মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

‘বাঙালীর জাতীয় রাষ্ট্র’ একটি পর্যালোচনা

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫
  • ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন

জিন্নাহ’র দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট ‘পাকিস্তান’ ও তথাকথিত ‘পাকিস্তান জাতি’ সৃষ্টির পদক্ষপের বিরুদ্ধে বাঙালীর জাতিসত্তার উন্মেষের লক্ষ্যে ছাত্রলীগের মধ্যে প্রচারধর্মী আন্দোলন গড়ে তোলে ‘নিউক্লিয়াস’। গতকালের পর আজ পড়ুন

বাংলাদেশকে চারটি সেক্টরে ভাগ করে ‘নিউক্লাসের’ চার নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে বিএলএফ পরিচালিত হয়। এঁদের সহযোগী হিসেবে ছিলেন মার্শাল মণি, কাজী আরেফ আহমেদ, নূরে আলম জিকু, সৈয়দ আহমদ, সাজাহান সিরাজ, আসম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন। দেরাদুনের কাছে টান্ডোয়ায় এবং মেঘালয়ের হাফলং-এ ’৭১-এর মে থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৭ হাজার শিক্ষিত ছাত্র-যুবক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের ট্রেনিং দেয়া হয়। প্রশিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন হাসানুল হক ইনু, আফম মাহবুবুল হক, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মাসুদ আহমেদ রুমী প্রমুখ। (পৃষ্ঠা, ৭১-৭২)

১৯৬২ সালে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের যে স্বপ্ন-যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনজন বরেণ্য মানুষ তা এভাবেই পরিণতির দিকে অগ্রসর হলো।

নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে ব্যবহার করা হয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে। কাজী আরেফ জানান, “বিপ্লবী পরিষদের সকল কর্মীকে ’৭০ সালের নির্বাচনে মাঠে নামতে নির্দেশ দেয়া হয়। এই নির্দেশ ও পরিষদ সদস্যদের স্পষ্ট বক্তব্য দেয়ার জন্য ‘জয়বাংলা’ নামের সাইক্লোস্টাইল পত্রিকা বের করা হয়। ... এই সময় ৬ ও ১১ দফাভিত্তিক দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, অন্যথায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সেøাগানটি কর্মীদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’র পরিবর্তে ‘জয়বাংলা’ সেøাগান সর্বত্র ধ্বনিত হতে থাকে।” (পৃষ্ঠা, ৭৪-৭৫)

এ সময়ের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন কাজী আরেফ। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিরুদ্ধে বেগম মুজিবের অনমনীয় অবস্থান, ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রচার সম্পাদক স্বপন কুমার চৌধুরী (মুক্তিযুদ্ধে নিখোঁজ/শহীদ) আনীত ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ প্রস্তাব পাস, পরে বঙ্গবন্ধু ও আবদুর রাজ্জাকের অনুরোধে সে প্রস্তাব সংশোধন করে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গঠন করার প্রস্তাব, বাংলাদেশের পতাকার পরিকল্পনা, লাল সূর্যের মাঝে সোনালি রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা বিষয়ে কাজী আরেফের যুক্তি ও নিউক্লিয়াসে তা অনুমোদন, ২ মার্চ ’৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় লক্ষাধিক মানুষের সামনে আসম আবদুর রব কর্তৃক সে পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চে পল্টনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে সাজাহান সিরাজের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ও পতাকা উত্তোলন, ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে পাকিস্তানী পতাকার পরিবর্তে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়া, তাঁর হাতে সে পতাকা তুলে দেয়া, তাঁর বাড়ি ও গাড়িতে পতাকা ওড়ানোর মতো বহু তথ্যনির্ভর ঘটনার বর্ণনা আছে। (পৃষ্ঠা, ৭৪-৭৯)। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম সূচনায় এ সবই ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

‘১৯৭০ এর নির্বাচন’Ñ এই অধ্যায়ে কিভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে পেছনে ফেলে জনমনে একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্থান করে নিল তার বর্ণনা আছে। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর ১১ জানুয়ারি পল্টনে বঙ্গবন্ধুর সভায় “সিরাজুল আলম খান কৌশলে ‘জয়বাংলা’ সেøাগান নিজে ঘোষণা করেন এবং জনগণের সমর্থন আদায় করেন।”

১৮ জানুয়ারি, পল্টনে জামায়াতের আমির মাওলানা মউদুদীর জনসভা পণ্ড করে দেয়া হয় নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। সেই সময়ে জামায়াতের ‘বদর বাহিনী’ ও ‘সালেহিন বাহিনী’র সংঘবদ্ধ আক্রমণ প্রতিহত করে জনতা। মউদুদী পালিয়ে যান।

জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ মাসের মধ্য পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অসংখ্য সভায় নির্বাচনী বক্তৃতা দেন।

“তিনি সমগ্র পূর্ববাংলাকে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ‘৬ দফা’ভিত্তিক অধিকার অর্জনের সপক্ষে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ...৭ ডিসেম্বর ’৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটার সংখ্যা ছিল পূর্ববাংলায় ৩, ১২, ১১, ২২০ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ২, ৫৭, ৩০, ২৮০। আওয়ামী লীগ পূর্ববাংলায় জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ...এই নির্বাচন ছিল নিউক্লিয়াস-বিএলএফ’র জন্য অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনে জিতেই রাস্তার গণ-আন্দোলনকে ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে গণ্য করা হলো।” (পৃষ্ঠা, ৮০-৮৫)

’৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ’ শিরোনামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে কাজী আরেফ অনেক অজানা তথ্য প্রকাশ করেন। পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খানের পার্লামেন্ট অধিবেশন বন্ধ ঘোষণার পর ‘শেখ মুজিব ঐ রাতেই আওয়ামী লীগের হার্ডকোর নেতৃবৃন্দ ও নিউক্লিয়াসের তিন নেতাসহ যুব নেতৃবৃন্দ (সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ), চার ছাত্র নেতা (ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, ও সাধারণ সম্পাদক সাজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর সহ সভাপতি আসম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন) এবং আদমজী, ডেমরা, তেজগাঁ ও পোস্তগোলার শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জাতীয় অধিবেশন বন্ধের পরবর্তী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।’

এর আগে “১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে আলোচনায় বসেন। একপর্যায়ে তিনি শেখ মনি ও তোফায়েলকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য কাজ করতে বলেন। ... তিনি জঙ্গী কর্মী বাহিনী তৈরি করে লড়াইয়ের উপযুক্ত ছাত্র-যুবশক্তি গড়ার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, ‘লড়াই ছাড়া পাকিস্তানীদের হাত থেকে বাঙালীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।’ এভাবেই বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স ও তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চার যুবনেতা বা ‘মুজিব বাহিনী’র চার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ...২১ জানুয়ারি ’৭১ শেখ মুজিব চার যুব নেতাদের বলেন, ‘আমি না থাকলেও তাজউদ্দীনকে নিয়ে তোমরা সব ব্যবস্থা করো। তোমাদের জন্য অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।’ ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় তিনি চার নেতাকে বলেন, ‘তোমরা চারজন সশস্ত্র যুবশক্তিকে পরিচালনা করবে। তাজউদ্দীন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব নেবে।’ তিনি বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বার বার বলে দেন। মুজিব ভাইয়ের নির্দেশ ছিল তাজউদ্দীন ভাই, সৈয়দ নজরুল, কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলিকে একসঙ্গে ভারতে গিয়ে প্রবাসী সরকার গঠন করার। একইভাবে ২২ ফেব্রুয়ারি ’৭১ সিরাজুল আলম খান, শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল এবং চার রাজনৈতিক নেতাকে কলকাতার একটি ঠিকানা দিয়ে বলেন, ‘এ ঠিকানায় গেলেই তোমরা অস্ত্র, ট্রেনিং ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা এবং ‘প্রবাসী সরকার’ গঠনের সকল সাহায্য পাবে।’” (পৃষ্ঠা, ৮৫-৮৭)

দেখা যাচ্ছে, পয়লা মার্চ ১৯৭১ তারিখে ইয়াহিয়া খান কর্তৃক সংসদ অধিবেশন মুলতবি করে দেয়ার প্রায় দু’মাস পূর্বেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্বাধীনতা অর্জনে সকল গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন যাতে তাঁর অবর্তমানেও তারা কর্তব্যসাধনে এগিয়ে যেতে পারেন। আমরা ভাবতে পারি একে খোন্দকারের মতো ব্যক্তিরা এসব তথ্য আগে জানলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি এবং বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা বিষয়ে এত অসত্য বক্তব্য দিতে পারতেন না।

‘জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ এবং স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণয়ন’Ñ ২ মার্চ সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের পর এই অধ্যায়ে আমরা দেখি, ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ প্রণয়ন ও ‘জাতীয় সঙ্গীত’ নির্ধারণের জন্য ঐ রাতেই ইকবাল হলে ‘নিউক্লিয়াসের’ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসেছে। কাজী আরেফ জানাচ্ছেন, “সিরাজ ভাই দ্রুততা ও ব্যস্ততার সঙ্গে এসে ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেন। আমরা ‘নিউক্লিয়াস’-এর তিনজনই একমত হই। এর পর সিরাজ ভাই ও আবদুর রউফ প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় নিয়ে ইশতেহারের একটি খসড়া প্রস্তুত করেন। চূড়ান্ত খসড়াটি নিয়ে সিরাজ ভাই পাশের রুমে আমাদের সঙ্গে বসে ‘নিউক্লিয়াস’-এর বৈঠকে সর্বশেষ অনুমোদন নেন। রাতের মধ্যেই ইশতেহারটি প্রচারপত্র আকারে ছাপানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভোর হওয়ার আগেই পাঁচ হাজার কপি ছাপা হয়ে আসে। প্রচারপত্রটির শিরোনাম ছিল ‘স্বাধীনতার ইশতেহার : জয়বাংলা’।” (পৃষ্ঠা, ৯০)

বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল দু’যুগের অধিক সময় ধরে। তাই ইশতেহার সম্পর্কে তারা তেমন নাও জানতে পারে। তবে আমরাও অনেকে সেই ইশতেহারের মূল ঘোষণাগুলো ভুলে গেছি। স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে জনগণকে প্রস্তুত করতে ১৯৭১ সালের সেই ৩ মার্চ তারিখে ঘোষিত সে ইশতেহারের সেসব ঘোষণা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাও হয়ত আমরা বিস্মৃত হয়েছি। সম্ভবত সে কারণেই কাজী আরেফ স্বাধীনতার ইশতেহারটি তার পুস্তকে আবারও লিপিবদ্ধ করেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হলোÑ এই কয়টি শব্দে ইশতেহারের শুরু। তারপর ছোট দুই প্যারার ভূমিকা। সেখানেই বলা হলো রাষ্ট্রের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে তিনটি লক্ষ্য অর্জনের কথা ঘোষণা করা হলো।

১। ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে পৃথিবীর বুকে একটি বলিষ্ঠ বাঙালী জাতি সৃষ্টি ও বাঙালীর ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

২। স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে অঞ্চলে-অঞ্চলে, ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসন করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।

৩। স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে। (পৃষ্ঠা, ৯১)

এরপর ‘বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন’ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। এর মধ্যে আছে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন, শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সুসংগঠিত করে গ্রামে গ্রামে ও এলাকায় এলাকায় ‘মুক্তি বাহিনী’ গঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, লুটতরাজ, সমাজবিরোধী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধের ব্যবস্থা ইত্যাদি। (পৃষ্ঠা, ৯১-৯২)

ইশতেহারের ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা’ শিরোনামে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারকে বিদেশী উপনিবেশবাদী শোষক সরকার গণ্য করে তার সকল আইনকে বেআইনী বিবেচনা করা; ট্যাক্স, খাজনা বন্ধ করা; পশ্চিম পাকিস্তানী অবাঙালী মিলিটারিকে বিদেশী ও হানাদার সৈন্য গণ্য করে হামলাকারী শত্রু সৈন্যকে খতম করা, সশস্ত্র প্রস্তুতি নেয়া; পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করা; স্বাধীনতা সংগ্রামরত বীর সেনানীদের সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা। (পৃষ্ঠা, ৯২-৯৩)। সংগত প্রশ্ন হলো,

আসন্ন স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে এর চেয়ে আর বেশি কী ঘোষণা সেখানে থাকতে পারত?

কাজী আরেফ লিখেছেন, ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু আকস্মিকভাবে উপস্থিত হন।

‘এটা ছিল তাঁর অনির্ধারিত উপস্থিতি। তাই বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে সাজাহান সিরাজ ইশতেহারটি আবার পড়ে শোনালেন।’ (পৃষ্ঠা, ৯১)

কাজী আরেফের এ তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে বঙ্গবন্ধু জেনেছেন ইশতেহারের ভাষ্য, সেখানে মার্চের সেই ৩ তারিখে পল্টনের জনসভায় অনির্ধারিতভাবে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা বিষয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর অবস্থানটি স্পষ্ট করে তোলেন।

চতুর্থ পর্ব

“তোরা সত্যই স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত? আমাকে দালাইলামা বানাবি না তো।”

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কাজী আরেফ বিস্তাারিত বলেছেন।

“একদিকে নিউক্লিয়াসের নেতৃবৃন্দ, স্বাধীনবাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ‘চার খলিফা’ ও ছাত্র সমাজ এবং অন্যদিকে আওয়ামী নেতৃত্বের আপোষকামী অংশের বিভিন্নমুখী চাপ বঙ্গবন্ধুকে সহ্য করতে হচ্ছিল।”

এ অধ্যায়ে দেখতে পাচ্ছি, ৭ মার্চ ভাষণ প্রস্তুত করতে বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকেই বিএলএফ’র চার নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ ও আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন মনসুরআলীর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন।

“৬ মার্চ রাত ১২টায় বিএলএফ হাইকমান্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পুনরায় আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু আবারও বক্তৃতাটি আওড়ালেন এবং ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে শেষ করেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন- কেমন হলো?” (পৃষ্ঠা, ৯৮)

(চলবে)

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: