আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজেদের প্রার্থী জেতাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একাট্টা

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫
  • চট্টগ্রামে গ্রুপিংয়ের অবসান ॥ নতুন হাওয়া রাজনীতিতে, সরগরম সিটি নির্বাচন

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সরগরম হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম মহানগরীর রাজনৈতিক অঙ্গন। নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে ব্যস্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি তোড়জোড় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে। সর্বশেষ বিএনপি থেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের প্রার্থী এম মনজুর আলমকে সমর্থন দেয়ার পর নির্বাচন বেশ জমে ওঠার আভাস মিলছে। বড় দু’দলই তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মাঠে নামতে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। প্রতীক বরাদ্দের পরই শুরু হবে প্রচার। এরপর মাঠ পরিস্থিতি জমজমাট রূপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই উভয় শিবিরের পক্ষে স্ব স্ব প্রার্থী নিয়ে নিশ্চিত বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে অতীতের যে গ্রুপিং রাজনীতির বীজ বপন হয়েছে তা যে একেবারে উবে গেছে তা নয়। অন্তর্জ্বালা নিয়ে অনেকের মাঝেই বিষাদের ছায়া রয়েছে। তবে প্রকাশ্যে তার কোন প্রতিফলন নেই। উভয় দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড একক প্রার্থিতা নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করায় বিরোধিতা করার সাহস নিভে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কেন্দ্র করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থক মহলে উত্তাপ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। তবে রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এমন ভোটাররা এখনও হিসাব-নিকাশ করার জন্য নানা জল্পনা-কল্পনায় লিপ্ত। একদিকে, সদ্যবিদায়ী মেয়র মনজুর আলম আবার প্রার্থী হয়েছেন, অপরদিকে আ জ ম নাছির উদ্দিনের মেয়র পদে নির্বাচন এই প্রথম। দু’দলের মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটেছে এই নিয়ে যে, মেয়র পদ নিয়ে তাদের অতীতের সকল মতভেদ ও কোন্দল মিটিয়ে তারা একাট্টা হতে পেরেছেন। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনীতিতে এটা একটা বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগে যেমন কোন বিদ্রোহী প্রার্থী নেই, তেমনি বিএনপিতেও থাকছে না। শুধু তাই নয়, একাধিক গ্রুপিংয়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি চট্টগ্রামে মেয়র নির্বাচন নিয়ে এক কাতারে চলে আসা উভয় দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য বড় একটি অর্জন হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

ইতোপূর্বে ২০১০ সালে চসিকের সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত মনজুর আলমকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি তাদের নিজ শিবিরে নিয়ে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়। বিপরীতে ছিলেন তারই গুরু হিসেবে পরিচিত হ্যাট্টিক বিজয়ী মেয়র আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ওই নির্বাচনে প্রায় ৯৫ হাজার ভোটে মনজুর আলম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে দেশজুড়ে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেন। আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করে বিজয়ী হলেও মনজুর আলম সিটি কর্পোরেশন পরিচালনায় মহিউদ্দিনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে বরাবর কাজে লাগিয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরাগভাজন হয়েছেন। যে কারণে মনজুর আলমকে এবার পুনঃ প্রার্থী করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল দলের একটি অংশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সমর্থনে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তার প্রতিই চূড়ান্ত সিগন্যাল দিলে তিনিই শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হিসেবে নিযুক্ত হয়ে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায় করেছেন ইতোমধ্যে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এবার ভোটার ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯। এর আগে ২০১০ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৬। সে হিসাবে ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৭৩। নির্বাচনে এবারও নতুন ভোটাররাই ফ্যাক্টর হবে। জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চসিকের মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩। আর মহিলা ভোটার রয়েছে ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৬।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আবার কেন্দ্র সংখ্যা ৭১৯। মোট ৪৪৮ প্রতিষ্ঠানে এ কেন্দ্রগুলো স্থাপিত হবে। নির্বাচনে ভোটগ্রহণের জন্য বুথ হবে ৪ হাজার ৯০৬। ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৫ সালের চসিক নির্বাচনে কেন্দ্র বেড়েছে ৪৬। এর আগের নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ছিল ৬৭৩।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৮ এপ্রিল চসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যেই ১৫ হাজার ৪৩৭ নির্বাচন কর্মকর্তার তালিকা চূড়ান্ত করেছে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়। এর মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার থাকবেন ৭১৯। আর সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ৪ হাজার ৯০৬ ও পোলিং অফিসার হিসেবে ৯ হাজার ৮১২ জন নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করবেন। ইতোমধ্যেই নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরুর প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মোঃ আবদুল বাতেন জানান, চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতের পর বরাবরের মতো এবারও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলবে। তবে চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়া হবে নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে। কারণ, কৌশলগত কারণে আগেভাগে নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয় না।

রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়, ভোটগ্রহণের জন্য নিয়োগ দেয়া কর্মকর্তাদের অধিকাংশই কলেজ, হাইস্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষক। এছাড়া বিভিন্ন সরকারী, আধা-সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ দায়িত্বে রাখা হচ্ছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে রিটার্নিং অফিসার জানান, কর্পোরেশন পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা আগেও ছিলেন এবারও থাকবেন। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারতপক্ষে রাখা হবে না। যেহেতু নিয়ম অনুযায়ী মেয়র পদত্যাগ করেছেন সেহেতু ভোটে চসিকের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রভাবিত হওয়ার কথা নয়।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এটি পঞ্চম নির্বাচন। এরশাদ আমলে পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হওয়ার পর প্রথম মেয়র নিযুক্ত হন জাতীয় পার্টির নেতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মেয়র নিযুক্ত হন মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। এ দুজনই ছিলেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত। ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন। এতে বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরও এক দফায় মেয়র নির্বাচিত হন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ২০০৫ সালে তৃতীয় নির্বাচনেও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এবারও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চতুর্থ নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলমের কাছে হেরে যান আওয়ামী লীগের তিন তিনবারের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী।

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম এবারও চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের ব্যানারে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ থেকে এবার সমর্থন পাননি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। দল এবার চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছে নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনকে। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন নাগরিক কমিটির ব্যানারে, যে ব্যানারে আগের নির্বাচনগুলো করেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

২০ দলীয় জোটের বৈঠক ॥ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মনজুর আলমের সমর্থনে রবিবার সন্ধ্যায় ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়েছে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও মনজুর আলমকে উক্ত জোটের একক প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়া হয়েছে। নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মেহেদীবাগের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জোটের বিভিন্ন নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীকে মেয়র পদে বিজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে জোটের সকল নেতাকর্মী ও সমর্থককে ওইদিন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়।

আজ মনোনয়নপত্র জমা ॥ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও নাগরিক কমিটি মনোনীত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং ২০ দলীয় জোট সমর্থিত ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন মনোনীত প্রার্থী সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমসহ অন্যান্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী আজ সকাল থেকে তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মনজুর আলম সকালেই তার মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। আ জ ম নাছির উদ্দিনকে দুপুরের মধ্যেই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার কথা রয়েছে।

মনজুর আলমের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ॥ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও নাগরিক কমিটি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনের পক্ষে বিএনপি সমর্থিত ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন মনোনীত মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলমের বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিধিমালা ২০১০ লঙ্ঘন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: