আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মহারাত্রি

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • শেখ আতাউর রহমান

হল থেকে বের হয়ে দেখা গেল একটিও রিকশা নেই। একে পৌষের রাত তার ওপর সেকেন্ড শো-রিকশাওয়ালার দোষ দিয়ে আর কি হবে। যে ক’টা ছিলো চালাক দর্শক সেগুলো আগেভাগে দখল করে কেটে পড়েছে। এমন যখন পরিস্থিতি তখন সে না হেসে পারে না, হেঁটেই তো যেতে হয় তাহলে। পারবি তো?

মুন্নীও হাসে। ঘাড়টা দোলায় আলতো করে। অর্থাৎ সে পারবে।

-তাহলে চল তাড়াতাড়ি। যা কুয়াশা পড়ছে।

গলিটার ভেতর এসে পড়ে ওরা দুজন। কারণ বড় রাস্তা অনেক ঘোরা হবে। ওভারকোটের পকেটে হাতদুটো ঢুকিয়ে আয়াস করে সে বলে, কেমন লাগলো ছবিটা তোর?

কোনো উত্তর নেই।

-কিরে? সে অবাক না হয়ে পারে না, চুপ করে আছিস যে।

-ভালো।

-তাহলে তাই বল। একটু থেমে সে আবার বলে, গল্পটা আমার আগেই পড়া ছিলো বুঝলি। বনফুলের ‘কিছুক্ষণ’।

কোনো উত্তর নেই। একটা ল্যাম্পপোস্ট এগিয়ে আসছে। কুয়াশা কুয়াশা আর কুয়াশা। দুজন দুজনের কাছে অস্পষ্ট।

-মুন্নী, কি হলো তোর? কথা বলছিস না কেন?

সাড়া আসে, এইতো।

মুন্নীর ঠোঁটে জড়তা। তার সন্দেহ হয়। থমকে দাঁড়ায়। বলে, দাঁড়াতো। মুন্নি দাঁড়িয়ে যায়। আর তখন ডানহাতটা দিয়ে সে মুন্নীর থুতনিটা স্পর্শ করে-বরফের মতো ঠা-া!

-একি তুই যে কাঁপছিস! সে অবাক হয়, বোকা কোথাকার। বলিসনি কেন এতক্ষণ? সে একটুক্ষণ কি যেন ভাবে। তারপর বলে, দাঁড়া এটা নে। সে তার ওভারকোটটা শরীর থেকে খুলে ফেলতে চায়। কিন্তু মুন্নি দুহাত দিয়ে বাধা দেয়, না, না। আপনার শীত করবে।

তার গলায় তখন কপট গাম্ভীর্য, থাক আর গিন্নিপনায় কাজ নেই। আসবার সময় এতকরে সাধা হলো সঙ্গে গরম কিছু একটা নে তা মেমসাহেবের কথাটা কানেই গেল না। এখন বোঝো মজা। সে কোটটা খুলে ফেলেছে ততক্ষণ, নে, হাতদুটো তোল একটু।

মুন্নী অনড়।

-দেখতে পাচ্ছিস না আমার গায়ে এখনো একটা পুলওভার রয়েছে? একটুক্ষণ অপেক্ষা করা। -কোই হাতদুটো পেছন করলি?

মুন্নী তবুও অনড়।

-মুন্নী!

তখন আর না তুলে পারা যায় না। অপরাধীর আত্মসমর্পণের মতো ধীরে ধীরে মুন্নি তার হাত দুটো পেছন করে। আর তখন সে পেছন থেকে দুহাতের মধ্যে কোটটা গলিয়ে দেয়। তারপর সামনে চলে আসে। একটু নিচু হয়ে আঁধারে হাতড়ে হাতড়ে পরমযতেœ সবকটা বোতাম লাগিয়ে দেয়। তারপর কলারটা উঁচু করে দিয়ে একহাতে মুন্নীর একটা হাত ধরে আরেক হাতে ওর পিঠে ছোট্ট করে একটা আদরের আঘাত করে, আয়।

অপরাধীর মতো মুন্নী ঘাড় হেঁট করে চলতে শুরু করে। সত্যি তখন কথাটা না শুনে কি বোকামিটাই না হয়েছে। শুধু শুধু আরেকজনের আরাম কাড়তে হলো। আর সেই সঙ্গে মুন্নীর অভিমানও হয় এই ভেবে যে তার দুঃখটা কেউ বোঝে না। সালোয়ার-কামিজেই যে তাকে সবচে’ সুন্দর দেখায় সেটা কি কেউ স্মরণ রাখবে? আর সে জন্যইতো মুন্নী অন্যকিছু গায়ে চড়াতে রাজি নয়।

দুজোড়া পা পরস্পর আন্তরিকতায় চলছে আর চলছে। এ সময় দূরে-বহুদূরে একটা কুকুরের ক্ষীণস্বর ভেসে আসে। তারপর সব চুপ। রাত্রির বুকে আর কোন তরঙ্গ নেই।

আব্বাতো বদলি হয়ে গেলেন মুন্নী। সে কতকটা স্বগতোক্তির মতো বলে। কিছুক্ষণ নীরবতা। দিনাজপুরে তোর কে যেন আছেন?

-মামা।

ও হ্যাঁ। আমি গিয়েই তোর মামার সঙ্গে আলাপ জমাবো বুঝলি। অন্ধকারেই সে দুষ্টুমির হাসি হাসে, বলবো ভাগ্নিটা আপনার বড্ড গোঁয়ার। ফ্যাশন করতে গিয়ে গরম কাপড় পরবে না। আবার শীতে থরথর করে কাঁপবে তবুও কাউকে কিছু বলবে না। এমনকি আমি যে কিনা-

কথা শেষ হয় না হাতে টান পড়েছে মুন্নীর, অভিমান ভরা হাতের। অর্থাৎ বাকিটা বলতে মানা। সে প্রাণখোলা হাসি হেসে ওঠে, যাক কথাটায় কাজ দিয়েছে দেখছি। সময়মতো শুনলে কি আমাকে এতকথা খরচ করতে হয়।

আরেকটা ল্যাম্পপোস্ট এগিয়ে আসছে। আলোটা ঝাপসা, ম্লান। কি ভেবে এতক্ষণ পর মাথাটা একটু তোলে মুন্নী। আর তখন সে ঘাড় ফিরিয়ে দ্যাখে সাদা আবছা আলোয় মুন্নীর মুখটা কি অপরূপ। কি সুন্দর তরতাজা! তখন মুন্নীকে আপন মনে হয় তার। মনে হয় মুন্নী তার শরীরের কাছ থেকে সামান্যতম দূরত্বে সরিয়ে নিলে সে মারা যাবে। এবং হঠাৎ করে এসব বিশৃঙ্খল ভাবনা কেন যে তার মাথায় এলো সে বুঝতে পারে না। তবে মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন সে হাফট্যান্ট পরতো, মুন্নী ফ্রক পরতো। সাইকেলের সামনের রডে চড়িয়ে সেই ফ্রকপরা মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ির সামনের মাঠে বনবন করে ছোটা, খুব ভোরে প্রফেসরের বাগান থেকে ফুল চুরি করে জানালা দিয়ে মুন্নীর বিছানায় ছুড়ে ফেলা এখন সব তার মনে পড়ছে। আর মনে পড়াতে ধীরে ধীরে তার বুকের মধ্যে শীতল বরফের মতো একটা ঠাণ্ডা কষ্ট জমতে শুরু করেছে।

আমার একটা কথা রাখবেন? এবার মুন্নীই কথা বলে।

সে একটউ অবাক হয়। কিরে কি কথা?

কিন্তু মুন্নী কথাটা আর বলে না কিছুক্ষণ।

-বললি না কি কথা?

তখন মুন্নীর কণ্ঠে অনুরোধের সুর, দিনাজপুর গিয়ে পড়াশোনায় মন দেবেন একটু। শুধু কবিতা নিয়েই থাকবেন না।

সে না হেসে পারে না, বাহ, বেশ বললি তো-

আর পার্টিফার্টি বিচিত্রানুষ্ঠান এগুলো একটু কমিয়ে দেবেন।

সে হো হো করে হেসে ওঠে, হয়েছে হয়েছে, আর না।

ল্যাম্পপোস্ট পেছন পড়েছে এখন। আর তাতে করে ওদের দুটো ছায়া হয় সামনের রাস্তায়। ছায়া দুটো ক্রমশ বিশাল হয়। সেই বর্ধমান ছায়ার দিকে তাকিযে সে লম্বা করে ডাক দেয়, মুন্নী।

উম্? মাথাটা নিচু করেই শব্দ করে মুন্নী।

আমরা চলে গেলে তোরা আমাদের মনে রাখবি তো?

কোন উত্তর নেই। শুধু চলা। সে আবার কুয়াশায় চোখ রেখে বেদনার হাসি হাসে, মনে রাখবি মুন্নী আমাকে তুই?

মুন্নী তবুও চুপ। অন্ধকারে মুন্নীর মুখটা দেখা যায় না। তাই কিছু বোঝাও যায় না। মাথার ওপর একটা রাতজাগা পাখি ডানা ঝটপট করে উড়ে যায়। দূরের সেই কুকুরটাও কেঁদে ওঠে এ সময়। এভাবে রাত্রির নীলতরঙ্গ কিছুক্ষণ কেঁপে ওঠে আবার নিথর হয়ে যায়।

গলিটা শেষ হয়। এবার মাঠ। এতক্ষণ পর কুয়াশার চাঁদটা নজরে আসে। ধোঁয়াটে ঝাপসা। তারাগুলো ঝুলছে কুয়াশার ঝারে। মাঠের শেষ প্রান্তে দুটো ক্ষীণ আলো ভাসছে দুটো সুদূর নক্ষত্রের মতো। দুটো দুবাড়ির। একটা তাদের। আরেকটা মুন্নীদের। পাশাপাশি। ওই আলোর দিকে তাকিয়ে সে বলে হঠাৎ, একটা মজার কথা শুনবি মুন্নী।

-কি?

-তুই যদি রাগ না করিস তবে বলি। তার কণ্ঠ অবুঝ বালকের মতো শোনায়।

মুন্নী ম্লান হাসে,আপনি বলুন। আমি রাগ করবো না।

কিন্তু কথাটা সে তখনি বলতে পারে না। শুধু দূরের আলোর দিকে বিষণœ তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ। তারপর ওই আলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই বলে, একটা কবিতা লিখেছি মুন্নী তোকে নিয়ে। একটু থামে সে।

-যা কোনোদিন লিখিনি। যাবার আগে-

কথা শেষ হয় না। হঠাৎ মুন্নীর চলা থেমে যায়। এতক্ষণ ধরে যে কান্নার সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছিলো সে এবার সেটা জয়ী হয়ে যায়। হ্যাঁ, বসে পড়েছে মুন্নী শিশিরভেজা ঘাসের ওপর। তারপর দু’হাঁটুর মাঝে মাথাটা গুঁজে কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

সে বিমূঢ়। অল্পক্ষণ কোনো ভাবনা তার মাথায় আসে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোকার মতো মুন্নীর কান্নার দৃশ্যটা দ্যাখে। এবং যার জন্য তার মুখটাও ধীরে ধীরে করুণ হয়ে ওঠে। কি করবে সে এখন?

এবং কখন যে তার একটা হাত মূর্তিমান স্নেহ হয়ে নেমে এসেছে মুন্নীর মাথার ওপর সে বুঝতে পারেনি। হাতটা সে স্বস্নেহে বুলোতে থাকে মুন্নীর মাথায়, ছি মুন্নি! একি হচ্ছে, ওঠ্।

কান্না তবুও থামে না।

তার হাতটা এবার মুন্নীর প্রশস্ত পিঠের ওপর নেমে আসে। সারা পিঠময় আদরের হাতটা ঘুরে ফিরে মুন্নীকে দিতে থাকে পরম আত্মীয়ের মতো অঢেল সান্ত¡না। কান্না তবুও থামে না। তখন সে মিথ্যে বলে (আর মিথ্যে বলার জন্যই বোধহয় তার কণ্ঠ বারবার কেঁপে ওঠে), মিথ্যে বলেছি মুন্নী। তোকে নিয়ে আমি কোনো কবিতা লিখিনি। বিশ্বাস কর। এই বলে সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন মুন্নী দু’হাঁটুর ভরে নিলডাউনের মতো হয়ে তাকে- তার কোমরের কাছটাকে ব্যাকুলো মতো জরিয়ে ধরে দু’হাতে। তার দু’ঊরুর ওপর মাথাটা চেপে ধরে নতুন করে ফুঁপিয়ে ওঠে কান্নায়। নিঃশব্দ বেদনায় মুন্নী তার মুখটা বারবার তার ঊরুর ওপর ঘষে। আর তাতে করে সে বুঝতে পারে তার ট্রাউজারটা ভিজে উঠছে মুন্নীর উষ্ণ লোনাপানিতে। তখন আবার তার সান্ত¡নার হাত নেমে আসে মুন্নীর মাথার ওপর। এবং তার গলাটাও আবার কেঁপে ওঠে, তুই মিছেমিছি কাঁদছিস মুন্নী। তুই কি ভেবেছিস আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না?

এবার সে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে শিশিরিভেজা ঘাসের ওপর। এবং উন্মুখ করতলে তুলে নেয় ক্রন্দসীর অশ্রুভেজা মুখ এবং সে মুখ তার মুখের সমান্তরাল করে নেয়। কিন্তু একি? এ কার মুখ? সে চমকে ওঠে। এ মুখতো কোনোদিন দ্যাখেনি সে! এই অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য এতদিন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলো এই কিশোরী? সে বিমূঢ়ের মতো ক্রন্দসীর সুডৌল পানপাতা মুখ শক্ত করতলে ধরে রাখে এবং অপলক চোখে কিশোরীর অতুলনীয় সৌন্দর্য দ্যাখে।

হে সহৃদয় পাঠিকাপাঠক, এখন স্বর্গের আপেল বাগানে সভ্যতার প্রাচীনতম নারী হাওয়া প্রাচীনতম পুরুষ আদমের করতলে বন্দী! এবং অতঃপর?- অমোঘ নিয়তির মতো এ মানবসভ্যতার প্রাচীনতম পুরুষ প্রগাঢ় স্নেহ ঢেলে দেয় প্রাচীনতম নারীর অশ্রুভেজা ঠোঁটে-ঠোঁট থেকে ঠোঁটে-অবিরাম-অবিরল। বুনো মহিষের মতো ক্রন্দসীর সারামুখে সে আদর করে- আদর করে- আদর করে-ক্রমাগত এবং বারংবার-বুভুক্ষুর মতো। বুনো আবেগে সারা মুখ ভিজে ওঠে লালায়/আসক্তিতে। তখন মুহূর্তে এ রাত্রি মহারাত্রি হয়ে যায়। এবং এ দৃশ্য দেখে আনন্দে নৃত্য করে ওঠে আকাশের চাঁদ- সে সচল সাদামেঘের সাথে রাজহংসীর মতো ভীষণবেগে উড়ে চলে দিগন্তে। আর মাথার ওপর অতিদূরে আকাশে অকিক্ষুদ্র চকোরিরাও মহানন্দে চাঁদকে আবর্তন করে করে চন্দ্রসুধা পান করে।

হ্যাঁ, মুন্নী কাঁদছেই। সে শুধু এটুকুই বলতে চেয়েছিলো, একদিন না একদিন আমাদের দেখা হবে এ কথা সত্য। কিন্তু সেদিনের জন্য আজকের এই মনটা কি আপনি বাঁচিয়ে রাখবেন?

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: