাকাকে সচল করেছিল।

লি কুয়ান ইউ বুঝেছিলেন, অশিক্ষিত জাতি দিয়ে উন্নতির সোপানে পৌঁছানো যাবে না। তাই তিনি দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের প্রতি গুরুত্ব দেন। শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার প্রতি তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি মেধাবী পুরুষের সঙ্গে মেধাবী নারীর বিয়ে সংক্রান্ত অভিনব এক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মেধাবী নারী পুরুষের ঘরে মেধাবী সন্তান আসবে যারা সিঙ্গাপুরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তার এসব পদক্ষেপের কারণে মেধাবী ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়, যারা সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে গতিশীলতা নিয়ে এসেছে।

দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি যে মস্ত বাধা, তা লি কুয়ান জানতেন। তাই তিনি দুর্নীতি দূর করার জন্য করাপ্ট প্র্যাকটিস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (সিপিআইবি) গড়ে তোলেন। এই সংস্থাটি মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারী আমলা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ সবার দুর্নীতির তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে তিনি বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না কাউকেই। ফলে দেশটি ধীরে ধীরে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে উঠে। দুর্নীতিমুক্ত হওয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তথা লালফিতার দৌরাত্ম্য হ্রাস পায়, যা দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতিশীলতা সৃষ্টি করে।

তিনি দেশ পরিচালনায় কোন নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী না হয়ে, বিভিন্ন ধ্যান-ধারণাকে একীভূত করে দেশ পরিচালনা করেছেন এবং দেশকে উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। বিষয়টি তাঁর এক বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম, আমরা যদি প্রতিবেশীদের মতো থাকি, তাহলে নির্ঘাৎ মারা যাব। কারণ তাদের যা কিছু দেয়ার আছে সে তুলনায় আমাদের দেয়ার কিছু নেই। তাই আমাদের এমন একটি কিছু বানাতে হবে, যা তাদের চেয়ে ভিন্ন এবং ভাল। তা হলো, দুর্নীতিমুক্ততা এবং দক্ষতা ও মেধাসম্পন্ন মানবসম্পদ। এটি কার্যকর পন্থা। আমরা বাস্তববাদী। কোন কার্যক্রম নিয়ে চেষ্টা করে দেখি, যদি কাজ করে তো ভাল, এটি চালিয়ে যাও। আর না করলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্য কিছু চেষ্টা কর। আমরা কোন একটি নির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে তাই পথ চলি না।’

দীর্ঘ একত্রিশ বছর একটানা সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটিকে তৃতীয় বিশ্বের তালিকা থেকে প্রথম বিশ্বের কাতারে নিয়ে আসা এই প্রবাদপুরুষের বিরুদ্ধে সমালোচকরা সব সময়ই বলে বেড়ান যে, তিনি অনেকটাই স্বৈরাচারী ও কঠোর। তিনি কঠোর ছিলেন এটা সত্যি, তবে তা দেশের জন্য। তাঁর কঠোরতাই সিঙ্গাপুরকে আজকের অবস্থানে নিয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তার কর্মের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শোকগাথাতেই শেষ কথাটি লেখা থাকবে না। পিএইচডি গবেষকরা যখন মহাফেজখানায় খোঁজাখুঁজি করবে, আমার পুরনো কাগজপত্র পড়বে, আমার শত্রুরা কী বলেছিল তা মূল্যায়ন করবে, তথ্য যাচাই বাছাই করে প্রকৃত সত্য বের করে নিয়ে আসবে, তখনই শেষ কথাটা লেখা হবে। আমি বলছি না, আমি যা কিছু করেছি তার সবই ঠিক,তবে আমি যা কিছু করেছি সব একটি মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য।’ সেই মহৎ উদ্দেশ্যের প্রমাণ বয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো ধনী ও দুর্নীতিমুক্ত সিঙ্গাপুর।

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: